কৌশল্যারও দশরথকে হত্যা করার প্রস্তাবে সমর্থন ছিল। রামকে কৌশল্যা বললেন–
“বৎস! লক্ষ্মণ যাহা কহিল, তুমি তো তাহা শ্রবণ করিলে। এক্ষণে যদি তোমার অভিপ্রেত হয়, তবে ইহার মতাবর্তী হও।”
অসাধারণ বলশালী ও অস্ত্রনিপুণ লক্ষ্মণ এটুকুতেই ছাড়লেন না। তিনি রামকে আরও বললেন–
“আর্য, আপনার এই নির্বাসন-সংবাদ প্রচার না হইতেই আপনি আমার সাহায্যে সমস্ত রাজ্য হস্তগত করুন।”
রাম বিচক্ষণ ব্যক্তি, স্থান-কাল-পাত্রভেদ বিবেচনায় রেখে প্ররোচনায় পা দিলেন না। রাম জানতেন সে শক্তি তাঁর বর্তমানে নেই, যা দিয়ে এই কার্য সমাধা করা সম্ভব। উল্টে প্রাণসংশয় পর্যন্ত হতে পারে। এই মুহূর্তে আওরঙ্গজেবের কথা মনে পড়ছে, যিনি ভাইদের হত্যা করে পিতাকে গারদে চেলে দিয়ে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করেছিলেন। রাজতন্ত্রের রাজাদের সিংহাসন দখলের রাজনীতি মোটামুটি এইরকমই (আওরঙ্গজেবের তুলনা টানলাম বলে আবার রেগে যাবেন না যেন! তুলনা টানলাম এই কারণে যে, ভারতে রাজতন্ত্রের প্রথম প্রতিনিধি যদি রামচন্দ্র হন তো আওরঙ্গজেব শেষতম রাজতন্ত্রের প্রতিনিধি বলাই যায়)। খারাপ লাগার কিছু নেই। ইতিহাস দিয়েই ইতিহাসর বিচার করা ছাড়া উপায় কী! এটাই রাজতন্ত্রের দস্তুর। রামচন্দ্রও সেই রাজতন্ত্রের লাইনকে বিন্দুমাত্র অন্যথা করেননি।
রামচন্দ্রের অযোধ্যায় ফিরে আসার সংবাদ শুনে ভরত অজ্ঞান হয়ে গেলেন কেন?
(এক) ভরত ভেবেই নিয়েছিলেন রামচন্দ্র কোনোদিনই রাক্ষসখোক্ষসদের হাত থেকে বেঁচে অযোধ্যায় ফিরতে পারবেন না। তা ছাড়া ভরত চিত্রকূটে এলে রামচন্দ্র নিজের মুখেই বলেছিলেন, তিনি আর কোনোদিনই অযোধ্যায় ফিরবেন না। অতএব ভরত নিশ্চিন্তেই ছিলেন। দীর্ঘ চোদ্দো বছরের মধ্যে একবারের জন্য ভরত রামচন্দ্রের খোঁজখবর নেননি, এমনকি চোদ্দো বছর পরও আর প্রায় অতিবাহিত হয়ে গেলেও দাদার খোঁজে ভাই বেরোননি। এতদিন পর রামচন্দ্রের ফিরে আসার যেন ভরতের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়া।
(দুই) মৃত্যুভয়। ভরত প্রয়োজনে রামকে হত্যা করতে হবে এই ভেবে অযোধ্যা থেকে চিত্রকূটে চতুরঙ্গ সৈন্যদল নিয়ে পৌঁছেছিলেন, সে ব্যাপারে ভরত নিশ্চয় সচেতন। অতএব রামও একই পদ্ধতিতে সিংহাসন দখল করতে পারে সেই কথা ভেবেই ভীত-সন্ত্রস্ত। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বলে কথা।
যাই হোক, সদলবলে সৈন্যসামন্ত নিয়ে রাম অযোধ্যায় প্রবেশ করেছিলেন। রামের প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই ভরত সিংহাসন ছেড়ে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। যদিও এমন শর্ত ছিল না যে, রাম বনবাস থেকে ফিরে এলেই রাজ্যলাভ করবেন। ভরত দিলে তবেই রাজ্য পাবেন। তবে প্রতিশোধ তো নিতেই হবে। অতএব বলপ্রয়োগ নয়, বল প্রদর্শনেই রামের কার্যসিদ্ধি হল। কিন্তু রাম এতটুকুতেই খুশি হবেন কেন? রাজার সিংহাসনে কাঁটা থাকলে চলে! ভরতকে নয়, লক্ষ্মণকে রাম যৌবরাজ্যের দায়িত্ব দিতে চাইলেন। বারবার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু লক্ষ্মণ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন রামের অনুরোধ। রামচন্দ্র যদি ভরতের প্রতি আস্থা রাখতে পারতেন, তবে কখনোই লক্ষ্মণকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে চাইতেন না। প্রথা অনুযায়ী যুবরাজ পদটির জন্য ভরতই একমাত্র দাবিদার। তা ছাড়া লক্ষ্মণও আর রামের অনুগত নন। সীতাকে দাহ করার পর থেকে রাম-লক্ষ্মণের সম্পর্কে ভাঙন ধরেছিল। সীতাকে আগুনে জ্বালানো লক্ষ্মণ মেনে নিতে পারেননি। তারপর অনেক জল গড়িয়ে গেছে যমুনা দিয়ে। লক্ষ্মণ এখন এক স্বতন্ত্র সত্তা। অগত্যা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভরতকেই যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। তবে তা সাময়িক, লোক-দেখানো। ভরত কখনোই বিশ্বস্ত নন। যুবরাজ করেছেন বটে, সেইসঙ্গে তাঁকে নজরবন্দিও করে রেখেছেন। অযোধ্যা নগরীর বাইরে পর্যন্ত বেরতে দেননি ভরতকে।
রামচন্দ্র অযোধ্যার উপযুক্ত রাজা। উপযুক্ত রাজার সিংহাসন কখনো কাঁটাযুক্ত হতে পারে না। রাজারা কখনো কাঁটা পছন্দ করেন না। কাঁটা নির্মূল করাটাই রাজার প্রথম কাজ। না-হলে সুষ্ঠুভাবে রাজ্য পরিচালনা সম্ভব নয়। অতএব কাঁটা মুক্ত করার অভিযানে সক্রিয় হতে হবে। নিরঙ্কুশ ক্ষমতাই রাজার মনোবা। প্রথম টার্গেট ভরত, বড়ো কাঁটা। যৌবরাজ্যে অধিষ্ঠিত করার কয়েকদিনের মধ্যেই অযোধ্যা থেকে বহু দূর অন্য একটি ভূখণ্ডের দায়িত্ব অর্পণ করে পাঠিয়ে দিলেন। কূটনীতিতে বালখিল্যতার কোনো জায়গা নেই। রামচন্দ্র সেটা বিলক্ষণ জানতেন। কেকয় রাজ্যের রাজা যুধাজিৎ (ভরতের মামা) কেকয় রাজ্যের পার্শ্ববর্তী গন্ধর্বদের পরাজিত করে গন্ধর্বদেশ অধিকার করতে বললেন। কারণ ওই যুদ্ধ প্রাণঘাতী ছিল, রামের সেটা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি। অতএব এমন মরণযুদ্ধে ভরতই শ্রেয়। পাঠিয়ে দিলেন ভরত ও ভরতের দুই পুত্রকে। অযোধ্যা চিরকালের জন্য ভরতমুক্ত হল। এমনিতেই লঙ্কাযুদ্ধের পর রামচন্দ্র আর কোনো যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেননি। যুদ্ধের প্রয়োজন হলে ভরত ও তাঁর শাকরেদ শত্রুঘ্নকে ঠেলে দিয়েছেন। রাজত্বকালের প্রথম বছরেই শত্রুঘ্নকে পাঠিয়ে দিলেন মথুরায় লবণাসুরকে হত্যা করতে৷ অযোধ্যা শত্রম্নমুক্ত হল। ভরতের কাছ থেকে শত্রুঘ্নকে বিচ্ছিন্ন করেও দেওয়া গেল। ভরতের শক্তিক্ষয় হল। ভরত গন্ধর্বদেশ জয় করে ওখানেই থেকে গেলেন এবং শত্রুঘ্নকে মথুরার রাজপদে রাম অভিষিক্ত করে দিলেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। সঙ্গে লবণকে হত্যা করার জন্য চার হাজার ঘোড়া, দুই হাজার রথ আর একশো হাতি পাঠিয়ে দিলেন। সেনাদের একমাস আগে পাঠিয়ে দিয়ে শত্রুঘ্নকে একা শরাসন হাতে দিয়ে পাঠালেন। অযোধ্যায় ফিরে আসার কোনো অনুমতি ছিল না শত্ৰুগ্নর। পাছে অযোধ্যা আক্রমণ করে বসে সেই সতর্কতায় কি সৈন্যবাহিনীসহ শত্ৰুগ্নকে অযোধ্যায় অবস্থান করতে দেননি?
