ভরত যেমন চতুরঙ্গ সৈন্যবাহিনী নিয়ে রামের সাক্ষাতে গিয়েছিলেন, রামও তেমনি অযোধ্যায় ফিরলেন সুগ্রীব, বিভীষণের মতো মিত্র ও বিশাল বানরসেনাদের নিয়ে। অযোধ্যায় একা ফেরা সাহস রামের হচ্ছিল না। তাই সসৈন্যে অযোধ্যায় প্রবেশ করতে হবে। ভরতকে বিশ্বাস নেই। যদিও রাম চিত্রকুট অবস্থানকালে ভরতকে নিশ্চিত করেছিলেন যে, তিনি আর দশরথবিহীন রাজ্য অবোধ্যায় ফিরবেন না। রাম বলেছিলেন–
“এক্ষণে বনবাসকাল অতিক্রান্ত হইলেও আমি আর সেই নিরাশ্রয় বহুনায়ক অযোধ্যায় ফিরব না।”
তখন তো রাম নির্বাসিত, কিন্তু এখন নির্বাসনের সময় উত্তীর্ণ। নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে এই নির্বাসিত চোদ্দো বছরে উপলব্ধি করেছেন, সিংহাসন-রাজত্ব বড়োই প্রয়োজন। এই চোদ্দো বছরে ভরতকে হাড়েহাড়ে চিনেছেন রাম। নির্বাসনের চোদ্দো বছর তো নয়ই, এমনকি নির্বাসন উত্তীর্ণের আট মাস পরও ভরত একবারের জন্য রামের খোঁজ করেননি। রামের অযোধ্যায় ফেরার পর ভরতের আত্মসমর্পণ করার কথা। কিন্তু ভরত ভুলেই গিয়েছিলেন রাম নামে কেউ এ পৃথিবীতে কেউ আছেন। এ ভরতকে কীভাবে বিশ্বাস করা যায়, কীভাবে আস্থা আর ভরসা করা যায়?
যে বিভীষণ ছাড়া সীতা উদ্ধার কার্যত অসম্ভব ছিল, সেই বিভীষণকেও রাম এখন বিশ্বাস করতে পারছেন না। যুদ্ধশেষে বিভীষণ বলেছিলেন–
“যদি আমার প্রতি তোমার স্নেহ ও সৌহার্দ্য থাকে তবে ভ্রাতা লক্ষ্মণ ও জানকীর সহিত বিবিধ ভোগসুখে। একদিন মাত্র এই লঙ্কায় বাস করে। পশ্চাৎ অযোধ্যা যাইও।”
রাম ভ্রূক্ষেপ করেননি। আসলে রাম ভিতরে ভিতরে রাজায় রূপান্তরিত হচ্ছিলেন বোধহয়। তাই তাঁর কাছে। কেউই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। বিভীষণ, সুগ্রীব কেউই বিশ্বস্ত বন্ধু নন। বিভীষণ আর সুগ্রীবের উপকার কাজ মিটে যেতেই ভুলে গেলেন। অতএব সীতা এমন কোনো অমূল্য সম্পদ নয় যে, তার জন্যে বিভীষণ আর সুগ্রীবের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। বিনিময়ে বিভীষণ লঙ্কারাজ্য পেয়েছেন, মন্দোদরীকেও পেয়েছেন। সুগ্রীব কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্য পেয়েছেন, নিজের স্ত্রীর সঙ্গে বালীর স্ত্রীকেও পেয়েছেন। হিসাব বরাবর। উঁহু, হিসাব বরাবর এখনও হয়নি। আসল কাজটাই তো বাকি। অযোধ্যায় এখনও ভরতরাজ চলছে, এমতাবস্থায় রামের পক্ষে একা যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ভরত ঝাঁপিয়ে পড়তে পরে। তাই এদের প্রয়োজন যতক্ষণ-না মিটছে ততক্ষণ পর্যন্ত মিষ্টি কথায় চিড়ে ভেজাতে হবে। রাম চললেন অযোধ্যায়, এক মুহূর্তও বিলম্ব নয়। বিভীষণকে রথ আনার আদেশ দিলেন। সুসজ্জিত রথে চেপে রাম চললেন অযোধ্যার পথে। সঙ্গী অবশ্যই সসৈন্যে বিভীষণ, সুগ্রীব, হনুমান, রণক্লান্ত রাক্ষসখোক্ষ, বানরসেনাও। লঙ্কা থেকে সুদূর অযোধ্যা। দক্ষিণের শেষপ্রান্ত থেকে উত্তরে। সেকি এমনি এমনি! ভরতকে চমকাতে। একদা ভরতও যে চমকেছিলেন চিত্রকুটে চতুরঙ্গ সৈন্যবাহিনী নিয়ে গিয়ে! প্রথমেই ভরত নয়, পৌঁছোলেন নিকটবর্তী ভরদ্বাজ আশ্রমে। এখানে অবস্থান করে হনুমানকে আদেশ দিলেন, বললেন ভরতের কাছে গিয়ে বলল–
“তুমি অযোধ্যায় গিয়া ভরতকে জানকী, লক্ষ্মণ ও আমার কুশল জানাইয়া কহিও, আমি পূর্ণকাম হইয়াছি। পরে রাবণের সীতাহরণ, সুগ্রীবের সহিত পরিচয়, বালীবধ, সমুদ্র উল্লঙ্ঘন, সীতার অন্বেষণ, সসৈন্য সমুদ্রতীরে গমন, সমুদ্রদর্শন, সেতুনির্মাণ, রাবণবধ; ইন্দ্র ও ব্রহ্মার বরপ্রদান; শঙ্করপ্রসাদে পিতৃসমাগম ও অযোধ্যার নিকট আগমন এই সমস্ত কথা ভরতকে আনুপূর্বিক কহিও।”
রাম আরও বললেন–
“বলিও, রাম শত্রুগণকে পরাজয় ও উৎকৃষ্ট যশোলাভ করিয়া, বিভীষণ, সুগ্রীব ও অন্যান্য মহাবল মিত্রের সহিত আসিতেছেন।”
রাম এও বললেন–
“এই সংবাদ পাইলে ভরতের যেরূপ মুখাকার হয় তাহা এবং আমার প্রতি তাহার কিরূপ মনের ভাব তাহাও জানিও। তিনি কি করিতেছেন এবং তাহার আকার-ইঙ্গিতই-বা কিরূপ ইহা মুখ, বর্ণ, দৃষ্টি ও বাক্যালাপে যথার্থতঃ জানিয়া আইস।”
ভরত সম্বন্ধে রামের এই ভাবনা অমূলক নয়। ভরতের প্রতি রামের ভ্রাতৃপ্রেম এক্কেবারে তলানিতে।
হনুমানের মুখে রামের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বিস্তারিত শুনে ভরত অজ্ঞান হয়ে গেলেন। ভরত বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না রাক্ষস-খোক্ষসদের হাত থেকে বেঁচে রাম অযোধ্যায় ফিরতে পারেন। কিছু বিশ্বাস করার আগেই ভরত দেখতে পেলেন দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়ে গেছেন রাম, বানর, সুগ্রীব, বিভীষণ সকলে। রাম ভরতের কোনো প্রতিক্রিয়াকেই পাত্তা দিতে চাইলেন না। ভরতও বিচক্ষণ ব্যক্তি। দণ্ডকারণ্য থেকে কেউ ফিরতে পারে না, রাম ফিরেছেন। অতএব বিষয়টা হালকা করে দেখা যায় না। এঁরা মহাপরাক্রান্ত। কালবিলম্ব না-করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অযোধ্যা রাজ্য ফিরিয়ে দিলেন রামকে। রামের অভিষেকের দিন অবশ্য ভরতের আত্মীয়রা উপস্থিতই ছিলেন না। হয়তো নিমন্ত্রিত হননি। তবে সীতার পিতা সীরধ্বজ উপস্থিত ছিলেন।
সে যুগে শাসন-ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখতে ভাই-ব্রাদার কিচ্ছু না। প্রয়োজনে পিতাকেও হত্যা করা যেত, নৈতিক বৈধতাও ছিল। সেই মর্মে লক্ষ্মণ দশরথকে হত্যার প্রস্তাব দিয়েছিলেন–
“অদ্য মহারাজের প্রভূত্ব নাশ এবং আপনার প্রভূত্ব সংস্থাপন–এই উভয় কারণে আমার অস্ত্রপ্রভাব প্রদর্শিত হইবে। আমি আপনার চিরকিঙ্কর।” “দেবী পশ্যতু মে বীর্যং রাঘবশ্চৈব পশ্যতু৷৷হনিষ্যে পিতরং বৃদ্ধং কৈকেয়াসক্ত মানসম্।/কৃপনং চ স্থিতং বাল্যে বৃদ্ধাভাবে গহির্তম।”
