শম্বুককে রাম হত্যা করেছিলেন এক ব্রাহ্মণের অকাল মৃত পুত্রকে বাঁচাতে। অতএব ব্রাহ্মণ-পুত্র অপেক্ষা শূদ্র পুত্রের জীবনের দাম কানাকড়ি–এ কাহিনি পাওয়া যায় রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে রামের সঙ্গে চণ্ডালের বন্ধুত্ব কেবল কথায়, প্রয়োগে নয়। যে ফল-জল ব্রাহ্মণ-ঋষিদের কাছ থেকে গ্রহণ করা যায়, তা একজন অস্পৃশ্য চণ্ডালের কাছ থেকে গ্রহণ করা যায় না। তাই শূদ্রের সন্তান শম্বুক তপস্বী কৃচ্ছসাধনের অপরাধে তাঁর মুণ্ডুখানি এক কোপে নামিয়ে দেওয়া যেতেই পারে। সে আবার এমন কী! শূদ্রের জীবনের মূল্য আর ব্রাহ্মণের জীবনের মূল্য তো এক হতে পারে না! ব্রাহ্মণ্যবাদের সমর্থক ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায় শূদ্র হত্যা করে নিজেকে কলঙ্কিত করেছেন রাম রাম যে সময় শম্বুককে হত্যা করছেন, সে সময় রামের রাজসভা তাবড়তাবড় ব্রাহ্মণদের রমরমা অবস্থা। রামও সে সময় ব্রাহ্মণদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিলেন।
রামায়ণের যুগে শূদ্র-নির্যাতন তেমনভাবে না-হলেও মহাভারত-পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় শূদ্রদের ক্রমশ ঘৃণার যোগ্য করে তুলেছিলেন। সেই বিষ আজও সেবন করে চলেছেন মানুষ। তবে কেউ কেউ বলতেই পারেন ভালো কাজ করলে শূদ্রও ব্রাহ্মণ হতে পারে। কীভাবে হবে? নিয়ম আর প্রয়োগে যে যোজন-দূর পার্থক্য। ব্রাহ্মণ হতে চাইলেই শূদ্রের ব্রাহ্মণ হওয়া সম্ভব! সম্ভব নয়, তাই চুনি কোটালদের মরতে হয়। সম্ভব নয়, তাই রোহিত ভেমুলাদের আত্মহত্যা করতে হয়। পৌরাণিক যুগ হলে বলা হত চুনি কোটাল, রোহিত ভেমুলারা পূর্বজন্মে দেবতা বা গন্ধর্ব বা কিন্নর-কিন্নরী ছিলেন–এই জন্মে ব্রাহ্মণ্যবাদের স্পর্শ পেয়ে মুক্তি লাভ করে স্বর্গে গেছেন।পৌরাণিক যুগে সব গল্পেই অনার্যদের হত্যা করার পিছনে এরকম মুক্তির গল্প আছে। বিরাধ, শূর্পণখা, মারীচ, বালী, মেঘনাথ, রাবণ সকলেই পূর্বজন্মে হয় দেবতা, নয় গন্ধর্ব ছিলেন। যেমন বিরাধ ছিলেন গন্ধর্ব। গন্ধর্বজীবনে তাঁর নাম ছিল তুম্বুক। কুবেরের অভিশাপেই নাকি তাঁর এই অনার্যজীবন, নাম হয় বিরাধ। রাম বধ করলেই নাকি তিনি গন্ধর্বজীবন ফিরে পাবেন।
গন্ধর্বরা কোথায় থাকতেন? স্বর্গে? কোথায় সেই স্বর্গ? কাবুলের উপত্যকাই গন্ধর্বদেশ–হিন্দুকুশ পর্বতের দক্ষিণে জালালাবাদ, কান্দাহার, পাঞ্জাব ও কাশ্মীরের কিছুটা অংশ। আর্যদের প্রবেশ ঘটেছিল এই অঞ্চল দিয়েই। তাঁরাই অনার্য বিতারিত করেছিল দাক্ষিণাত্যের শ্বাপদসংকুল গভীর জঙ্গলে। বিরাধের সঙ্গে রামের মুখোমুখি হয় দণ্ডকারণ্যে। দণ্ডকারণ্য দাক্ষিণাত্যের পূর্বভাগ। এই মুড়িমুড়কির মতো অন্যায়ভাবে অনার্য হত্যা কাবোর কারোর মনে পুলক আনলেও, ধর্মভাবের উদয় হলেও–আমার হয় না। বাল্মীকি নিজে অনার্যদের প্রতিনিধি হয়েও আর্যদের পৃষ্ঠপোষকতায় আর্যদেরই ঢাক পিটিয়ে গেছেন। পৃষ্ঠপোষকতায় এমনই বাধ্যবাধকতা। সেটাই স্বাভাবিক। যাঁর নুন খাবে তাঁর গুণ তো গাইতেই হবে। আর সেইজন্যই বাল্মীকির রামায়ণ নয়, অন্য রামায়ণের এত কদর, আর সেইজন্যেই রামায়ণকে ঘিরে এত ইমোশন ব্রাহ্মণ্যবাদীদের। সেসব রামায়ণে রাম কেবলই ভগবান, শমিত্র সকলেই রামের ভক্ত। সকলেই রামের হাতে মরে উদ্ধার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছেন। অন্য রামায়ণগুলিতে রাম যে বিষ্ণুর অংশ! এত বছর পরেও তাই রামকে ঘিরে দাঙ্গা। রাম-গ্রহণ রাম বর্জনের লড়াই জারি আছে। রামায়ণ’ যদি অনার্যদের জয়ের ইতিহাস হত, তাহলে এই গ্রন্থ আঁতুরঘরেই বিনাশ করা হত।
ঈশ্বরের চোখে যদি সবাই সমান হত তাহলে তিনি ব্রাহ্মণদের মাথা থেকে আর শুদ্রদের পা থেকে তৈরি করতেন না, কী বলেন? আর মনুসংহিতায় তো বর্ণভেদ আছে ছত্রে ছত্রেই। যেমন, মনু বলেছেন–
“দাসত্বের কাজ নির্বাহ করার জন্যই বিধাতা শূদ্রদের সৃষ্টি করেছিলেন” (৮ : ৪১৩)।
এমন কী হিন্দুধর্মের দৃষ্টিতে শূদ্রদের উপার্জিত ধনসম্পত্তি তাদের ভোগেরও অধিকার নেই। সব উপার্জিত ধন দাস-মালিকেরাই গ্রহণ করবে–এই ছিল মনুর বিধান–
“ন হি তস্যাস্তি কিঞ্চিত স্বং ভর্তৃহার্যধনো হি সঃ” (৮ : ৪১৬)।
এ ধরনের শত শত বর্ণবিদ্বেষী শ্লোক হিন্দু ধর্মগ্রন্থে ছড়িয়ে আছে। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণেও। মহাভারতের কৃষ্ণ যেমন জাত-বিভাজন সমর্থন করতেন, রামায়ণের রামও একই পথে হেঁটেছেন। অবশ্য রামায়ণ মহাভারতেরও অনেক আগের রচনা। মর্যাদা পুরুষোত্তম’, পুরুষের উৎকর্ষের সীমায় উন্নীত রাম এ কেমন পুরুষ! উত্তরকাণ্ডে শম্বুক হত্যায় যে স্বর্গের দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন! কেবল পুষ্পবৃষ্টিতেই থেমে থাকেননি দেবতারা, রামকে সাধুবাদ দিয়ে বলেছেন–
“রাম তুমি দেবতাদের কার্য সম্পন্ন করলে। তোমারই জন্য এই শূদ্রটি স্বর্গভাক হতে পারল না।”
এই আহ্লাদে রাম যে সারা পৃথিবী শূদ্রহীন করতে অভিযানে নামেননি, এই রক্ষে! শূদ্র হত্যায় দেবতারা সকলেই তো রামেরই দলে। এমনিতেই শূদ্রের স্থান স্বর্গ তো দূরের কথা, মর্তেও নেই। নিষাধ জাতি গুহক নাকি রামের বন্ধু, বন্ধুর আতিথ্য কি প্রত্যাখ্যান করা যায়? রাম পেরেছেন। বনবাসের প্রথম পর্বেই রাম প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বন্ধু গুহকের আতিথ্য। যুক্তি হিসাবে রাম বলেছিলেন–তাঁরা বনবাসী, খাদ্য গ্রহণ করবেন না। বরং রথের ঘোড়াদের খাদ্য দিলেই উপকার হয়। বনবাসের ১৪ বছর রাম-লক্ষ্মণরা এক্কেবারে নির্জলা উপবাসে কাটিয়েছিলেন, এমন গল্পো কিন্তু নেই। বরং পরবর্তী সময়ে অত্রি, অনসূয়া, ভরদ্বাজ এবং অন্যান্য মুনিঋষিদের আতিথ্য গ্রহণ করতে তাঁদের আপত্তি ছিল না। মুনিঋষিদের আতিথ্য অবশ্যই গ্রহণ করা যায়, তাই বলে চণ্ডালের ঘরে ‘পুরুষোত্তম’! তবে আমি মনে করি এই শম্বুক হত্যার কাহিনি মুনিবর বাল্মীকি রচনা করেননি। এটি কোনো দুষ্ট ব্রাহ্মণ কর্তৃক প্রক্ষিপ্ত প্রবেশের সম্ভাবনা প্রবল। অনেকে মনে করেন বাল্মীকি নিজেও একজন অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ। তিনি নিজগুণে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করে মহাকবি হয়েছেন। যোগ্যতম না-হলে দেবমন্ত্রী ব্ৰহ্মার আদেশে দেবর্ষি নারদ কখনোই বাল্মীকিকে দিয়ে রামকাহিনি রচনা করাতেন না।
