“আপনার জনের পক্ষে ত্যাগ বা বধ উভয়ই সাধুগণের চক্ষে সমান।”
অতএব আর দেরি কেন! এক্ষণে লক্ষ্মণকে পরিত্যাগ করো। আজীবন অনুচর লক্ষ্মণকে রাজা রাম বর্জন করলেন। এতে লক্ষ্মণ আত্মহত্যা করেন তো অতি উত্তম। সাপও মরল, লাঠিও অক্ষত রইল। রামও জানতেন লক্ষ্মণকে হত্যা না করলেও লক্ষ্মণশূন্য হবে অযোধ্যা। লক্ষ্মণ আত্মহত্যাই করবেন। রামায়ণের কবি বলছেন–
“লক্ষ্মণ সগৃহে আর প্রবেশ না করিয়া জলধারাকুললোচনে প্রস্থান করিলেন এবং সরযূতীরে উপস্থিত আচমনপূর্বক সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বার রুদ্ধ করিলেন। তাহার শ্বাসপ্রশ্বাস আর পড়িল না।”
তবে কি লক্ষ্মণ বিষপান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন? সেকালে তো রাজপুরুষদের আংটির মধ্যে মারণবিষ রাখার প্রচলন ছিলই।
সব শেষ। রাজা রামচন্দ্র প্রকৃতই নিরঙ্কুশ, একাকী। রামের রাজত্বে ‘প্রাণপ্রিয় ভাই’ লক্ষ্মণ নেই, ‘অনুরাগী ভাই’ ভরত নেই, ‘সতীসাধ্বী স্ত্রী সীতা নেই–ব্রাহ্মণ পরিবৃত হয়ে রাম সিংহাসন অলংকৃত করে বসে আছেন। উঁহু, তিনি একাকী নন। রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনরা না-থাকলেও, তাঁর চারধার ঘিরে আছেন ব্রাহ্মণকুল। কে নেই রামচন্দ্রের রাজসভায়! যে অগস্ত্যকে রামচন্দ্র কোনোদিন পাত্তা দিতেন না, সেই অগস্ত্যও রামচন্দ্রের। রাজসভা আলোকিত করে বসে আছেন। আলোকিত বসে আছেন বশিষ্ঠ, বামদেব, আঙ্গিরস, কাশ্যপ, ভৃগু, মার্কণ্ডেয়, কাত্যায়ন, কুৎসের মতো অসংখ্য ব্রাহ্মণকুল। গোটা রামায়ণে অগস্ত্য মুনির তেমন উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন হওয়াতেই তিনি আবির্ভাব হয়ে গেছেন। রাজদরবারে পাকাপাকি জায়গা করে নেওয়ার জন্যই। যাতে রাজার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তটা পাকা হয়ে যায়। চোদ্দো বছরের মধ্যে একবারের জন্যও অগস্ত্য মুনি অযোধ্যায় আসেননি ভরতের রাজসভায় স্থান পাওয়ার জন্য। কারণ তিনি জানতেন ভরতের রাজসভায় এসে তেমন সুবিধা করতে পারতেন না। ভরত অত সহজ সরল নন। তিনি জানতেন ভরতকে বশ করার মতো কোনো উপায় তাঁর জানা নেই। কিন্তু রামকে বশ করার মতো হাজার উপায় আছে। সেই কাজটাই শুরু দিলেন মুনি অগস্ত্য। কাজটা অবশ্যই আপ্ত-সহায়ক বা স্তাবকের। অর্থাৎ রাজা রাম ঠিক কতটা বীর তারই ফোলানো-ফাঁপানো গল্প। বলতে থাকলেন তাঁরা কত বড়ো বীর ছিলেন, সেই শত্রুপক্ষকে করেন যিনি হত্যা করেছেন সে তো ততধিক বীর। এমন বীরদের তিনি হত্যা করেছেন, পরাস্ত করেছেন, পর্যদস্ত যে তাঁকে দেবতারাও কাবু করতে পারেননি। যে কাজ দেবতারাও পারেন না, সেই কাজ রাম পেরেছেন। অতএব রাম বীরশ্রেষ্ঠ। লঙ্কাকাণ্ডে রাবণ প্রায় এলিতেলিই ছিল। সুগ্রীবের রাজশক্তির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় রাবণবধ রামের গরিমা তেমন উজ্জ্বল হয় না। এমন মানুষকে মেরে রাজার বীরত্ব প্রকাশ পায় না। তাই উত্তরকাণ্ডে এসে অগস্ত্য বলতে থাকলেন রাবণের পূর্বজন্ম, রাবণ কীভাবে ক্রমশ ভয়াল-ভয়ংকর হয়ে উঠতে থাকল। এই পূর্বজন্ম বর্ণনার মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হল রাবণ কতটা ভয়ংকর এবং অবধ্য ছিল। শুধু রাবণ বা রাবণের বংশপরিচয় নয়, একই সঙ্গে বানরদেরও পূর্বজন্মের কাহিনি শোনানো হল রামকে। এখানেই শেষ হয় না–মুনিঋষিরা রামচন্দ্রকে নারায়ণ, বিষ্ণু পর্যন্ত বলতে থাকলেন। নিজের প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে। পারিষদবর্গ, অগস্ত্য ও অন্যান্য মুনিরা ঢাক পিটাচ্ছেন, আর রাজা রাম নিষ্ঠাভরে শুনছেন। রাজার গুণগান করে রাজাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে কিছু প্রাপ্তির আশা করার মতো মানুষ প্রাচীন যুগেও ছিল, আজও আছে।
যে বশিষ্ঠের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সক্রিয়তায় রামকে বনবাসে গিয়ে অশেষ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল, জীবন বাজি রাখতে হয়েছিল, যে রামচন্দ্র বিশ্বামিত্রের সান্নিধ্যে ব্রাহ্মণদের একাধিপত্যের বিরোধী ছিলেন–সেই বশিষ্ঠই এখন রামের সবচেয়ে কাছের মানুষ, প্রধান উপদেষ্টা। এ সেই বশিষ্ঠ, যিনি তাঁর ব্রাহ্মণ সেনাপতিদের রাজপুরিতে প্রবেশ ঘটিয়ে দশরথকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন, যেদিন রামের রাজপদে অভিষেক হওয়ার কথা। বশিষ্ঠ রামের জমানাতেও মন্ত্রী, পুরোহিত এবং কুলগুরু। রামচন্দ্র বিলক্ষণ জানেন, বশিষ্ঠ অতীব শক্তিধর। তাঁকে অবজ্ঞা করলে ফল ভালো হবে না। নিজের সিংহাসন বাঁচানোও সম্ভব হবে না। অবস্থাভিজ্ঞ রাম বুঝেছিলেন কালোপযযাগিতা ও উদ্দেশ্যসিদ্ধিই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। বশিষ্ঠের বিরোধিতা মানে নিজের পায়ে নিজেই কুড়োল মারা। অতএব ব্রাহ্মণদের দাসত্ব স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। সেই ব্রাহ্মণদের সংস্পর্শে ও সহাবস্থানে রাজা রাম ব্রাহ্মণ্যবাদের পূজারী হয়ে গেলেন, হলেন চতুর্বর্ণের ধারক ও বাহক।
রামচন্দ্রের এই পরিবর্তনের প্রভাব উত্তরকাণ্ডের কবির লেখনীতে। যেখানে ব্রাহ্মণদের মঙ্গলার্থে শম্বুকের গলা কেটে হত্যা করলেন রাম। রামচন্দ্রের খুনি হাত দিয়ে ব্রাহ্মণ্যধর্মের নব-অভ্যুত্থান হল। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া গেল ব্রাহ্মণদের টক্কর দিলে শম্বুকদের এই দশাই হবে। এটাই উত্তরকাণ্ডের শিক্ষা। শম্বুকরা আজও অবনত হয়েই রইলেন। সে যুগের মানুষরা অস্পৃশ্য শূদ্রদের চুমো খেতেন এটা কেউ আগুন ছুঁয়ে বললেও বিশ্বাসযোগ্য হয় না। রামও ব্যতিক্রম নন। চতুবর্ণ সৃষ্টিকারী ব্রাহ্মণগণ এই বিভাজনে সদা ব্যস্ত ছিলেন। সে যুগেও, এ যুগেও।
