(১) রাষ্ট্র ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন। এই সৃষ্টির পিছনে মানুষের কোনো ভূমিকা নেই।
(২) রাজা হলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তাই ঈশ্বরের ইচ্ছা রাজার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়। সেইজন্য রাজার আদেশ বা নির্দেশ, যা আইনরূপে গণ্য হয়ে থাকে, তা মান্য করা সকল মানুষের একান্ত কর্তব্য। রাজার আইন মান্য না-করার অর্থ হল ঈশ্বরকে অবমাননা করা।
(৩) ঈশ্বরের বিধান অনুসারে রাজপদ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করা যায়। রাজার মৃত্যু হলে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজা হবেন।
(৪) রাজা যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিনিধি সেইহেতু তিনি কখনোই অন্যায় করতে পারেন না। ঈশ্বর ছাড়া তিনি আর কারও কাছে তাঁর কাজের জন্য জবাব দিতে বাধ্য নন।
(৫) ঈশ্বরের প্রতিনিধি এই রাজার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ করা যায় না। এই ধারণা বা তত্ত্ব শুধু ভারতবর্ষের হিন্দুধর্মেই নয়–এই তত্ত্ব মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি ইত্যাদি সব ধর্মেই প্রচার করা হয়েছে।
মনুর বলছেন রাজা কে? রাজশূন্য এই জগতকে রক্ষার জন্য ইন্দ্র, বায়ু, যম, সূর্য, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র এবং কুবের–এই দেবতার সারভূত অংশ নিয়ে পরমেশ্বর রাজাকে সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু এই শ্রেষ্ঠ দেবগণের অংশ থেকে রাজার সৃষ্টি হয়েছিল সেইজন্য তিনি সকল জীবকে তেজে অভিভূত করেন।
“অরাজকে হি লোকেহস্মিন্ সর্বতো বিদ্রুতে ভয়াৎ।
রক্ষার্থমস্য সর্বস্য রাজানমসৃজৎ প্রভুঃ।
ইন্দ্রানিলমার্কাণামগ্নেশ্চ বরুণস্য চ।
চন্দ্রবিত্তেশয়োশ্চৈব মাত্রা নিত্য শাশ্বতীঃ।।
যস্মাদেং সুরেন্দ্রাণাং মাত্রাভ্যো নির্মিতো নৃপঃ।
তস্মাদভিভবত্যেষ সর্বভূতানি তেজসা”। (মনুসংহিতা, সপ্তম অধ্যায়, শ্লোক ৩-৪-৫)
রাজা কী? মনু বলছেন–
(১) তিনি সূর্যের মতো চোখ ও মন সন্তপ্ত করেন। পৃথিবীতে কেউ তাঁকে মুখোমুখি অবলোকন করতে পারে না।
(২) বালক হলেও রাজাকে মানুষ মনে করে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। ইনি মানুষের রূপে মহান দেবতা।
(৩) অতি নিকটে গেলে আগুন একমাত্র সেটাই দগ্ধ করে, কিন্তু রাজারূপ আগুন বংশ-পশু-সম্পত্তি সহ দগ্ধ করে।
(৪) রাজার অনুগ্রহে বিশাল সম্পত্তি লাভ হয়, যাঁর বীরত্বে জয়লাভ হয়, যাঁর ক্রোধে মৃত্যু বাস করে, তিনি প্রকৃতই সর্বতেজোময়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
অর্থাৎ যিনিই রাজা, তিনিই ভগবান। ভগবানের প্রতি যেমন আনুগত্য থাকা প্রয়োজন, তেমনই রাজার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনও বিধেয়। অন্যথায় সে বিদ্রোহী, দেশদ্রোহী। হিন্দি বলয়ে রামই একমাত্র আরাধ্য দেবতা, যিনি একাধারে রাজা এবং ভগবান। একাধারে রাজা ও ভগবান, এমন ‘ভগবান’ তেত্রিশ কোটি দেবতাদের মধ্যে দ্বিতীয়টি নেই। মনুর নির্দেশ বা বিধান অনুসারে রাজা এবং ব্রাহ্মণ উভয়ই ভগবান। এদের ফতোয়ার ভয়ে সাধারণ প্রজা-মানুষরা সর্বদা তটস্থ থাকতেন।
পণ্ডিত অক্ষয়কুমার দত্ত ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ গ্রন্থে কী বলেছেন, সেটা দেখি–যুদ্ধকাণ্ডের ১১৯ সর্গে রাম যে স্বয়ং পূর্ণব্রহ্ম ভগবান, এ কথাটি ব্রহ্মা তাঁকে জানিয়ে দেন–এই অংশটি প্রক্ষিপ্ত বলেই তিনি মনে করেন। তিনি বলেন–কোনো ভক্তব্যক্তি রামায়ণের মধ্যে তাঁর ভাবনা প্রবেশ করিয়েছেন, রামকে বিষ্ণু ও সীতাকে লক্ষ্মী বলে প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে। এমনকি এই অংশে কৃষ্ণের নাম উল্লেখ থাকাতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়, অভিপ্রায়টিও প্রকট হয়। রামের অনেককাল পরে কৃষ্ণকে আমরা পাই। রাম ত্রেতা যুগের, কৃষ্ণ দ্বাপর যুগের–মাঝে কয়েক হাজার বছরের ব্যবধান। পণ্ডিত যোগেশচন্দ্র রায় তাঁর ‘পৌরাণিক উপাখ্যান’ গ্রন্থে লিখেছেন–“রামায়ণে যে কত কবি পরে পরে শ্লোক জুড়িয়া দিয়াছেন, তাহার নির্ণয় দুঃসাধ্য। এক কবি একটা গোটা কাণ্ড, উত্তরকাণ্ড জুড়িয়া দিয়াছেন। বোধহয় তিনিই শ্রীরামকে বিষ্ণুর অবতার করিয়াছিলেন এবং মৃত্তিকা হইতে সীতার জন্ম কল্পনা করিয়াছেন। কিন্তু রামায়ণে শ্রীরাম কুত্রাপি বৈষ্ণবী শক্তি প্রদর্শন করেন নাই।” তা ছাড়া রামায়ণের যুগে আমাদের প্রচলিত দেবদেবতার, অর্থাৎ দুর্গা-কালী-গণেশ-লক্ষ্মী ইত্যাদি দেবদেবীরা আবিষ্কৃত হয়নি। বাল্মীকির যুগ বৈদিক ভাবাপন্ন। তাই হনুমানের কার্যারম্ভের আগে বেদে উল্লিখিত তেত্রিশটি দেবতাদের মধ্য থেকেই স্মরণ করেছেন, অন্য কোনো দেবতা নয়। তাই ত্রিমূর্তি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের উল্লেখ নেই রামায়ণে৷ উল্লেখ আছেন কেবল বৈদিক দেবতা–বসুগণ, রুদ্রগণ, আদিত্যগণ, মরুদগণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়। এঁরা রামায়ণের যুগে পূজ্য হলেও, হিন্দুরা পুজো করেন না। হনুমান প্রণাম জানিয়েছেন রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, রুদ্র, ইন্দ্র, যম, অনিল, চন্দ্র, অগ্নি, মরুদ এবং সুগ্রীবকে–
“নমোহস্তু রামায় সলক্ষ্মণায় দেব্যৈ চ তস্যৈ জনকাত্মজায়ৈ।
নমোহস্তুরুদ্ৰেন্দ্ৰমানিলেভ্যো নমোহস্তু চন্দ্রাগ্নিমরুদগণেভ্যা৷
স তেভ্যস্ত নমস্কৃত্য সুগ্রীবায় চ মারুতি।
দিশঃ সৰ্ব্বাঃ সমালোক্য সোহশোকবনিকাং গতঃ৷৷”
যেটুকু আছে, তা প্রক্ষিপ্ত প্রবেশ হয়েছে বলে অনেক পণ্ডিতগণ মনে করেন। তবে রাবণ হত্যায় আগে রাম সূর্যের আরাধনা করেছিলেন। সূর্যপুজো বহু প্রাচীন, আজও সূর্য অনেকের উপাস্য। পৃথিবীর বহু দেশে সূর্যোপসনার প্রচলন আছে। চন্দ্র, সূর্য, অগ্নি, বায়ু, বরুণদের যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন এবং তিনিই পাপপুণ্যের বিচার করবেন, এমন আধ্যাত্মিকতা রামায়ণে অনুপস্থিত। মহাভারতে রামকে প্রথমেই বিষ্ণুর অবতার বলে স্বীকার করে নিয়েছে–“বিষ্ণু মানুষরূপেণ”। কোথাও কোথাও রামকে বিষ্ণুই বলা হয়েছে। রামায়ণের আদিকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ডেও রামকে বিষ্ণু বলেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
