মনুর মতে রাজা ভগবান বা ভগবানের অংশ–“যস্মাদেং সুরেন্দ্রাণাং মাত্রাভ্যো নির্মিত নৃপঃ।/তস্মাদভিভবত্যেষ সর্বভূতানি তেজসা।/সো অগ্নিৰ্ভবতি বায়ুশ্চ সো অর্কঃ সোমঃ স ধর্মরাটা/স কুবেরঃ স বরুণঃ স মহেন্দ্রঃ প্রভাবতঃ৷” অতএব রাজাও যা, ভগবানও তাই। সে হিসাবে রামচন্দ্র হলেন ভগবানের সন্তান ভগবান। সেই কারণেই হয়তো রাম বনবাসী হয়েও রাজার মতো আচরণ করেছেন, যা ঔদ্ধত্যেরই। প্রকাশ। অনুসন্ধিৎসু পাঠকগণ রাজা ও রাজদণ্ডের বিষয়ে যদি আরও জানতে চান, তাহলে মনুসংহিতার সপ্তম অধ্যায় পাঠ করে দেখতে পারেন। সীতা উদ্ধার করে অযোধ্যায় ফিরে রাজা হওয়ার পরও রাম কোনো হত্যা (উত্তরকাণ্ডে শম্বুক ছাড়া, এ হত্যাও ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায় পড়ে। প্রক্ষিপ্ত) করেছেন বলে শুনিনি। শুধু তাই-ই নয়, রাম তাঁর জীবনে যত হত্যা করেছেন, তার সবটাই ভিন রাজ্যে ভিন দেশে–অযোধ্যায় কিন্তু নয়। নিজরাজ্য অযোধ্যায় তিনি একটাও খুনখারাপি করেননি। এটাও নীতিগতভাবে অন্যায় কাজ। অন্য রাজ্যে, অন্য দেশে ঢুকে সেই দেশের সার্বভৌম নষ্ট করে সেখানকার প্রজাদের হত্যা করা অবশ্যই অন্যায় কাজ। আমেরিকা যেমন এ-দেশে ও-দেশে তাঁদের সেনা পাঠিয়ে যুদ্ধ করে বেড়ায়, নিজের ক্ষমতা বুঝিয়ে দেয়! বনবাস মানে অকাল বানপ্রস্থ। বানপ্রস্থ মানে ফলমূল আহার করা এবং খোলা আকাশের নীচে ঘাসে শয্যা করা। অনেকে মনে করেন, অনার্য রাক্ষসদের উপর্যুপরি কচুকাটা করার পরিণতিই রাবণের সঙ্গে যুদ্ধ। রাবণ সহ রাক্ষসগণ তো অযোধ্যায় গিয়ে গায়ে পড়ে হামলা করেনি! তাহলে কেন এই সংঘর্ষ? এই সংঘর্ষের হোত রামচন্দ্রও নয়, রাবণও নয়–এই সংঘর্ষের হোতা আর্যদেবতারা। রামকে সামনে রেখে আর্যদেবতারা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন। সংঘর্ষের কারণ একটাই–উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ ভারতে নিরঙ্কুশ আর্য-উপনিবেশ বিস্তার করা। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন নয়। বাল্মীকি অন্তত এরকম বক্তব্য রাখেননি তাঁর রামায়ণে। প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়াল করে রামকে শ্রেষ্ঠত্ব দিতেই ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নানা মিথ্যা ব্যাখ্যা করেছেন। বাল্মীকিকে অগ্রাহ্য করে মিথ্যা গল্প ফেঁদেছেন অন্য কবিরা। তাঁদের বর্ণনা অনুসারে রাবণকে বধের যে কারণগুলি দেখানো হয়েছে, তা কেবল রাবণই নয়, প্রাচীনযুগ থেকে মধ্যযুগের শেষভাগ পর্যন্ত প্রায় সব রাজাই এমন চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তাহলে তো সব রাজাকেই কোতল করতে হয়। তাহলে রাম কেবল রাবণকে হত্যা করেই থেমে যাবেন কেন? নারী ধর্ষণ, নারী হরণ, নারী রক্ষণ (হারেমে রক্ষিতা), অন্য রাজ্যের রাজকে হত্যা করা বা বন্দি করে সেই রাজ্য দখল করা–এসব সব রাজাই কমবেশি করতেন। রাবণ কি কোনো ব্যতিক্রম রাজা, যে তাঁকে ঘিরে তাঁকে হত্যা এত আয়োজন?
রাম যখন স্বামী, সেই স্বামী হিসাবে স্ত্রী সীতার প্রতি রামের কেমন আচরণ ছিল, কেমন মর্যাদা দিয়েছেন। প্রাণাধিকা স্ত্রীকে? স্বামী হিসাবে রাম পাবেন গোল্লা। যাঁরা রামের মতো স্বামী চান তাঁদের ভালো লাগবে। মেঘনাদের শক্তিশেল খেয়ে লক্ষ্মণ যখন অজ্ঞান হয়ে ভূলুণ্ঠিত হলেন, তখন রাম বিলাপ করতে থাকলেন–“প্রাণ পেয়ে সীতা পেয়ে কী লাভ আমার? মর্তলোকে খুঁজলে সীতার মতো নারী আরও পাওয়া যাবে। কিন্তু লক্ষ্মণের মতো সচিব ও যোদ্ধা ভাতা কোথাও পাওয়া যাবে না।” এখানেই শেষ নয়, রাম আরও বলেন–“দেশে দেশে স্ত্রী পাওয়া যায়, বন্ধুও পাওয়া যায়, কিন্তু তেমন দেশ মেলে না যেখানে সহোদর ভাই পাওয়া যায়।… তুমি যখন মৃত্যুমুখে পতিত তখন আমার জীবন নিরর্থক, সীতা বা বিজয়লাভ করাও নিরর্থক।” ভ্রাতৃস্নেহে পত্নীপ্রেম ভ্যানিস! স্ত্রী সুলভে মেলে, ভাত ছড়ালে কাকের অভাব! তাই ইচ্ছামতো ত্যাগ করা যায়।
সহোদর ভাই ভরত যৌবরাজ্যে অভিষেক হবেন শুনে রামের একটিই মাত্র অভিযোগ–“আমি পিতার কথায় অগ্নিতে প্রবেশ করতে পারি। কেন পিতা আগের মতো আমায় অভিনন্দন করছেন না? একটি অলীক ব্যাপার আমার চিত্তকে দগ্ধ করছে; রাজা নিজে কেন আমাকে ভরতের অভিষেকের সংবাদ দিলেন না? বললে আমি খুশি হয়েই ভাই ভরতের জন্য সীতা, রাজ্য, প্রাণও দিতে পারতাম।” স্ত্রীকে ত্যাগ করাই নয়, স্বামী হিসাবে রাম স্ত্রী সীতাকে ভাই ভরতের ভোগ্য পর্যন্ত করতে পারেন। সীতা তো কোনো ব্যক্তি নন, নিরেট বস্তুমাত্র।
অথচ ভাবুন তো, যে স্বামী (রাম) স্ত্রীকে (সীতা) ভাইয়ের (ভরত) হাতে তুলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। যে স্ত্রী বলেন–“তোমাকে বাদ দিয়ে আমার স্বর্গে বাস করতেও অভিরুচি নেই। তোমার বিরহে আমি এখানে প্রাণত্যাগ করব।” এহেন পতিব্রতা স্বামী-সোহাগিনী নারীকে মন্দোদরী, তারা, কুন্তীদের (“অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তথা/পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং মহাপাতক নাশনম্৷৷”) মতো এক কাতারে প্রাতঃস্মরণীয় করেননি সমাজপতিরা। সীতা সেই স্ত্রী, যাঁকে লঙ্কাধিপতি রাবণ বিবাহের প্রস্তাব দিলে তিনি স্বামীর প্রতি অগাধ আস্থা জ্ঞাপন করে রাবণকে চরম দৃঢ়তায় বলেন–“তুমি শৃগাল হয়ে সিংহীকে পেতে চাইছ? কাল সাপের মুখে হাত দিয়ে তার বিষদাঁত উপড়াতে চাইছে। কালকূট বিষপান করে স্বস্তিতে থাকতে চাইছ? সূচী দিয়ে চক্ষুভেদ করতে বা জিহ্বা দিয়ে ক্ষুরলেহন করতে চাইছ? রাঘবের প্রিয়াকে তুমি পেতে চাইছ? কণ্ঠে শিলাখণ্ড বেঁধে সমুদ্র উত্তরণ করতে চাইছ? দুই হাত দিয়ে চন্দ্র সূর্য ধরতে চাইছ? তুমি রামের প্রিয়া বধূকে ধর্ষণ করতে চাইছ? জ্বলন্ত অগ্নিকে কাপড় দিয়ে আহরণ করতে চাইছ, তাই রামের কল্যাণী বধূকে হরণ করতে চাইছ? লৌহমুখ শূলের সামনে বিচরণ করতে চাও, তাই রামের অনুরূপ বধূকে পেতে চাইছ? বনে সিংহ ও শিয়ালের যে পার্থক্য, ছোটো খাল ও সমুদ্রের যে পার্থক্য, শ্রেষ্ঠ বীর ও কাপুরুষের যে পার্থক্য, হাতি ও বিড়ালের যে পার্থক্য, গোরুড় ও সাপের যে পার্থক্য, পানকৌড়ি ও ময়ূরের যে পার্থক্য, হাঁস ও শকুনের যে পার্থক্য–দাশরথি রামের সঙ্গে তোমারও সেই পার্থক্য।
