এর মধ্যে অবশ্য গর্ভলক্ষণ দেখে সীতাকেও পরিত্যাগ করা হয়ে গেছে গভীর ও শ্বাপদসংকুল জঙ্গলে। পত্নীপ্রেমে পাগল রামচন্দ্রের কাছে সীতা হলেন চক্ষুশূল। বাল্মীকি রামকে বললেন ‘নেত্ররাগী’। লক্ষ্মণকে দিয়েই সীতাকে পরিত্যাগ করার মতো পাপ কাজটি করানো হয়েছিল। লক্ষ্মণ জানতেন না যে, সীতা গর্ভবতী ছিলেন। যখন জানতে পারলেন তখন সীতা গভীর জঙ্গলে পরিত্যক্ত। লক্ষ্মণ বাকরুদ্ধ হলেন।
রামের নজরে রইল বাকি এই লক্ষ্মণ। না না, বাকি থাকবে কেন? ভ্রাতৃবৎসল রামের ভ্রাতৃপ্রেমও উধাও হল। লক্ষ্মণও হলেন চক্ষুশূল। অতএব লক্ষ্মণকেও অযোধ্যায় রাখা যায় না। তিনি নিরাপদ নয় মোটেই। কারণ–লঙ্কাযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে লক্ষ্মণ রামের কাজকর্মকে অপছন্দ করেছেন। সীতাকে আগুনে ঠেলে দেওয়ায় বিরক্ত হয়েছেন, সীতাকে পরিত্যাগ করার বিরক্ত প্রকাশ করেছেন, সীতাকে পোড়ানোর জন্য লক্ষ্মণকে চিতা প্রস্তুতের আদেশ দেওয়ার জন্য ক্রোধী হয়েছেন। রামের এইসব গর্হিত কাজ লক্ষ্মণ মন থেকে অনুমোদন করতে পারেননি। এহেন আনুগত্যহীনতায় রামও ক্ষিপ্ত। অতএব এহেন লক্ষ্মণকে পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। রাজার কাজে দ্বিমত পোষণ! কিন্তু কীভাবে লক্ষ্মণকে বর্জন করা সম্ভব? লক্ষ্মণের মতো সর্বক্ষণের সঙ্গী ও সহযোদ্ধাকে ত্যাগ করা তো সহজ কথা নয়! লোকে কী বলবে? রাজ্য-সিংহাসন-রাজা হওয়ার লোভও লক্ষ্মণের কখনোই ছিল না। অতএব লক্ষ্মণকে রাজ্য ধরিয়ে অযোধ্যা থেকে সরানো যাবে না। অতএব–মহর্ষি অতিবলের দূত কাল তাপসের বেশে রাজদ্বারে এসে তাঁর নিজের পরিচয় দিলেন এবং দ্বাররক্ষী লক্ষ্মণকে জানালেন তিনি রাজা রামের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাতে আগ্রহী। কাল যাতে রামের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করতে পারেন তার সব ব্যবস্থাই করে দিলেন। কে এই অতিবল? কেই-বা অতিবলের দূত কাল? গোটা রামায়ণ, গোটা মহাভারত, সমগ্র পুরাণ তন্নতন্ন করেও এঁদের দেখা মেলে না। শুধু রামায়ণের এই অংশটুকুতেই তাঁদের পরিচয়। উদ্দেশ্য কী? দ্বাররক্ষীর মতো নিকৃষ্ট কাজে কেন লক্ষ্মণকে নিয়োগ করলেন রাজা রাম? অন্য দ্বাররক্ষী তো আগেই ছিল। তাকে কেন অপসারণ করে লক্ষ্মণকে নিয়োগ করা হল? এটা তো মর্যাদাহানি! অকারণে রাজা রাম লক্ষ্মণকে দ্বাররক্ষীর দায়িত্ব দেননি। এই দায়িত্বের মধ্য দিয়েই লক্ষ্মণের যবনিকা পতন সম্ভব। কারণ দ্বাররক্ষীর দায়িত্ব দিয়ে রাম লক্ষ্মণকে এটাও জানিয়ে দিলেন–
“স্বয়ং দ্বারে দণ্ডায়মান থাকো। এই ঋষি ও আমার সঙ্গে নির্জনে যাহা কথাবার্তা হইবে যদি কেহ তাহা দেখে বা শুনে সে আমার বধ্য হইবে।”
কী বুঝলেন পাঠক? লক্ষ্মণ বলিপ্রদত্ত! লক্ষ্মণের পরিণতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করাই ছিল। লক্ষ্মণ যখন দ্বাররক্ষীর দায়িত্ব পালন করছিলেন, ঠিক তখনই হাজির সেই ভয়াল ভয়ংকর ক্ৰোধী ব্রাহ্মণ-পুরুষ, তিনি দুর্বাসা। গোটা রামায়ণে তিনি কোথাও নেই, শুধু এইটুকু অংশ ছাড়া। রাজদ্বারে এসে লক্ষ্মণকে দুর্বাসা বললেন–
“তুমি শীঘ্রই রামের সহিত আমার দেখা করাইয়া দাও।”
লক্ষ্মণ জানালেন রাম এখন বিশেষ রাজকার্যে ব্যস্ত আছেন। দেখা করা সম্ভব নয়। একথা শুনে দুর্বাসা স্বভাবদোষে ক্ষিপ্ত হলেন এবং বললেন–
“আমি সবংশে তোমাদের চারভ্রাতার উপর এবং গ্রাম নগর সকলেরই অভিসম্পাত করিব।”
উভয় সংকট–রামরক্ষা না দুর্বাসারক্ষা, দুর্বাসারক্ষা না আত্মরক্ষা! দ্বাররক্ষী হিসাবে তাঁর আত্মরক্ষার কোনো জায়গা নেই। ওটা অনৈতিক, অশাস্ত্রীয়! অতএব স্বেচ্ছায় হাড়িকাঠে গলা বাড়িয়ে দেওয়াই একমাত্র উপায়। রামের অনুমোদন আদায়ের জন্য লক্ষ্মণের প্রবেশ করা মানে মৃত্যুদণ্ডকে বরণ করে নেওয়া। যদি অনুমোদন আদায়ের জন্য লক্ষ্মণ রামের কাছে নাও যান এবং দুর্বাশা যদি রামের সঙ্গে দেখা করতে এসে বিমুখ হয়ে ফিরে যান, তাহলে কি রাম লক্ষ্মণকে ক্ষমাচোখে দেখতেন? উঁহু, ক্ষমাচোখে দেখতেন না। তাহলে দ্বাররক্ষীর শর্ত অত কঠোর ও নিশ্চিদ্র করতেন না, দ্বাররক্ষীর যখন তাঁর প্রাণপ্রিয় ভাই! পৃথিবী খুঁজলে এরকম হাজার সীতা পাওয়া যায়, লক্ষ্মণ তোমার মতো একটিও ভাই পাওয়া যায় না। সেই ভাইয়ের আজ কী পরিণতি! মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও এ যেন বাঘের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়া! লক্ষ্মণ রামের আলোচনাকক্ষে ঢুকে দুর্বাসার আগমনবার্তা দিলেন রামকে। অতিবলের দূতকে বিদায় দিয়ে দুর্বাসাকে অভিবাদন জানালেন রাজা রাম৷
সত্যাশ্রয়ী রাম। এখন তিনি রাজা। তিনি তো প্রতিজ্ঞাভঙ্গের দোষে দুষ্ট হতে পারেন না। একদা শত্রু বশিষ্ঠও রামচন্দ্রকে মনে করিয়ে দিলেন শাস্ত্রকথা–
“প্রতিজ্ঞাভঙ্গে ধর্মক্ষতি। ধর্ম নষ্ট হলে স্থাবর জঙ্গমাত্মক বিশ্ব নিশ্চয়ই ধ্বংস হইবে।”
প্রজারাই-বা কী বলবেন! অতএব তিনি নিরুপায়। নিজের সত্যপালনের জন্য লক্ষ্মণের হত্যা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। লক্ষ্মণ রামচন্দ্রের বধ্য। আদতে রাজা রাম সত্যনিষ্ঠ থাকতে পারেননি। লক্ষ্মণকে হত্যা করেননি, বর্জন করলেন। কারণ নিজের ভাইকে হত্যা করলে দুর্নাম হতে পারে। হিতে বিপরীত হতে পারে। তা ছাড়া বশিষ্ঠ যখন ভিন্ন উপায় বাতলেছেন, তখন খামোকা ঝামেলা বাড়ানোর কী দরকার! ব্রাহ্মণ-পুরুষ বশিষ্ঠ নিদান দিয়েছেন–
