রামচন্দ্রের বীরত্বই শুরু হয়েছে দুর্বল নিশাচরদের বধের মধ্যে দিয়ে, যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বিশ্বামিত্রের মতো ব্যক্তির আদেশে বেশ কিছু নিশাচর হত্যা করেই শুরু হয়ে যায় রামচন্দ্রের বীরত্বপ্রকাশ। পরে অবশ্য দণ্ডকারণ্যে আসার পর রাম হাজার হাজার রাক্ষস জাতি হত্যা করেছেন বলে কাহিনি শোনা যায়, তা সবটা সত্য নয়। এই হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগ কৃতিত্ব আর্যদেবতাদের, যাঁরা রামকে শিখণ্ডী করে দাক্ষিণাত্যে আর্য-উপনিবেশ ঘটাতে চাইছিলেন। দণ্ডকারণ্যে খরদূষণের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় রাম-লক্ষ্মণ-সীতা সকলেই ভয়ে ভীত হয়ে গুহায় লুকিয়ে পড়েছিলেন। খরদূষণের আবির্ভাবে রাম নিজেই লক্ষ্মণকে বলেছিলেন জানকীকে নিয়ে গুহায় লুকিয়ে পড়তে। খরদূষণকে কে বা কারা পরাস্ত করেছিলেন, সে বিষয়ে বাল্মীকি স্পষ্ট করে উল্লেখ না করলেও, যেভাবে আর্যদেবতাদের সমারোহ ঘটিয়েছিলেন এবং তাঁদেরকে দিয়ে খরদূষণের বিরুদ্ধে অস্ত্রপ্রয়োগ করেছিলেন, এ থেকে বুঝে নেওয়া খুব কষ্ট নয় যে এ সংঘর্যে রামের কোনো প্রয়োজন পড়েনি। শূর্পণখাকেও কেউ আহত কিংবা হত্যা করেননি। করবেই-বা কেন? শূর্পণখা তাঁর স্বামীহত্যার বদলা নিতে দাদা রাবণের বিরুদ্ধে ফুঁসছেন। যে-কোনো উপারে দাদা রাবণের বিনাশ চান তিনি। আর সেই কারণেই শূর্পণখা আর্যদেবতাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন এবং রাবণকে প্ররোচনা দিয়ে সীতার অপহরণের জন্যে উজ্জীবিত করেছে। বাকিটা তো ইতিহাস।
রামের অস্ত্রে প্রথম খুন হওয়া রাক্ষস জাতি তাড়কা। লক্ষ্মণ অবশ্য তার আগে তাড়কার নাসিকা-কৰ্ণ ছেদন করে দিয়েছিলেন। তাড়কা নারী, তাই রাম কিঞ্চিত ইতস্তত করলেও বিশ্বামিত্র সেই মুহূর্তে বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন–“এই নারী হত্যার কোনো অন্যায় হবে না। যুক্তি–বনে রাক্ষসরা যখন-তখন ব্রাহ্মণদের আক্রমণ করে, ব্রাহ্মণ তথা মুনি-ঋষিদের যজ্ঞ এবং তপস্যায় বিঘ্ন ঘটায়। এসব ঘটনা ব্রাহ্মণরাই মোকাবিলা করতে পারত, কিন্তু তা না-করে ক্ষত্রিয়দের এই অপকর্মে লেলিয়ে দিত। এর ফলে সাপ তো মরতই, লাঠিও ভাঙত না। খুনের সব দায় ক্ষত্রিয়দের ঘাড়ে, ব্রাহ্মণগণ নিষ্কলুষ। অবশ্য এতে ক্ষত্রিয়গণও গর্বিত বোধ করত। এতে শৌর্য-বীর্যও প্রকাশ পেত। ব্রাহ্মণদের সন্তান যেমন বয়সে ছোটো হলেও পূজ্য, তেমনই ক্ষত্রিয়ের সন্তান বয়সে ছোটো হলেও ক্ষত্রিয়-তেজ দেখাতে পারত। রামও তার ব্যতিক্রম নয়। মনে রাখতে হবে রাম যখন রাক্ষসদের হত্যা করা শুরু করেছে তখন কিন্তু রাম রাজা নন, রাজদণ্ডও তাঁর নেই–তাই কারোকে দণ্ড দেওয়ার অধিকারও তাঁর থাকার কথা নয়। রাম অবশ্যই রাজপুত্র। রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র।
বীর তো সেই, যে বীরদের হত্যা করতে সক্ষম হয়। দু-চারটে ক্ষুদ্র রাক্ষসহত্যায় কি বীর বলা সমীচীন? লঙ্কাযুদ্ধে রাম কয়টা বীর হত্যা করেছেন বা হত্যা করতে পেরেছেন? প্রতিপক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে এক একবার সহস্র সহস্র রাম দেখছেন, কখনো-বা একজন রামই দেখছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে ‘সহস্র সহস্র’ রামের ড্যামি কেন? আসলে রাম যাতে কঠিন লড়াই থেকে নিজেকে গোপন রাখতে পারেন, সেই কারণে দেবসেনারা রামবেশী হয়ে আসল রামকে আড়াল করে রেখেছেন। রাম আদৌ যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন না, উপস্থিত ছিলেন রামের ছদ্মবেশে দেবসেনারা, প্রতিপক্ষের চোখ থেকে রামকে রক্ষা করতে। পুরো যুদ্ধটাই করে দিয়েছেন বানরসেনা ও আর্যদেবতারা। যুদ্ধকালীন বেশিরভাগ সময়ই রামকে রণক্ষেত্রে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। প্রতিপক্ষের একটি বীরও রাম হত্যা করতে পারেননি, বরং যখনই তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন তখন প্রতিপক্ষের আঘাতে মৃতপ্রায় হয়েছেন। অথচ প্রতিপক্ষে পুরো যুদ্ধটাই সর্বদা একজন করে বীরই লড়াই করতে আসতেন, কখনোই সমস্ত বীর একযোগে লড়াই করেননি। অপরপক্ষে রামশিবিরের সমস্ত বীরেরা একযোগে লড়াই করেছেন। হনুমান, জাম্ববান, সুগ্রীব, অঙ্গদ, নীল, নল, দ্বিবিদ, লক্ষ্মণ এবং আর্যদেবতারা একযোগে যুদ্ধ করছেন প্রতিপক্ষের একজন বীরের বিরুদ্ধে। এতগুলি বীর একসঙ্গে নিয়ে রাম একটি বীরের মোকবিলা করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন বারবার। তারপরেও রাম ও তাঁর বীর যোদ্ধরা বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। প্রতিপক্ষের একটি বীরও রামচন্দ্র নিকেশ করতে পারেননি।প্রতিপক্ষের বীর অকম্পন ও বীর ত্রিশিরাকে হত্যা করেছেন বীর হনুমান; বীর প্রহস্তকে হত্যা করেছেন বীর নীল; বীর মহাপার্শ্ব, বীর নরান্তক ও বীর বজ্রদংষ্টকে হত্যা করেছেন বীর অঙ্গদ; বীর ইন্দ্রজিৎ ও বায়ুর সহায়তায় বীর অতিকায়কে হত্যা করেন বীর লক্ষ্মণ; বীর বিরূপাক্ষ ও বীর মহোদয়কে হত্যা করেছেন বীর সুগ্রীব। বীর রাম কাকে হত্যা করলেন? মহাবীর রাবণকে? রাবণের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী মন্দোদরী কী বলছেন, পড়ন–“বোধ হয় স্বয়ং কৃতান্ত ছদ্মবেশে রামরূপে আসিয়া থাকিবেন, তিনি তোমাকে বধ করিবার জন্য এইরূপ অতর্কিত মায়াজাল বিস্তার করিয়াছেন। অথবা বোধহয় ইই তোমাকে বধ করিলেন।” এই সংলাপ-অংশ বাল্মীকির রামায়ণে পাবেন। কোনো কৃত্তিবাসী, তুলসীদাসে পাবেন না।
কেমন ছিল রাম-রাবণের সরাসরি যুদ্ধ? প্রাবন্ধিক বীরেন্দ্র মিত্রের বয়ান আমরা দেখে নিতে পারি–“রামচন্দ্র যখন ভয়ে কাতর, ঠিক তখনই ইন্দ্র-বিমান এসে উপস্থিত। চালক মাতলি রামচন্দ্রকে বিমানে তুলে নিলেন। মাতলি রামকে বিভিন্ন ঐন্দ্রাস্ত্রও দিলেন। রামকে ঘিরে বিমানচারী দেব, দানব, গন্ধর্ব, উরগ, ঋষিরাও রণস্থলের উপর অবস্থান করতে লাগলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন দাক্ষিণাত্যে আর্য-উপনিবেশ স্থাপনের মহাস্থপতি অগস্ত্য।… রামচন্দ্র ধনুকের (যে-কোনো অস্ত্রই ‘ধনু’ নামে অভিহিত হয়েছে রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণে) ছিলায় টান দেওয়ার আগেই দেবতারা রাবণের বিমান ঘিরে আক্রমণ চালিয়েছেন। ওই ভিড়ের মধ্যে রামচন্দ্র হারিয়ে গেছেন। যদি-বা কোথাও তিনি থেকে থাকেন, তবে বহু যুদ্ধে অভিজ্ঞ ইন্দ্র-বিমান রথের চালক মাতলিই তাঁকে পরিচালিত করেছেন। অথবা স্বয়ং ইন্দ্র ওই বিমানে বসে ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করেছেন। বাল্মীকি রামায়ণটি পাঠ করলে ভগবান রামচন্দ্রকে নেহাতই নাবালক মনে হয়।
