আমরা লব ও কুশকে পাচ্ছি উত্তরকাণ্ডে। যে কাণ্ডটি মহর্ষি বাল্মীকির রচনা করেননি বলে অনেক পণ্ডিত মনে করেন। এই লব ও কুশ যে রামচন্দ্রেরই ঔরসজাত সন্তান তেমন কোনো জোরালো ঘটনায় কথা কবি বলেননি। ফলে লব-কুশের পিতৃপরিচয় নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন রয়েই গেছে, সেটা বোধহয় রামচন্দ্রও বিলক্ষণ জানতেন। তাই বোধহয় সীতার সতীত্ব যাচাই। প্রজাদের চাপ নয়, নিজেও সন্দিহান ছিলেন। তাই বোধহয় অবলীলায় বলে ফেলতে পারেন–“নোসাহে পরিভোগায় শ্বাবলীঢ়ং হব্যির্থ।” কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা নয়। লব ও কুশ যখন রামের রাজসভায় রামগান করছিলেন, তখন সভার সকলে বলছিলেন, বালক দুটি অবিকল রাজা রামের মতো দেখতে। তাহলে এত সন্দেহ কেন স্ত্রীকে? সভার উপস্থিত ব্যক্তিদের কথা কি রামের কানে ঢোকেনি, নাকি ঢোকাননি? রাম ঠিক, না সীতা ঠিক? সীতা কি সত্যিই ধর্ষিতা হয়েছিলেন? সীতা প্রসঙ্গে আলোচনার সময় বিস্তারিত বলব।
তাহলে কি রাম “রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম কামগন্ধ নাহি তায়”? অনেকে বলেন রাম সীতার প্রতি তেমন সুবিচার না-করতে পারলেও, রাম দ্বিতীয় কোনো নারীতে উপগত হননি। রাম চরিত্রবান পুরুষ। আমি বলি–রাম পনেরো কিংবা ষোলো বছর বয়সে বিয়ে করেন। বারো বছর দাম্পত্যজীবন ভোগ করেন অযোধ্যাতেই। তখন তিনি রাজপুত্র, রাজা নন। রাজপুত্রের একাধিক নারীসঙ্গের সুযোগ নেই। এরপর যখন রামের বয়স সাতাশ কিংবা আঠাশ, তখন দণ্ডকারণ্যে নির্বাসন। চোদ্দো বছর শ্বাপদসংকুল অরণ্যেই কেটে যায়। রাক্ষস মারতে মারতেই সময় অতিবাহিত হয়। এ অরণ্যে সংগ্রামীজীবনে অন্য নারীতে আসক্ত হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। লঙ্কাযুদ্ধের শেষে যখন রাম অযোধ্যায় ফিরলেন, তখন রামের বয়স বিয়াল্লিশ কিংবা তেতাল্লিশ। এ সময় সীতাকে বিসর্জন দিয়ে অন্য নারীকে গ্রহণ করা সময়ানুগ ছিল না। অতএব বাল্মীকির রাম সীতা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নারী আসক্ত নন। স্ত্রীকে বর্জনের পর অশ্বমেধ যজ্ঞে স্ত্রীকে প্রয়োজন হলেও দ্বিতীয় বিয়ের কথা তিনি ভাবেননি। কাজ মিটিয়েছেন স্বর্ণসীতা নির্মাণ করে।
তা ছাড়া রাম কখনো ভোলেননি পিতা দশরথের কামুকতার কথা। বাতাসে কান পাতা দায় হত পিতার কামুকচরিত্রের জন্য। রাস্তাঘাটের লোকেরা পর্যন্ত যার সম্বন্ধে বলেছে ‘কামাত্মা’, ‘কামবেগবশানুগ’ লক্ষ্মণ যেমন পিতাকে কামুক’ বলে তিরস্কার করেছিলেন, রামও অনুরূপ ভাষায় তিরস্কার করেছিলেন। দশরথ নিজেও বেশ স্পষ্ট করেই জানতেন যে তিনি কামুক। তিনি কৈকেয়ীকে কী বলছেন শুনুন–
“বালিশে বত কামাত্মা রাজা দশরথথা ভৃশ। স্ত্রীকৃতে যঃ প্রিয়ং পুত্রং বনং প্রস্থাপয়িষ্যতি।”
অর্থাৎ পুত্র রাম বনে গেলে লোকে কী বলবে? বলবে কামুক রাজা স্ত্রীর কথায় পুত্রকে বনে পাঠাল। লোকে যে বলে লোকে যে বলবে সে বিষয়ে দশরথ বিলক্ষণ অবগত।
কৈকেয়ী-কামুকত্বেই দশরথ শেষ হয়েছে। রামের বনবাসও সেই কামুকতারই ফল। কামজৰ্জর রাজা তথা পিতা কৈকেয়ীর বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারেননি। সেই কারণেই হয়তো রামও কঠোরভাবে নিজের চরিত্রকে রক্ষা করেছেন। আর যাই-ই বলুক, পিতার মতো কেউ যেন কামুক’ না-বলে, সে ব্যাপারে রাম সদা সতর্ক ও কঠোরব্রত পালন করেছিলেন। পিতার কার্বন-কপি হননি। শুধু রাম নয়–লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন কারোর বিরুদ্ধেই নারীঘটিত চরিত্র নিয়ে কেউ আঙুল তোলার সুযোগ পাবে না। সে যুগে একপত্নীতে সন্তুষ্ট চার ভাই-ই, এ দৃষ্টান্ত বড়োই বিরল। তবে বাল্মীকির রাম ‘একপত্নী’ হলেও, চন্দ্রাবতী রামায়ণ, জৈন রামায়ণে অন্যভাবে রামের আরও তিনখানি স্ত্রীর কথা উল্লেখ আছে।
তাই বলে রাম কামগন্ধহীন ছিলেন, একথা কোনো নিন্দুকও বলবেন না–বাল্মীকিও বলেননি। বাল্মীকির রাম অরণ্যজীবনে বারবার কামাতুর হয়েছেন। সীতাহারা হয়ে রাম যখন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তখন প্রকৃতির কোলে পশুপাখির কামক্রীড়া দর্শন করে বারবার কামদগ্ধ হয়েছেন। অবশ্য পশুদের কামকেলি দর্শন করতে করতে সীতার কথাই মনে পড়ছিল বিরহী রামের। লক্ষ্মণকে ডেকে বলেছেন–“ম্মদনেনাভিবৰ্ত্তেত যদি নপেহৃতা ভবেৎ।” তিনি খোলামনে স্বীকার করেছেন যে, প্রাণীদের রমণ দর্শন করে তাঁরও কাম জেগে উঠছে–
“রমতে কাস্তয়া সার্ধং কামম্ উদ্দীপয়ন্নিব।”
এ হল রাম কামবেপথু বিলাপ। কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডে জানা যাচ্ছে, দীর্ঘ অরণ্যজীবনে স্ত্রীসংসর্গবঞ্চিত লক্ষ্মণকে নিজের কামজ্বরের কথা বলছেন ‘ভগবান রাম–“হে লক্ষ্মণ! আমি কামার্ত। … সীতা ব্যতীত বাস করা আমার পক্ষে অত্যন্ত সুকঠিন।… এক্ষণে যদি আমি পম্পাতটে তাঁহার সহবাসে কালক্ষেপ করি তাহা হইলে ইন্দ্রত্ব কি অযোধ্যা কিছুই চাই না।” লক্ষ্মণ যারপরনাই বিরক্ত হন এবং জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে তিরস্কার করেন–“আপনি শোককে দূরে ফেলুন এবং কামুকতাও পরিত্যাগ করুন।” যে কথা না-বললেই নয়, তা হল–তিনি কখনোই কামের দাস হয়ে পড়েননি। দুরন্ত কামরিপু তাঁর চরিত্রকে কখনোই কালিমালিপ্ত করতে পারেনি। এএখানেই শেষ হয়নি। রামের আদেশে সমুদ্রসৈকতে সৈনাশিবির গড়ে উঠল। তিন ভাগে ভাগ হল সৈন্যদল। নেতৃত্বে সেনাপতি নীল। সবাই যখন যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, রাম সেই অবকাশযাপনে স্ত্রী সীতার কথা ভাবছেন এবং স্ত্রীসুখবঞ্চিত ছোটো ভাই লক্ষ্মণের কাছে প্রকাশও করলেন–“কবে আমি তাঁহার রজোষ্ঠ চারুদর্শন মুখমণ্ডল কিঞ্চিত উন্নত করিয়া উৎফুল্ল মনে চুম্বন করিব। কবেই-বা তিনি তালফলবৎ বর্তুল স্তনযুগল ঈষৎ কম্পিত করিয়া আমাকে গাঢ়তর আলিঙ্গন করিবেন।” এইখানেই শেষ নয়, আরও আছে। শিকার শেষে রাম যখন ঘরে ফেরেন, তখন দেখেন সীতা নেই। সীতার খোঁজে বেরলে জটায়ুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, তখন জানতে পারেন সীতা রাবণ কর্তৃক অপহৃত হয়েছেন। এ সময় সীতাহারা হয়ে রাম বিলাপ করছেন। সাক্ষাৎ বিপদাবস্থায় রামবিলাপ শুনুন–
