রাম কি ‘ভগবান’ কিংবা লর্ড কিংবা ‘দেবতা কিংবা ‘ঈশ্বর’ ছিলেন? বাল্মীকির রাম কিন্তু মানুষই, ভগবান নন। রাম ভগবান হলে যুদ্ধক্ষেত্রে এভাবে অসহায় হয়ে পড়তেন না। রামের হয়ে অন্য কেউ যুদ্ধ করে দিতেন না। ভয়ে ভীত হয়ে রণক্ষেত্রে আত্মগোপন করে থাকতে হত না। বাল্মীকির রাম যদি ভগবান হতেন, তাহলে সীতার উদ্দেশে রামের মুখ দিয়ে একাধিকবার অশ্রাব্য বাক্য বের করাতেন না। পিতা দশরথের প্রতি কটুক্তি করাতেন না। পিতার উদ্দেশে লক্ষ্মণ যেমন কটুক্তি করেছেন, তেমনি রামও করেছেন। ভগবানের মুখে অশ্রাব্য ভাষা সামঞ্জস্য নয়। এখানেই শেষ নয়, সীতার মুখ দিয়ে সীতার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা এবং রাবণের
মুখ দিয়ে সীতার শরীরের বর্ণনাও ভগবানোচিত নয়। বাল্মীকির রামায়ণের বালকাণ্ডে ও উত্তরকাণ্ডে (অনেক গবেষক মনে করেন বালকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ড বাল্মীকির রচনা নয়, প্রক্ষিপ্ত) রামকে বিষ্ণুর অবতার’ বলে উল্লেখ করলেও, কবিবর বাল্মীকি স্বয়ং গোটা রামায়ণে (অযোধ্যাকাণ্ড থেকে লঙ্কাকাণ্ড) কোথাও রামকে ‘ভগবান’ বা ‘ভগবানের অংশ’ বা ‘অবতার’ বলেননি। অথচ উত্তরকাণ্ডের কবি রামচন্দ্রকে নারায়ণ, বিষ্ণু বলে সম্বোধন করেছেন।
“রামায়ণ কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়”–একথা পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন। অতএব ধর্মগ্রন্থ। যখন নয়, তখন দেবদেবতাও প্রাসঙ্গিক নয়। যদি বালকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ডে রামায়ণের সকল চরিত্রে দেবত্ব আরোপ না হত, তাহলে রামায়ণকে কে মনে রাখত? অবশ্য রামায়ণের চরিত্রগুলিতে চরমভাবে দেবত্ব আরোপ হয়েছে কৃত্তিবাস, তুলসীদাস, রঙ্গনাথন, দিবাকর ভট্ট প্রমুখের হাত ধরেই।
মূল কাণ্ডপঞ্চকে বাল্মীকি রামচন্দ্রকে ‘নরশ্রেষ্ঠ’ বা ‘নরচন্দ্রমা’-র অতিরিক্ত মর্যাদা দেননি৷ মহর্ষি নারদ বাল্মীকিকে মহাকাব্য রচনা করতে বললে বাল্মীকি সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “দেবর্ষে, এক্ষণে এই পৃথিবীতে কোন্ ব্যক্তি গুণবান, বিদ্বান, মহাবল পরাক্রান্ত, মহাত্মা, ধর্মপরায়ণ, সত্যবাদী, কৃতজ্ঞ, দৃঢ়ত ও সচ্চরিত্র আছেন? কোন্ ব্যক্তি সকল প্রাণীর হিতসাধন করিয়া থাকেন? কোন্ ব্যক্তি লোকব্যবহারকুশল, অদ্বিতীয়, সচতুর ও প্রিয়দর্শন? কোন ব্যক্তিই-বা রোষ ও অসূয়ার বশবর্তী নহেন? রণস্থলে জাতক্রোধ হইলে কাহাকে দেখিয়া দেবতারাও ভীত হন? হে তপোধন! এইরূপ গুণসম্পন্ন মনুষ্য কে আছেন, তাহা আপনিই বিলক্ষণ জানেনে। এক্ষণে বলুন, ইহা শ্রবণ করিতে আমার একান্ত কৌতূহল উপস্থিত হইয়াছে।” ত্রিকালদর্শী নারদ বাল্মীকির কৌতূহলে যারপরনাই পুলকিত হলেন এবং বললেন–
“তাপস! তুমি যে সমস্ত গুণের কথা উল্লেখ করিলে তৎসমুদয় সামান্য মনুষ্যে নিতান্ত সুলভ নহে। যাহাই হউক, এইরূপ গুণবান মনুষ্য এই পৃথিবীতে কে আছেন, এক্ষণে আমি তাহা স্মরণ করিয়া কহিতেছি, শ্রবণ করো।”
এই বলে মহর্ষি নারদ ইক্ষ্বাকুবংশীয় এক নরপতি রামের বিবরণ শোনাতে থাকলেন। অতএব বাল্মীকির রামায়ণ এক অনন্যসাধারণ মানুষের রাজকাহিনি, এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়। তাই বিতর্কেরও কোনো অবকাশ নেই। ‘রসজলনিধি’ গ্রন্থের রচয়িতা ভূদেব মুখোপাধ্যায় বলেছেন–শোনা যায়, ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র বনবাসকালে কালনাথ নামে মহর্ষির কাছে রসবিদ্যা শিক্ষা করে রামরাজীয়’ ও ‘রমেন্দ্রচিন্তামণি’ দু খানি গ্রন্থও লিখেছেন। গ্রন্থাদি তো মানুষই রচনা করে, তথাকথিত অলৌকিক অশরীরি দেবতারা নিশ্চয়ই নয়।
ভারতীয় পুরাণে তিনজন রামকে আমরা পাই। যেমন–পরশুরাম, রাম ও বলরাম। পরশুরাম কুঠারধারী, রাম ধনুর্ধারী এবং বলরাম লাঙ্গলধারী। ত্রেতাযুগের রামায়ণে পরশুরাম চরিত্রটি পাওয়া গেলেও বলরামকে পাওয়া যায় না। কারণ বলরাম চরিত্রটি দ্বাপরযুগের মহাভারতে পাওয়া যায়, যিনি কৃষ্ণের বৈমাত্রেয় বড়ো ভাই। পরশুরামকে রামের পূর্ববর্তী বলে ভাবা যেতে পারে। পরবর্তীকালে পুরাণ রচয়িতারা এবং জয়দেব এই তিনজন রামকেই বিষ্ণুর দশাবতারের তিন অবতার বলে বর্ণনা করেছেন। গবেষকগণ বলছেন পরশুরাম, রাম, বলরামকে বিবর্তনের ধারা হিসাবে দেখলে পরশুরাম ছিলেন কুঠারধারী, তিনি মানব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। এ সময় মানুষ কৃষিকাজ জানতেন না। কাঠ কাটার যুগ, অর্থাৎ কুঠারের সাহায্যে কাঠ কাটত এবং কাঠে আগুন সংযোগ করত। বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হলে এই কুঠারের সাহায্যে আঘাত হেনে আত্মরক্ষা করত। মানবসভ্যতার এটাই কি প্রাথমিক স্তর? অপরদিকে রামচন্দ্র ধনুর্ধারী ছিলেন। এ যুগে মানুষ প্রস্তরখণ্ড, বৃক্ষ, কাঠ, কুঠার ত্যাগ করে তীর-ধনুক হাতে তুলে নিয়েছেন। তীর-ধনুকের মধ্য দিয়ে মানুষের হাতে এল আয়ুধ, আয়ুধ মানে যুদ্ধাস্ত্র। তীর-ধনুক কেবল আত্মরক্ষার হাতিয়ার নয়, আক্রমণেরও হাতিয়ার। বলরাম হল বা লাঙ্গলধারী, ইনি কৃষিকাজের প্রতীক। অর্থাৎ এ সময় মানুষ কৃষিকাজ আয়ত্ত করেছে ধরে নেওয়া যায়। প্রতীকি অর্থে এই বিশ্লেষণে যথেষ্ট অর্থে বহন করে বইকি!
যাই হোক, ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’–সেকালে রাজাই ছিলেন সব অগতির গতি, ত্রাতা। সেই কারণেই হয়তো রাজা ‘পতিতপাবন হে ভগবান’। প্রাচীনকালে রাজাদের ভগবান বা ভগবান তুল্য ভাবা হত বা মান্য করা হত। ‘মনুসংহিতা’ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে মনু খুব উঁচুতে রেখেছেন ক্ষত্রিয় বা শাসক বা রাজাকে এবং ব্রাহ্মণদের। ঋষিবর মনু রাজাদের দেবতা বা ভগবান কেমনভাবে ভাবিয়েছেন সেটা দেখে নিতে পারি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যাঁরা ছাত্র তাঁরা জানেন রাষ্ট্রর উৎপত্তির বিষয়ে ঐশ্বরিক মতবাদ। যাঁরা জানেন না তাঁদের জন্য বিষয়টি পুনরায় উল্লেখ করলে অত্যুক্তি হবে না বোধকরি। প্রাচীনকালে রাষ্ট্রের ঐশ্বরিক মতবাদ বহুল প্রচলিত ছিল। মধ্যযুগে সেন্ট অগাস্টাইন, সেন্ট পল, সেন্ট টমাস অ্যাকুইনাসের লেখনীতে এই মতবাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ১৬৮৮ সালের ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লবের পর থেকে এই মতবাদের গুরুত্ব হ্রাস পেতে শুরু করে। ঐশ্বরিক মতবাদের মূল বক্তব্য ছিল–
