“যাঁহার স্তনযুগল শ্রীফলের তুল্য, সর্বাঙ্গ নবপল্লববৎ কোমল … হে মরুবক! জানকীর উরুদ্বয় তোমারই ত্বকের ন্যায় সুদৃশ্য, এক্ষণে তিনি কোথায় … তাল! প্রেয়সীর স্তনযুগল সুপক্ক তাল ফলের তুল্য, যদি তুমি তাহাকে দেখিয়া থাকো তো কৃপা করিয়া বলো … হা! জানকীর নাসিকা কী সুদৃশ্য, দন্ত কী সুন্দর এবং ওষ্ঠই বা কী মনোহর। …তাঁহার বর্তুলস্তনযুগল সতত রমণীয় হরিচন্দন রাগে রঞ্জিত থাকিত, এক্ষণে পঙ্কে লিপ্ত হইয়া গিয়াছে।”
যুক্তিবাদী প্রাবন্ধিক বীরেন্দ্র মিত্রের বক্তব্য অনুধাবনযোগ্য–“রামচন্দ্র কামনিপুণা রসবতী দেবলক্ষ্মীদের দ্বারা মোহিত হয়ে সে সব পরামর্শে কান দেননি। বলেছিলেন, অমন দেবনারী ভোগ করতে পেলে তিনি অযোধ্যা কেন, হিমালয় স্বর্গের প্রভুত্বও কামনা করেন না। এহেন ক্ষত্রিয় পুত্রের দুর্বলতা কোথায়, দেবতারা তা বিলক্ষণ জানতেন। এ সব মানুষকে তাঁরা ঐ দেবনারী দিয়েই বশ করতেন। যতকাল রামকে ব্যবহার করা হয়েছে। দেবতাদের স্বার্থের প্রয়োজন ছিল, ততকাল ঐ দেবনারীদের তাঁরা যোগান দিয়েছেন। বনপথে জানকী ও বেদবতী নানা রঙে ঢঙে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন রামকে। শেষ পর্যায়ে যখন মাথার ওপর, তখন দুই স্বনারীকেই তাঁরা রণক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। কারণ এইসব কামনিপুণা নারীরাই দেবতাদের মূলধন। এই মানুবী-ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহার করে রামচন্দ্রের মতো বহু আত্মসুখপরায়ণ ভারতীয় রাজাকে মাতাল করে তাঁরা আপন কাজ গুছিয়ে নিয়েছেন। ফলে রামের ওপর শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছেন প্রজাসাধারণ। ভরত ও লক্ষ্মণের মধ্যেও অশ্রদ্ধার ভাব সুস্পষ্ট হয়েছে ক্রমশ। অতঃপর রামকে দেবনারী দিয়ে তুষ্ট রাখার প্রয়োজনও ফুরিয়েছে। সেই রমণী-অস্ত্র দেবতাদেরই ভোগ্যা। সুতরাং তাঁরা কেড়ে নিয়েছেন জানকী।”
সে যাই বলুক রাম, অনেক পণ্ডিতদের মতে রাম সীতার প্রতি যথার্থ আচরণই করেছেন। গোটা রামায়ণে রাম ক্রীড়নকমাত্র। বনবাস গমন থেকে অযোধ্যায় রাজা হয়ে বসা পর্যন্ত যে যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে রামের ভূমিকাই-বা কতটুকু! এর পিছনে ছিল আর্যদেবতাদের সক্রিয় কার্যক্রম। এমন অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে, যা রামচন্দ্র অনেকক্ষেত্রে নিজেও বুঝে উঠতে পারেননি। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র, নারদ–এরকম মহাশক্তিধর পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই ছিলেন রামচন্দ্রের ঘটনাবহুল বনবাসজীবনের নেপথ্য-কারিগর। আর প্রচুর মারণাস্ত্র সরবরাহের জন্য বিশ্বামিত্র, অগস্ত্যের মতো ধুরন্ধর ব্রাহ্মণরা তো ছিলেনই। না-হলে কেন তাঁরা এত এত মারণাস্ত্র রামচন্দ্রকে দিতে যাবেন! সেই কারিগররাই শূর্পণখাকে কাজে লাগিয়ে রাবণকে দণ্ডকারণ্যে টেনে এনেছিলেন ‘ডবকা’ সীতার লোভ দেখিয়ে। রামের প্রতিশোধ নিতে রামের বউকে রাবণ অপহরণ করবেন, সেটাই ছিল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। সকলের সামনে দাঁড় করিয়ে রাম যে মহিলাটিকে অপমান করছিলেন তিনিও সীতা নন, তিনি বেদবতী। রাবণ ভুল করে সীতাকে না-এনে বেদবতীকে নিয়ে এসেছিলেন। রাম-লক্ষ্মণ অন্তরালে যেতেই সীতাকে সরিয়ে দিয়ে বেদবতীকে বসিয়ে রেখেছিলেন আর্যদেবতারা, ‘টোপ’ হিসাবে। আর এসবই ছিল পূর্বপরিকল্পিত।
পুরাণকারদের অবশ্য বাল্মীকির সীতার অগ্নিপরীক্ষার বর্ণনা পছন্দ হয়নি। তাই তাঁরাও আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে অন্য গল্প শুনিয়েছেন। উদ্দেশ্য স্পষ্ট : রামচন্দ্রকে নিষ্কলুষ করা। পদ্মপুরাণে জানকী সীতাও নেই, স্বৰ্গবেশ্যা বেদবতীও নেই। বস্তুত বল্মীকির রামায়ণের যেসব ঘটনাগুলি ব্রাহ্মণ্যবাদী পুরাণকারদের পছন্দ করেননি সেইসব ঘটনাগুলি পুনঃনির্মাণ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই এমন সব ঘটনা এবং তার ব্যাখ্যা করেছেন, যা বাল্মীকি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। তিনি সে সময় বেঁচে থাকলে ঠাটিয়ে চড় কষিয়ে দিতেন। আর পুরাণের সেইসব ঘটনাবলি শিরোধার্য করে বাল্মীকি-পরবর্তী কবিরা কাব্য করেছেন। পদ্মপুরাণে লেখা হয়েছে–অগ্নিপরীক্ষায় যে সীতাকে লেলিহান আগুনে প্রবেশ করতে হয়েছিল, তিনি প্রকৃতই সীতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন ‘মায়াসীতা’ সেই সীতা রামের আদেশ পালনার্থে আগুনে প্রবেশ করেন এবং অদৃশ্য হয়ে যান। বনবাসের আগেই অগ্নিদেবের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, তাঁকে রক্ষা করার জন্য। অগ্নি এক মায়াসীতা নির্মাণ করেন। আসল সীতাকে তিনি রক্ষা করেন। মায়াসীতাকেই রাবণ অপহরণ করেছিলেন। লঙ্কা থেকে ফিরে রামচন্দ্র যে সীতাকে অগ্নিপরীক্ষার নির্দেশ দেন, তিনি মায়াসীতা। তিনি অগ্নি দ্বারা সৃষ্ট। ফলে আগুনে তাঁর কোনো ক্ষতি হতে পারে না। অতএব মায়াসীতা আগুনেই অদৃশ্য হয়ে যায়। পদ্মপুরাণ দাবি করেছে, রামচন্দ্র এসব পূর্বেই জানতেন। তিনি প্রজাদের আবদারে সীতাকে ঠেলে দেননি। অবশ্য রাম যে গর্ভবতী সীতাকে বনবাসে পাঠিয়েছিলেন, তিনি কিন্তু জানকী সীতা।
সীতা, ভরত, লক্ষ্মণ, সুগ্রীব, বিভীষণদের ত্যাগ করে রামচন্দ্র এ সময় প্রায় একা। ক্ষমতা পাওয়ার আগের রাম আর ক্ষমতা পাওয়ার পরের রামের মধ্যে বিস্তর ফাঁক। রাবণ হত্যার পরেই রাম বদলে গেলেন, এ যেন এক অন্য মানুষ। আধুনিক রাজনীতিতেও আমরা লক্ষ করে থাকব–নেতা বা নেত্রীরা বিরোধীতে থাকার সময় এক রূপ, ক্ষমতায় আসার পর সেই নেতা বা নেত্রীদের আর-এক রূপ। কাউকেই আর তোয়াক্কা করেন না তিনি। সংকটকালের সঙ্গীরাও ব্রাত্য হয়ে যায়। যেমন রামের কাছে ব্রাত্য হয়ে যায় লক্ষ্মণ, সুগ্রীব, বিভীষণ, হনুমান, জাম্বুবান প্রমুখেরা। এমনকি সহধর্মিনী সীতাও পর হয়ে যায়। আপন হয়ে যায় একদা শত্রুরা। শত্রুরাও পেয়ে যায় মন্ত্রীসভার গুরু দায়িত্বগুলি। প্রাদেশিক কবিদের হাতযশে এ রামকে আমরা অনেকেই চিনি না।
