তা ছাড়া সীতা অভিযুক্ত, প্রাচীন যুগের বিচারে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি নির্দোষ। রাম রাজা রাজার কাছে রাজার পিতা, মাতা, ভ্রাতা, পুত্র, ভার্যা সম্পর্ক সব তুচ্ছ। কেমন ছিল প্রাচীন যুগে বিচার? হিউয়েন সাঙের ভারত বিবরণ থেকে জেনে নিলে দোষের হবে না নিশ্চয়–কেউ আইন ভাঙলে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে বিষয়টিকে খুঁটিয়ে বিচার করে তবে অপরাধীকে কারাদণ্ড দেওয়া হত। কোনরূপ দৈহিক শাস্তি দেওয়া হয় না। অপরাধীকে সোজাসুজি বাঁচতে বা মরতে ছেড়ে দেওয়া হয় ও মানুষের মধ্যে ধরা হয় না। যদি নীতি নিয়ম ভাঙা হয়, যদি কোনো লোক স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাস ভঙ্গ করে বা জনক-জননীর প্রতি কর্তব্য উপেক্ষা করে তবে তার নাক বা কান বা হাত-পা কেটে দেওয়া হয়, অথবা দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয় বা তাকে জনহীন অরণ্যে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। কোনো দোষী লোককে প্রশ্ন করার বেলায় যদি সে ভোলা মনে সব কথার উত্তর দেয় তবে তদনুযায়ী দণ্ড লঘু করা হয়। যদি অপরাধী একগুঁয়ের মতো অপরাধ অস্বীকার করে চলে বা দোষ-স্খলনের চেষ্টা করে, তবে সত্য খুঁজে বের বিচার নিষ্পত্তির জন্য চার রকমের পরীক্ষার আশ্রয় নেওয়া হয়–(১) জলের দ্বারা, (২) শক্তি প্রয়োগের দ্বারা, (৩) পরিমাপের দ্বারা এবং (৪) বিষের দ্বারা।
জলের দ্বারা : যখন জলের দ্বারা পরখ করা হয় তখন অভিযুক্তকে একটি বস্তার মধ্যে ভরা হয়। বস্তাটি একটি পাথরের পাত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তারপর ওই অবস্থায় তাকে জলে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। যদি সে ডুবে যায় ও পাথরটি ভাসে তবে সাব্যস্ত হয়–সে দোষী। যদি লোকটি ভাসে ও পাথরটি ডুবে যায় তবে সাব্যস্ত হয়–সে নির্দোষ।
শক্তি প্রয়োগ : যখন শক্তি প্রয়োগের দ্বারা পরখ করা হয় তখন সাহায্য নেওয়া হয় আগুনের। তারা একটি লোহার পাত গরম করে ও অভিযুক্তকে তার উপর বসতে বাধ্য করে। তারপর তার পা-দুটি তার উপর রাখা হয়। পরে তার হাতের পাতায় এটি রাখা হয়। আবার জিভ দিয়েও তাকে এটি চাটতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে যদি কোথাও কোনো পোড়া দাগের সৃষ্টি না হয় তবে প্রমাণ হয়–সে নির্দোষ। যদি পোড়া দাগের সৃষ্টি হয় তাহলে প্রমাণ হয়–সে দোষী। যারা দুর্বল ও ভীতু লোক, যাদের সহন ক্ষমতা এ ধরনের পরখের অন্তরায় তাদের বেলায় একটি ফুলের কুঁড়ি নিয়ে তাকে আগুনে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। যদি আগুনের তাপে এটি ফুলের মতো ফোটে, তবে প্রমাণ হয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ। যদি কুঁড়িটি পুড়ে যায়, তবে সাব্যস্ত হয় সে দোষী।
পরিমাপের দ্বারা : একজন মানুষ ও একটি পাথরকে সমানভাবে পাল্লায় রাখা হয়। তারপর তুলনামূলকভাবে কে ভারি আর কে হালকা তাই দেখে দোষী নির্দোষী স্থির হয়। যদি অভিযুক্ত লোকটি নির্দোষ হয় তাহলে তার ওজন পাথরের চেয়ে বেশি হবে। যদি দোষী হয় তবে তবে পাথরটি তুলনায় তার ওজন কম হবে।
বিষের দ্বারা : একটি ভেড়া নিয়ে এসে তার ডান উরুতে একটি ক্ষত করা হয়। তারপর অভিযুক্তের খাবার থেকে খানিকটা নিয়ে তাতে সব রকমের বিষ মিশিয়ে তা সেই ক্ষতের মধ্যে ভরে দেওয়া হয়। যদি সেই বিষের ক্রিয়ায় প্রাণীটি মারা যায় তাহলে প্রমাণ হয় যে মানুষটি দোষী। যদি প্রাণীটি বেঁচে থাকে তবে মানুষটি নির্দোষ সাব্যস্ত হয়।
লক্ষ করুন পাঠক, এগুলি কোনোটাই বিচার বা যাচাই নয়, এগুলি নেহাতই প্রহসন। অভিযুক্তের নিশ্চিত মৃত্যু ঘটানোই এসব হাস্যকর পরীক্ষার উদ্দেশ্য। এতক্ষণ যে অভিযুক্তের শাস্তি বিষয়ে আলোচনা করলাম তার একটাই কারণ, অভিযুক্ত সীতাকে আগুনে ঠেলে দেওয়ার বিষয়টাও দেখতে হবে। কারোকে আগুনে ঠেলে দিলে তাঁর বেঁচে থাকার কথা নয়। আগুনে পুড়ে অভিযুক্ত যে এর ফলে মারা যাবে, এটা জেনেই এহেন যাচাইয়ের বিধান। সতী কি না এটা যাচাইয়ের জন্য সীতাকেও লেলিহান আগুনে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। প্রথমবার যাচাইয়ের পরীক্ষায় বিভীষণ আর লক্ষ্মণের কৌশলে সীতা সে যাত্রায় বেঁচে যান। শ্বাপদসংকুল গভীর অরণ্যে সীতাকে নির্বাসন দেওয়া হলে এবং বাল্মীকি আশ্রয় না-দিলে, সেদিনও সীতার কোনো হিংস্র প্রাণীর পেটে চলে যেত। সীতার তৃতীয় ও শেষবারের মতো সতীত্ব যাচাইয়ে পরীক্ষার সময় লক্ষ্মণ আর বিভীষণ উপস্থিত নেই, ফলে আগুন থেকে বাঁচানোর কৌশল কে প্রয়োগ করবে! তাই আর আগুনে প্রবেশ নয়, মাটির নীচে চলে গেলেন তিনি। এটাই বাস্তব–কোনো অলৌকিক বা ভেলকি নয়।
তা মাটির নীচে কীভাবে গেলেন? ‘হে ধরণী দ্বিধা হও’ বা ‘পৃথিবী বিদীর্ণা হও’–আর অমনি ধরণী দু-ভাগ হয়ে গেল। ধরণী দু-ভাগ হয়ে গেল আর সীতা মাটির নীচে চলে গেল! মাটির নীচে কী আছে? মাটির নীচে কেউ গেলে তাঁর তো পঞ্চত্ব সুনিশ্চিত হয়! তাহলে সীতার পাতালপ্রবেশের যুক্তিটা কী, উদ্দেশ্যটাই-বা কী? যুক্তিবাদী প্রাবন্ধিক বীরেন্দ্র মিত্র লিখেছেন–“সভাস্থ সাধারণ যখন স্তম্ভিত তখন হড়হড় করে পৃথিবী বিদীর্ণ। হলেন, সীতাও রথে চেপে নেমে গেলেন। সর্বসমক্ষে সাধ্বী সীতার পাতালপ্রবেশ ঘটল। আমাদেরও উদ্বেগেরও অবসান হল। কেবল একটি প্রশ্ন, দেবতারা কি আধুনিক কায়দায় একটি নাট্যমঞ্চ আগেই প্রস্তুত রেখেছিলেন, যার সুইচ টিপলে দুই পাটাতন সরে গিয়ে দৈব-আসন সেই গহ্বর থেকে ওঠে নামে? এসব ব্যাপার সেকালে দৈব প্রহেলিকা ছিল, একালে হিন্দি ছায়াছবির সেটে হরদম দেখা যায়।” মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
