তবে এ ঘটনায় রামকে পুরোপুরি দোষারোপ করা যায় না। নেতা-মন্ত্রীদের দুর্নীতিগ্রস্ত বলে যেসব নাগরিকরা নিজেদেরকে চরিত্রবান বলে ভাবতে পছন্দ করেন তাঁদের বলব আয়নার সামনে দাঁড়ান এবং নিজের চোখে চোখ রেখে বলুন আপনি কতটা দুর্নীতিমুক্ত! এক্ষেত্রে স্ত্রীকে ঘৃণা আর পরিত্যাগের জন্য রামের সমালোচনা করলে সেইসব প্রজা তথা নাগরিকদেরও সমালোচনা করতে হবে। কারণ প্রজারাই রামকে খুব বিশ্রীভাবে প্ররোচিত করেছেন, যে প্ররোচনায় রাম পা দিয়ে ফেলেছেন। সব বিষয়েই যে প্রজাদের মতামত নেওয়ার নেই, সেটা ভুলে যাওয়ার জন্যই রামকে মাশুল গুনতে হয়েছে।
সীতাকে প্রাপ্তির পর প্রজাবৎসল রাম যখন প্রজাদের জিজ্ঞাসা করলেন–আমার বিষয়ে প্রজারা তেমন কোনো সমালোচনা করছে কি না (“কাঃ কথা নগরে ভদ্র বৰ্তন্তে বিষয়েষু চা/মামাশ্রিতানি কান্যাহঃ পৌরা জানপদা জনাঃ”)। রাম এমন একটা সমাজে অবস্থান করছেন, সে সমাজ যে রামের সমালোচনা করবেন সেটা তিনি বিলক্ষণ জানতেন। তা ছাড়া রাম নিজেও সীতার ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিহান ছিলেন, নাহলে এতটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। রামের এই দুর্বলতা প্রজারাও বুঝতে পেরেছিলেন নিশ্চয়ই। আর তাই অনধিকার চর্চার’ সুযোগ হাতছাড়া করেননি প্রজারা। ভদ্র নামক জনৈক ধুরন্ধর প্রজা ফরফর করে বলতে শুরু দিলেন–
“হত্বা চ রাবণং সখ্যে সীমান্ধত্য রাঘবঃ।
অমর্যং পৃষ্ঠতঃ কৃত্বা স্ববেশ পুনরানয়ৎ।
কীদৃশং হৃদয়ে তস্য সীতাসম্ভোগজং সুখ।
অঙ্কমারোপ্য তু পুরা রাবণেন বলদ্ধৃতাম৷৷
লঙ্কামপি পুরীং নীতামশোকবনিকাং গতাম্।
রক্ষসাং বশমাপন্নাং কথং রামো ন কুৎস্যতি৷৷
অস্মাকমপি দারেষু সহণীয়ং ভবিষ্যতি৷
যথা হি কুরুতে রাজা প্রজাস্তমনুবৰ্ত্ততে৷৷
এবং বহুবিধা বাচো বদন্তি পুরবাসিনঃ।
নগরেষু চ সর্বেষু রাজন্ জনপদেষু চা।”
অর্থাৎ–রঘুনন্দন রাম, রাবণকে যুদ্ধে হত্যা করেছেন এবং যে সীতাকে রাবণ স্পর্শ করেছেন, সেজন্য কিছুমাত্র ক্ষুব্ধ না-হয়ে পুনরায় সীতাকে নিজঘরে এনেছেন। রাবণ আগেই সীতাকে বলপ্রয়োগে অপহরণ করে লঙ্কাপুরীতে নিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও রামের হৃদয়ে সীতাসম্ভোগসুখ কীভাবে হচ্ছে? সীতা রাক্ষসদের বশীভূতা হয়ে অশোকবনে দিনরাত অতিবাহিত করেছেন, তা সত্ত্বে রাম কেন সীতাকে ঘৃণা করেন না? যা রাজা করেন, প্রজারা তাই-ই অনুসরণ করে। এরজন্য আমাদেরও আমাদের স্ত্রীদের এহেন দোষ মেনে নিতে হবে। জনপদের সমস্ত নাগরিক এমনই নানা কথা বলছেন।
তা ছাড়া রাম কি কোনোভাবে জেনে গেছেন যে, যে সীতাকে লংকা থেকে উদ্ধার করে আনা হয়েছে সে সীতা নয়, বেদবতী। তাই কি রামের এমন রুক্ষ্ম আচরণ, এমন দুর্বিনীত, এমন অমানবিক মুখ তাঁর। পঞ্চবটিতে সীতাহরণে নাটকটা আর্যদেবতারাই রচনা করেছিলেন। রাম-লক্ষ্মণের অনুপস্থিতিতে আর্যদেবতারা পঞ্চবটিতে জানকীকে নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে রেখে বেদবতীকে বসিয়ে রেখেছিলেন। যে নারীকে রাবণ অপহরণ করেছিলেন, সেই নারী স্বৰ্গবেশ্যা বেদবতী–সীতা নয়। তাই পঞ্চবটিতে রাবণের সঙ্গে বেদবতীর সাক্ষাৎ হলে রাবণ যে ভাষায় আদিরসাত্মক শরীর বিষয়ক বর্ণনা করছিলেন এবং যে নারী আপ্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে মজিয়ে শুনছিলেন, সে কখনোই সীতা হতে পারে না। এখানেই শেষ নয়, রাবণের সঙ্গে লঙ্কায় যাওয়ার পথে এবং অশোকবনে অবস্থানকালে যে ভাষায় তিনি বাক্যালাপ করেছেন, তা কোনো সাধারণ নারী করতে পারেন না। এ তো এক কথা। কিন্তু লঙ্কা থেকে ফেরার পর আর্যদেবতারা সকলের অলক্ষ্যে বেদবতীকে সরিয়ে আসল সীতাকে হাজির করেছিলেন। তারপরেও কেন স্ত্রীর প্রতি রামের কু-আচরণ? যিনি রাবণের কাছেই ছিলেন না, তাঁকে কেন রাবণ দ্বারা ধর্ষিতা হওয়ার অপবাদ দেওয়া হবে? তাহলে কি রামচন্দ্র আর্যদেবতাদেরও বিশ্বাস করতেন না? নাকি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রভাব?
ভুললে চলবে না, রামও পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থারও শিকার। দেবর্ষি নারদ কথিত বাল্মীকির রামচন্দ্র ‘দেবতা নন, মানুষ। সে কথা বাল্মীকি রামকাহিনি রচনার শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন। বাল্মীকি নরশ্রেষ্ঠ রামচন্দ্রের কাহিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। এ ব্যাপারে মতান্তরের কোনো জায়গা নেই। সীতার প্রতি রামের যে আচরণ ও ব্যবহার তাতে বোঝা যায় ত্রেতাযুগেও নারীর সম্মান ছিল না, দ্বাপর যুগেও ছিল না, কলিযুগেও নেই। মানুষ’ রামও সেই ব্যবস্থা থেকে মুক্ত নন, মুক্ত নন রামের প্রজারাও। রামায়ণের যুগে নারীর অবস্থান নারীর সম্মান মোটেই সুখকর ছিল না। মুনিবর বাল্মীকি সে ঘটনা বড়ো দরদ দিয়ে বর্ণনা করেছেন। সে যুগে পুরুষ তথা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের যে চোখে দেখতেন কবি সেই ছবিই চিত্রিত করেছেন। রামচন্দ্র ‘পুরুষ’ বই তো নয়। এ প্রসঙ্গে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীও স্পষ্টত বলেছেন–“রাম পুরুষমানুষ, পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের দাম ছিল না। প্রেম বলে কোনো জিনিস তারা বুঝত না–অতএব রাম সীতাকে পরিত্যাগ করেছেন।” এ যুগেও কি সেই চিত্র বিন্দুমাত্র বদলেছে? এখনও কি ঘরের বউ মাসকে মাস তো দূরের কথা একদিন বাড়ির বাইরে অচেনা কারোর সঙ্গে রাতযাপন করলে বিনাপ্রশ্নে ঘরে তুলবেন কোনো পুরুষ? বলা হয়–বউ আর বই একবার অন্যের হাতে গেলে তা পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে না। অতএব বোকার মতো কেবলমাত্র রামের দিকে আঙুল তোলা অর্থহীন। যদি সত্যিই রামের দিকে আঙুল তোলার সাধ জাগে তবে আমি বলব আগে নিজেকে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ান। নিজের দিকেও আঙুল ঘোরান। আসলে শতশত বছর আগেও রামচন্দ্র যেখানে ছিলেন; শতশত বছর পরেও আমরা রামের ভক্তরা সেখানেই পড়ে আছি। এতটুকু বদলাইনি।
