গোটা রামায়ণের circumstances বিচার করলে রাম বা বাল্মীকি কারোরই এ ধরনের আচরণ মানানসই হয় না। তা ছাড়া রামচন্দ্রের পিতা দশরথের যে ৩৫০ পুরস্ত্রীর কথা মুনিবর বাল্মীকি জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু পুরস্ত্রী শূদ্রই ছিলেন। অন্তঃপুরের শূদ্র মাতাদের সঙ্গে সহাবস্থানে থাকা রামের নিশ্চয় শূদ্রদের প্রতি ঘৃণা জন্মানোর কথা নয়। মানুষ যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে সেই পরিবেশ থেকেই সে শিক্ষিত হয়, দীক্ষিত হয়। এমনকি বিশ্বামিত্র রামচন্দ্রের শিক্ষাগুরু, ব্রাহ্মণবিরোধী এমন গুরুর কাছ থেকে শ্রীরামের এমন শিক্ষা হতেই পারে না। নিজেরা ব্রহ্মার মুখ থেকে জন্ম নিয়েছেন বলে প্রচার করে হাঁটু থেকে জন্ম নেওয়া শূদ্রদের ঘৃণা করতেন ব্রাহ্মণরাই, ক্ষত্রিয়রা নন।
শম্বুকহত্যার কাহিনির মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণ গোষ্ঠীকে মহিমান্বিত করার জন্যই কোনো ব্যক্তি পরবর্তীকালে সংযোজন করেছেন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। শূদ্র যে বধযোগ্য সেটা প্রতিষ্ঠা করতেই এই কাহিনির অবতারণা, একথা স্পষ্ট হয়। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে রাম মনুর (বৈবস্বাত) বংশধর। তাই মনুর পথই রামের পথ–এর মধ্যে অস্বাভাবিকতার কী আছে! রাম সূর্যবংশের (ইক্ষ্বাকুবংশ বলেও পরিচিত) উত্তরপুরষ। সূর্যবংশীয় প্রথম রাজা বৈবস্বত মনু। মনুর পুত্র ইক্ষ্বাকু। ইক্ষ্বাকুর জন্ম হয়েছে মনুর নাকের ভিতর থেকে! সে নাক থেকে নিক বা অন্য কথাও থেকে, মনুই জন্ম দিক বা মনুর বউ–ইক্ষ্বাকুর জন্ম হয়েছিল। সেই ইক্ষ্বাকু বংশ-তালিকা হল, যথাক্রমে–(১) ইক্ষ্বাকু (২) কুক্ষি (৩) বিকুক্ষি (৪) বাণ (৫) অনরণ্য (৬) পৃথু (৭) ত্ৰিশংকু (৮) ধুন্ধুমার (৯) যুবনাশ্ব (১০) মান্ধাতা (১১) সুসন্ধি (১২) ধ্রুবসন্ধি (এঁর এক ভাই ছিলেন, তার নাম প্রসেনজিৎ) (১৩) ভরত (১৪) অসিত (১৫) সগর (১৬) অসমঞ্জ (১৭) অংশুমান (১৮) দিলীপ (১৯) ভগীরথ (২০) ককুৎস্থ (২১) রঘু (২২) কল্মষপাদ (১৩) শঙ্খণ (২৪) সুদর্শন (২৫) অগ্নিবর্ণ (২৬) শীঘ্রগ (২৭) মরু (২৮) প্রশুশ্রুক (২৯) অম্বরীষ (৩০) নহুষ (৩১) যযাতি (৩২) নাভাগ (৩৩) অজ (৩৪) দশরথ (৩৫) রাম এবং লক্ষ্মণ। লক্ষণীয় যে এক্ষেত্রে ভরত ও শত্রুঘ্নর কোনো উল্লেখ নেই। ইক্ষ্বাকুর জন্মদাতা মনু, মনুর পিতা সূর্য। অতএব রাম যে মনুবাদের ধারক ও বাহক হবেন, এ আবার নতুন কথা কী! এ তো পরম্পরা!!
রাম সীতাকে বিসর্জন দিয়ে নিজেও বিসর্জিত হয়েছিলেন সরযূ নদীর জলে। রামের বয়স তখন কত হয়েছিল সে বিষয়ে রামায়ণে স্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই। থাকার কথাও নয়, কারণ রাম সিংহাসনে থাকাকালীনই কবিবর বাল্মীকি রামায়ণ রচনা করেছিলেন। রাম না-জন্মাতেই রামায়ণ লেখেননি বাল্মীকি! বাল্মীকি প্রত্যক্ষদর্শী। রাম ও বাল্মীকি উভয়ই সমসাময়িক। রামায়ণ যে রামের জন্মের আগেই লিখিত হয়েছিল তার কোনো আভাস কোথাও পাওয়া যায় না। এটি একটি ভিত্তিহীন উড়ো কথা। বরং বলা যায়, রামায়ণ বাল্মীকির সমসাময়িক ঘটনার চিত্র নিয়েই হয়েছিল। বাল্মীকি যে রামের সমসাময়িক ঋষিকবি, তা রামায়ণের অন্য স্থানে স্বীকৃত আছে। রামের সঙ্গে বাল্মীকির সাক্ষাৎও হয়েছে। বাল্মীকি লঙ্কাকাণ্ডে রামায়ণ সমাপ্ত করেছিলেন, রামের অনুরোধে বাল্মীকি উত্তরকাণ্ড লিখতে শুরু করেন বলে অনেক পণ্ডিত মনে করেন। তবে বর্তমানে যে কলেবরে আমরা উত্তরকাণ্ডকে পাই, সেই উত্তরকাণ্ড বাল্মীকির নয়। অতএব রাম জন্মানোর অনেক অনেক পরেই রামায়ণ রচিত হয়েছে।
আগেই বলেছি, রামকথা বহু আগে থেকেই মানুষের মুখে মুখে ফিরত, বর্ধিত হতে হতে বাল্মীকির কাছে লিপিবদ্ধ হয়েছে। বস্তুত পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এত বড়ো রচনা এই যুগে প্রায় অসম্ভব, সেই যুগে তো কল্পনাই করা যায়। কিন্তু রামায়ণ রচনায় পৃষ্ঠপোষক কারা ছিল, সেইটা বের করা কিন্তু খুবই জটিল কাজ। প্রাচীন যুগে বেশির ভাগ সাহিত্য বা কাব্যচর্চা রাজা-সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই সৃষ্টি হত। এইসব মহান কবি রাজসভা অলংকৃত করে রাখত। বাল্মীকিও হয়তো রামের রাজসভায় কবি ছিলেন। এটা আমার নিরীক্ষণ, বাল্মীকির রামায়ণে বা অন্য কোথাও এমন তথ্য পাইনি। তবে রামজীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে বাল্মীকি কার্পণ্য করেননি। অনার্য রাবণকে রাক্ষস, মানুষখেকো ইত্যাদি বানাতে ‘রাজকবি’ কার্পণ্য করেননি। বাল্মীকি নয়, অন্যান্য কবিয়া রামকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী করেছেন। তাই তাঁরা একজন এলিতেলি লোককে পরাজিত করলে তো রাম হয় না, তাই প্রতিপক্ষকেও বিরাট করে নির্মাণ করতে হয়। তাই রাবণের দশমাথা কুড়ি হাত ইত্যাদিও বলতে হয়। বাল্মীকির রাবণের মাথা একটাই, হাত দুটোই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দ্বন্দ্ব থেকে রাম-রাবণকে দেখা হয়েছে। তাই কেউ কেউ মনে করেন হতে পারে কোনো বৈষ্ণব রাজা, যে কৃষ্ণ ঘরানার বৈষ্ণব থেকে আলাদা একটা বৈষ্ণব ঘরানা খুঁজছিল (যদিও এখন রাম আর কৃষ্ণ দুইজনেই একই বৈষ্ণব ঘরানার অবতার)। শাস্ত্ৰ-পুরাণগুলি লক্ষ করলেই বোঝা যায়, এগুলি ব্যাপক চালাচালি হয়েছে সমসাময়িক উদ্ভূত পরিস্থিতিতে। রাম আর কৃষ্ণের ঘরানা নিয়ে যখন দ্বন্দ্ব, তখন বিষ্ণুর দশাবতারে রাম ও কৃষ্ণ দুজনেই উপস্থিত। অর্থাৎ যাহা রাম তাহাই কৃষ্ণ–একজনই, তিনি বিষ্ণু যখন বৈদিক ধর্ম আর বৌদ্ধধর্মে সংঘাত চরমে, তখনও বিষ্ণুর দশাবতারে বুদ্ধদেবের প্রবেশ ঘটল। অর্থাৎ যাহাই বৈদিক ধর্ম, তাহাই বৌদ্ধধর্ম!
