বিষ্ণুর দশমাবতারে রামের কথা উল্লেখ আছে। অবতারবাদ নতুন কিছু নয়। ভারতের সনাতন ধর্মে অবতারবাদ বহু প্রাচীন যুগ থেকেই শুরু। বেদ, উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র, পঞ্চরাত্র–সবখানেই অবতারবাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। অবতারবাদ হচ্ছে এক ধরনের মতবাদ যেখানে সৃষ্টিকর্তা মানবকুলকে সঠিক পথে পরিচালিত করার উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে মানুষ বা অপর কোনো জাগতিক রূপ নিয়ে বা অবতার হয়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। অন্যভাবে বলতে গেলে মানুষ বা জাগতিক কোনো প্রাণীকে সকল দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে এবং সর্বজ্ঞ ও মহাক্ষমতার অধিকারী হিসাবে বিবেচনা করার নাম ‘অবতারবাদ। যুগে যুগে রাজনৈতিকভাবে এই অবতারবাদকে ব্যবহার করা হয়েছে কোনো নেতা বা রাজাকে তাঁদের অনুসারীরা সকল দোষ-ত্রুটির ঊর্ধে এবং সর্বজ্ঞ ও মহাক্ষমতার অধিকারী হিসাবে বিবেচনা করে অন্ধ অনুসরণ করত এবং অনেক সময় সৃষ্টিকর্তার আসনে বসিয়ে পুজোও করত, এ ধরনের অন্ধ অনুসারীদেরকে অবতারবাদের অনুসারী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের নেতা বা রাজাকেও অবতার হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ভারতবর্ষে বুদ্ধকে বৈদিক দেবতা বিষ্ণুর সঙ্গে সমীকরণ করা হয়। মৎসপুরাণে এ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ভগবত পুরাণেও বুদ্ধকে বিষ্ণুর সঙ্গে সমীকরণ করা হয়। বুদ্ধকে ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে বিষ্ণুর নবম অবতার মনে করা হয়। এরকমভাবে পরশুরাম, কৃষ্ণ, চৈতন্য, রামকৃষ্ণও অবতার হিসাবে পূজিত।
অবতারদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়–(১) সাক্ষাৎ এবং (২) অবেস। যখন বিষ্ণু স্বয়ং অবতীর্ণ হন, তখন তাকে সাক্ষাৎ বা শাক্ত্যবেসাবতার বলা হয়। কিন্তু যখন তিনি নিজে অবতীর্ণ না-হয়ে কারোর মাধ্যমে প্রকাশিত হন, তখন তাকে বলা হয় অবেস অবতার। মনে করা হয়, অবেস অবতারের সংখ্যা অনেক। অবেস অবতারগণ পরমেশ্বর রূপে পূজিত হন না। কেবলমাত্র প্রত্যক্ষ ও প্রধান অবতারগণই ওইরূপে পূজিত হন। প্রকৃতপক্ষে যে সকল প্রত্যক্ষ অবতার আজ পূজিত হন তাঁরা হলেন পূর্ণ অবতার–নৃসিংহ, রাম ও কৃষ্ণ।
হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর সঙ্গেই অবতারবাদের বিশেষ সম্পর্ক। যদিও এই মতবাদ কিছু ক্ষেত্রে অন্য কয়েকজন দেবদেবীদের ক্ষেত্রেও প্রযুক্ত হয়। হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলিতে বিষ্ণুর অবতারগুলির ভিন্ন ভিন্ন তালিকা পাওয়া যায়। গরুড় পুরাণ গ্রন্থে বিষ্ণুর দশাবতার ও ভাগবত পুরাণ গ্রন্থে বিষ্ণুর বাইশটি অবতারের বর্ণনা পাওয়া যায়। যদিও শেষোক্ত পুরাণটিতে এও বলা হয়েছে বিষ্ণুর অবতারের সংখ্যা অগণিত। বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বে অবতারবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মতবাদ। হিন্দুধর্মের দেবীকেন্দ্রিক শাক্তধর্মে মহাশক্তির বিভিন্ন অবতারের রূপ বর্ণিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কালী, দুর্গা ও ত্রিপুরাসুন্দরী সর্বাধিক পরিচিত। মধ্যযুগে রচিত কয়েকটি হিন্দু ধর্মগ্রন্থে গণেশ ও শিব প্রমুখ অন্য কয়েকজন দেবতার অবতারের কথা উল্লিখিত হলেও সেই গ্রন্থগুলি অপ্রধান ও স্বল্পপরিচিত। উল্লেখ্য, হিন্দুধর্মের বৈষ্ণব ও শৈব সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্যতম প্রধান পার্থক্যই হল এই অবতারবাদ। ভাগবত পুরাণের প্রথম স্কন্দে সংখ্যাক্রম অনুসারে বিষ্ণুর যে বাইশ অবতারের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা হল–(১) চতুর্সন [ভাগবত ১।৩।৬] (ব্রহ্মার চার পুত্র) (২) বরাহ [ভাগবত ১।৩।৭] (বন্য শূকর) (৩) নারদ [ভাগবত ১।৩৮] (ভ্রাম্যমাণ ঋষি) (৪) নর-নারায়ণ [ভাগবত ১।৩।৯] (যমজ) (৫) কপিল [ভাগবত ১।৩।১০] (দার্শনিক) (৬) দত্তাত্রেয় [ভাগবত ১।৩।১১] (ত্রিমূর্তির যুগ্ম অবতার) (৭) যজ্ঞ [ভাগবত ১।৩।১২] (সাময়িকভাবে ইন্দ্রের ভূমিকা গ্রহণ করা বিষ্ণু) (৮) ঋষভ [ভাগবত ১।৩।১৩] (রাজা ভরত ও বাহুবলীর পিতা) (৯) পৃথু [ভাগবত ১।৩।১৪] (যে রাজা পৃথিবীকে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন) (১০) মৎস্য [ভাগবত ১।৩।১৫] (মাছ) (১১) কূর্ম [ভাগবত ১।৩।১৬] (কচ্ছপ) (১২) ধন্বন্তরী [ভাগবত ১।৩।১৭] (আয়ুর্বেদের জনক) (১৩) মোহিনী [ভাগবত ১।৩।১৭] (সুন্দরী নারী) (১৪) নৃসিংহ [ভাগবত ১।৩।১৮] (নর-সিংহ) (১৫) বামন [ভাগবত ১।৩।১৯] (খর্বকায়) (১৬) পরশুরাম [ভাগবত ১।৩।২০] (পরশু অর্থাৎ কুঠার সহ রাম) (১৭) ব্যাসদেব [ভাগবত ১।৩।২১] (বেদ সংকলক) (১৮) রাম [ভাগবত ১।৩।২২] (অযোধ্যার রাজা) (১৯) বলরাম [ভাগবত ১।৩।২৩] (কৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা) (২০) কৃষ্ণ [ভাগবত ১।৩।২৩] (রাখাল বা স্বয়ং ভগবান) (২১) বুদ্ধ [ভাগবত ১।৩।২৪] (জ্ঞানী) (২২) কল্কি [ভাগবত ১।৩।২৫] (ধ্বংসকারী)। এই বাইশ অবতার ছাড়াও উক্ত গ্রন্থের পরবর্তী অংশে আরও তিন অবতারের কথা আছে–(১) প্রশ্নিগর্ভ [ভাগবত ১।৩।৪১] (প্রশ্নির সন্তান) (২) হয়গ্রীব [ভাগবত ২৭।১১] (অশ্ব) (৩) হংস [ভাগবত ১১।১৩।১৯] (রাজহংস)। কল্কি অবতারের বর্ণনা দেওয়ার পর ভাগবত পুরাণে ঘোষিত হয়েছে, বিষ্ণুর অবতার অসংখ্য। যদিও উপরি উল্লিখিত পঁচিশ অবতারের গুরুত্বই সর্বাধিক। বোঝাই যাচ্ছে বিষ্ণু নামক ব্যক্তিটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও দোর্দণ্ডপ্রতাপ ‘দেবতা’ ছিলেন। তাঁর নাম জড়িয়ে অসংখ্য মানুষ অবতার হয়েছেন। তবে রাম নয়, বেশিরভাগ পুরাণগুলিতে কৃষ্ণেরই আধিপত্য বেশি। বালকাণ্ডের অনেক উপাখ্যান ও ঘটনা যথা গঙ্গোৎপত্তি ও কার্তিকেয় জন্ম, বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্র দ্বন্দ্ব, অহল্যা উদ্ধার, ইন্দ্র কর্তৃক দিতির গর্ভ-ছেদন ইত্যাদি–এগুলি বাদ দিলেও রামায়ণে রামকথার মূল কাহিনিটি বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হত না। বস্তুত এই সমস্ত উপাখ্যানের পরিপ্রেক্ষিতে রামচরিত্রটি দৈবত্ব লাভ করেছে।
