যদন্তরং সিংহশৃগালোর্বনে..যদন্তরং কাঞ্চনসীসলোহয়োঃ…যদন্তরং বায়সবৈনতেয়য়োঃ…।”
তবুও সীতা অপমানিত হয়েছেন নিজের প্রাণাধিক স্বামীর কাছে। যুদ্ধশেষে স্বামী-স্ত্রীর প্রথম সাক্ষাতে দীর্ঘ অদর্শনে সীতার প্রতি রামের প্রেম বিলীন হয়ে গিয়েছিল। সীতাকে লঙ্কাপুরীর বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন বটে, কিন্তু রাম সেইসঙ্গে একথাটাও সীতাকে জানাতে ভোলেনি যে, “যুদ্ধ তাঁর জন্য হয়নি। যুদ্ধে শত্রুকে জয় করেছি। তোমাকেও মুক্ত করেছি। আমার পৌরুষ দিয়ে যা করার আমি তা সব করেছি। বৈরীভাবের এক্কেবারে শেষপ্রান্তে পৌঁছেছি, ধর্ষণ প্রমার্জনা করেছি। শত্রু এবং অপমান একসঙ্গে খতম করেছি। আজ আমার পৌরুষ প্রকাশিত হয়েছে, আজ আমার শ্রম সফল হয়েছে। প্রতিজ্ঞা থেকে উত্তীর্ণ হয়েছি এবং নিজের প্রভূত্ব ফিরে পেয়েছি।”
‘আদর্শ স্বামী’ রাম আরও বলেন–“তোমার কুশল হোক। জেনে রাখো, এই যে যুদ্ধের পরিশ্রম, বন্ধুদের বীরত্বের সাহায্যে যা থেকে উত্তীর্ণ হয়েছি, তা তোমার জন্যে নয়। আমার চরিত্র মর্যাদা রক্ষা করার জন্যে এবং প্রখ্যাত আত্মবংশের কলঙ্ক মোচন করার জন্যেই তা করেছি। তোমার চরিত্র সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে। আমার সামনে তুমি আছ, চক্ষুপীড়াগ্রস্তের সামনে প্রদীপ যেমন পীড়াদায়ক হয় তেমনই। তাই জনকাত্মজা, এই দশদিক পড়ে আছে, যেখানে ইচ্ছা তুমি চলে যাও, আমি অনুমতি দিলাম–তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই। কোন্ সদ্বংশজাত তেজস্বী পুরুষ বন্ধুত্বের লোভে পরগৃহবাস করেছে যে, স্ত্রী, তাকে ফিরিয়ে নেবে? রাবণের কোলে বসে পরিক্লিষ্ট, তার দুষ্ট দৃষ্টিতে দৃষ্টা তুমি, তোমাকে গ্রহণ করে আমি আমার উজ্জ্বল বংশের গৌরব নষ্ট করব?–“অঙ্ক, আরোপ্য তু পুরা রাবণেন বলা ধৃতাম”। যেজন্য যুদ্ধ করেছি তা পেয়েছি, তোমার প্রতি আমার কোনো অভিলাষ নেই, যেখানে খুশি চলে যাও তুমি। আমি তোমাকে বলছি লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব বা বিভীষণ এদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করে নাও।” অথচ এ তো সেই সীতা, যিনি বনবাসের প্রাক্কালে শাশুড়িমাতা কৌশল্যাকে বলেছিলেন–“নাতন্ত্রী বাদ্যতে বীণা নাচক্রো বিদ্যতে রথঃ।/নাপতিঃ সুখমেধতে যা স্যাদপি শতাত্মজা।” অর্থাৎ, তন্ত্রীহীন বীণা বাজে না, চক্ৰহীন রথ হয় না। পতিহীনা নারী শতপুত্রের জননী হলেও সুখ পায় না।
রামের মতো সূক্ষ্ম ধর্মবুদ্ধিযুক্ত ব্যক্তি পরহস্তগতা নারীকে মুহূর্তের জন্যে হলেও কী করে গ্রহণ করবেন! সীতা দুশ্চরিত্র হোন বা না-হোন, সচ্চরিত্র হোন বা না-হোন–তাঁকে ‘ভোগ’ করা রামের পক্ষে অসম্ভব। কুকুরে চাটা ঘি’ যেমন কোনো পুজোয় লাগে না, দুধে কেরোসিন পড়লে যেমন সেই দুধ পানের অযোগ্য হয়ে যায়, মাছের মাথায় পচন ধরলে যেমন সেই মাছ অখাদ্য হয় পরহস্তগত স্ত্রী তথা নারীও তেমন স্বামীর অঙ্কশায়িনী হতে পারে না। রাবণ সীতাকে স্পর্শ করেছিল কি না তা জেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই, রাবণ সীতাকে বলাৎকার করেছিল কি না সেটাও জানার প্রয়োজন নেই। সতীত্ব নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন ত্যাগই একমাত্র সমাধানের পথ। কারণ সীতাকে নিয়ে অযোধ্যায় ফেরার পর প্রজারা রামচন্দ্রকে বলেছে–“কীদৃশং হৃদয়ে তব সীতাসম্ভোগজং সুখম্।/অঙ্কমারোপ্য তু পুরা রাবণেন বলাক্বতাম্।” অর্থাৎ “রাবণ যাকে অঙ্কে আরোপণ করে সবলে হরণ করেছিল, সেই সীতার সম্ভোগে তোমার হৃদয়ে কেমন সুখ হয়?” স্বামীর একনিষ্ঠতায় অভাব থাকলে কেউ আঙ্গুল তোলে না ঠিকই, কিন্তু স্ত্রীকে শুধুমাত্র সন্দেহের বশে ত্যাগ করা চলে! সীতা চরমভাবে অপমানিত হন এবং লক্ষ্মণকে আদেশ করেন চিতা সাজাতে–“অপ্রীতেন গুণৈর্ভর্তা ত্যজায়াঃ জনসংসদি।/যা ক্ষমা মে গতির্গন্তং প্রবেক্ষ্য হব্যবাহন৷৷” অর্থাৎ “স্ত্রীর গুণে যে প্রীত নয় এমন স্বামী যখন জনসভায় স্ত্রীকে ত্যাগ করে তখন সেই স্ত্রীর যে পথে যাওয়া সম্ভব তাই করব, আগুনে প্রবেশ করব।” অর্থাৎ আত্মহননের পথ বেছে নেবেন। বেদনাহত সীতা আগুনে প্রবেশ করেছিল এবং ভেবেছিলেন রাম একাজে বাধা দেবেন। না, রামচন্দ্র বাধা দেননি। লক্ষ্মণও ছিলেন নীরব দর্শকের ভূমিকায়। একথা না বললেই নয় যে, সীতাকে দাহ করার সিদ্ধান্তে লক্ষ্মণ অসন্তুষ্ট ছিলেন। সে কথা লক্ষ্মণ ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন রামকে। এই অংশে এসে দেখা যায়, রাম বা সীতা কেউই একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী বলে সম্বোধন করেননি। সীতা রামকে ‘মহাবাহু বলে সম্বোধন করেছেন এবং রাম সীতাকে ‘বৈদেহী’, ‘মৈথিলী’, ‘ভদ্রা’ বলে সম্বোধন করেছেন। স্পষ্টত বোঝা যায় সম্পর্কটার মৃত্যু হয়ে গেছে। কবি বলেছেন–“ন হি রামং তদা কশ্চিৎ কালান্তকসমোপমম।/অনুনেতুমথো বতুং দ্রষ্টুং বাপ্যশকৎ সুহৃদ৷৷”–রামকে তখন কালান্তক এবং যমের মতো দেখাচ্ছিল, তাঁকে অনুনয় করা তাঁকে কিছু বলা বা তাঁর দিকে চেয়ে দেখার সাধ্যও কোনো বন্ধুর ছিল না।
রাবণের স্পর্শ করার অনেক আগেই অনার্য বিরাধ সীতাকে স্পর্শ করেছিল। আর তখন কিন্তু রামের কিছু মনে হয়নি, যে ঘটনা তিনি স্বয়ং চাক্ষুষ করেছেন। তখন কিন্তু রামের মনে হয়নি তাঁর স্ত্রী পরপুরুষ কর্তৃক ধর্ষিত হয়েছেন। তখন কিন্তু তাঁর স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেননি। বনবাসকালে দণ্ডকারণ্যে বিচরণ করতে করতে রাম লক্ষ্মণ-সীতা বীভৎস রাক্ষস বিরাধের মুখোমুখি। সুন্দরী সীতাকে কোলে তুলে নিলেন ক্রুব্ধ বিরাধ। এবং বলতে থাকলেন–“তোরা জটাধারী ও চীরপরিধারী, অথচ হাতে ধনুক, বাণ, তলোয়ার ব্যবহার করেছিস কেন? সে যা হোক, স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যখন তোরা দণ্ডকারণ্যে ঢুকেছিস, তখন তোদর আর বাঁচার আশা নেই। তোরা কে? আমি রাক্ষস, আমার নাম বিরাধ। এই সুন্দরী আমার স্ত্রী হবে।” লক্ষণীয়, বিরাধ রাক্ষস কর্তৃক সীতা চরম নিপীড়া হলেও রামচন্দ্র একবারের জন্যেও ‘ধর্ষণ’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। একবারের জন্যেও বলেননি ‘কুকুরে চাটা ঘি’, অভোগ্য, অভক্ষ্য। প্রকৃতিও বিচলিত হননি৷ কেন বলেননি? সাইকোলজিটা কিন্তু পরিষ্কার–বিরাধ যখন সীতাকে কাঁধে তুলে চম্পট দিচ্ছিল, তখন সীতা ‘সতীত্ব’ নিয়ে রামের কোনোরূপ প্রশ্নের উদয় হয়নি। অথচ রাবণ যখন জটায়ুর কাছ থেকে জানতে পারলেন রাবণ তাঁর স্ত্রীকে কোলে বসিয়ে নিয়ে গেছে, তখন সীতার ‘সতীত্ব’ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। বিরাধ যখন সীতাকে কোলপাঁজা করে কাঁধে তুলে নিল তখন রাম সাধারণ মানুষ, বিপদগ্রস্ত, অসহায়, তাঁর অনিশ্চিত ভবিষ্যত–এ অবস্থায় এমন দুষ্টভাবনা মাথায় আসার কথা নয়। বরং বিপদের এই দিনগুলিতে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে হচ্ছিল। অপরদিকে যখন রাম সীতাকে ‘অসতী’ হিসাবে অভিযুক্ত করছেন এবং তাঁকে পরিত্যাগ করছেন, তখন তিনি নিরঙ্কুশ বিজয়ী, তখন তাঁর সামনে-পিছনে-ডানে-বায়ে অসংখ্য সুহৃদ মানুষ, তখন তিনি রাজাধিরাজ–এ সময় সীতার মতো ‘অসতী’ নারীর আর কোনো প্রয়োজন নেই রামের। যে সাহস তিনি বিরাধরাক্ষসের সময় দেখাতে পারেননি, তার চেয়ে অধিক সাহস লঙ্কা বিজয়ের পর রামচন্দ্র দেখাতেই পারেন! বস্তত রাম সীতার সতীত্ব নিয়ে যতটা বাড়াবাড়ি করেছেন, দ্রৌপদীর সতীত্ব নিয়ে তাঁর কোনো স্বামীই বিন্দুমাত্র প্রশ্ন তোলেননি। তাই বোধহয় পরে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা পঞ্চসতীর তালিকায় দ্রৌপদীকে রেখেছেন, সীতাকে নয়।
