তার পরের ঘটনা তো ইতিহাস। একটু বলে নিই–আগেই বলেছি রামায়ণ যদি হয় বশিষ্ঠ আর বিশ্বামিত্রের বিরোধ, তবে মহাভারতও ব্রাহ্মণ দ্রোণাচার্যের সঙ্গে ক্ষত্রিয় দ্রুপদরাজের বিরোধ। সেই বিরোধ থেকেই সংঘর্ষ, মহাভারতের কুরু-পাণ্ডব বংশের পরিণতি। এখানেও লড়াইটা ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণের, কৌরব-পাণ্ডবরা এ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এই দ্বন্দ্বকে তরান্বিত করতে সাহায্য করেছিলেন তাঁদের কুচক্রী মামা শকুনি। তবে রামায়ণের এই আপাতনিরীহ সংঘর্ষে কেবল বিশ্বামিত্র-বশিষ্ঠকে দায়ী করা যায় না। ফাঁক ছিল রাজপরিবারেই। দুই ঋষি কেবল এই ফাঁকটাকেই কাজে লাগাতে সমর্থ হয়েছিলেন। বশিষ্ঠ ছিলেন কুলগুরু। বশিষ্ঠ জানতেন রাজসভায় শ্রীরামচন্দ্রের আধিপত্য থাকলেও, রাজঅন্তঃপুরে ভরত তথা কেকয়বংশীয়দের আধিপত্য ছিল অপ্রতিরোধ্য। রামের পক্ষে যেমন লক্ষ্মণ ছিলেন, তেমনই ভরতের পক্ষে শত্রুঘ্ন ছিলেন। বস্তুত লক্ষ্মণ ছিলেন শ্রীরামের অঙ্গরক্ষক, যে কর্তব্য থেকে তিনি একবার জন্যেও বিচ্যুত হননি৷ অরণ্যে যত নারীহত্যা সব লক্ষ্মণই সম্পন্ন করেছেন। অপরদিকে শত্রুঘ্ন ছিলেন ভরতের অঙ্গরক্ষক, সেই কারণে লক্ষ্মণ শ্রীরামের সঙ্গে বনবাসে গেলেও, শত্রুঘ্ন কিন্তু কর্তব্যের খাতিরে ভরতের সঙ্গেই থেকে গেলেন। লক্ষ্মণ যতটা-না শ্রীরামচন্দ্রের ভাই ছিলেন তার চেয়ে বেশি ছিলেন দাদার দেহরক্ষী। বাল্মীকির গোটা রামায়ণে লক্ষ্মণকে দেহরক্ষী রূপকেই পাওয়া গেছে। এটা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু বনবাসেই নয়, লক্ষ্মণ শ্রীরামের বিপদসঙ্কুল পথের ছায়াসঙ্গী হয়েছিলেন আরও আগে। রামচন্দ্র মাত্র ষোলো বছর বয়সে যখন যজ্ঞবিনাশকারী নিশাচরদের বিনাশ করতে গিয়েছিলেন, তখনও লক্ষ্মণ দেহরক্ষীর কর্তব্য পালন করেছিলেন। অরণ্যে যত হত্যাকাণ্ড সব লক্ষ্মণের দ্বারাই সাধন হয়েছিল, যা একজন দেহরক্ষীরা কাজ। রামের সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মণই বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করেছেন, এভাবে রামকেও সুরক্ষা দিয়েছেন যতদিন পেয়েছেন।
পিতৃসত্য পালনের দৃষ্টান্ত স্থাপন কেবল রামায়ণের শ্রীরামচন্দ্রই নয়, মহাভারতের ভীষ্মও (দেবব্রত) পিতৃসত্য পালন করার চরম দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। ভীষ্মের পিতৃসত্য পালন শ্রীরামচন্দ্রের পিতৃসত্য পালন ছাপিয়ে যায়। নিম্নবর্গীয় ধীবরকন্যা সত্যবতাঁকে বিয়ে করার সময় শান্তনুকেও দশরথের মতো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হয়েছিল। প্রতিজ্ঞা ছিল সত্যবতীর সন্তানই হস্তিনাপুরের পরবর্তী রাজা হবেন। সত্যবতীর পিতা জানতেন শান্তনু পূর্বে বিবাহিত এবং তাঁর একটি পুত্রসন্তান আছে। বিচক্ষণ পিতা তাই শান্তনুকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন। এ কথা শুনে ভীষ্মও প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি চিরকুমার থাকবেন। অতএব তিনি তো দূরের কথা, তাঁর উত্তরসুরীরাও হস্তিনাপুরের সিংহাসনের দাবি করবেন না। এই প্রতিজ্ঞার জন্য ভীষ্মকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। অম্বাকে প্রত্যাখ্যান করায় অপমানিত অম্বাই (শিখণ্ডী রূপে) তার মৃত্যুর কারণ হয়। সে তো না-হয় হল, কিন্তু সিংহাসনে বসবেন কে? সত্যবতী-শান্তনুর ঔরসজাত সন্তান চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য। বিচিত্রবীর্য ও চিত্রাঙ্গদ তো মারাই গিয়েছিলেন। তাহলে বংশরক্ষাই-বা হবে কীভাবে? পরবর্তীতে রাজাই-বা কে হবেন? সত্যবতীও তাঁর পুত্রবধূ অম্বিকা ও অম্বালিকাকে পর্যায়ক্রমে মিলিত হওয়ার অফারও দিয়েছিলেন ভীষ্মকে। এইভাবে অম্বিকা আর অম্বালিকা গর্ভবতী হয়ে পড়লে মহান কুরুবংশের ধারাও অক্ষুণ্ণ থাকবে। ভীষ্ম সেই অফার প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ সত্যবতী-শান্তনুর বিবাহকালে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তিনি তাঁর জীবৎকালে কোনো নারীসংসর্গ করবেন না। এক্ষেত্রে সত্যবতী বা সত্যবতীর পিতা ভীষ্মের রাজা হওয়ার অধিকার কেড়ে নিলেও বনবাস চাননি, তাই ভীষ্ম রাজধর্ম পালন করতে সক্ষম ছিলেন।
বীর হিসাবে রামের ক্ষমতা কতটা ছিল? : বিশ্বামিত্র রামের প্রতি তুষ্ট হয়ে যে অস্ত্রগুলি দিয়েছিলে তার। তালিকা অনেক লম্বা। অস্ত্রগুলি হল : বলা, অতিবলা, ধর্মচক্র, কালচক্র, বিষ্ণুচক্র, ইন্দ্রচক্র, ব্রহ্মশির, ঐষিক, ব্রহ্মাস্ত্র, ধর্মপাশ, কালপাশ, বরুণ পাশ, শুষ্ক অশনি, আর্দ্র অশনি, পৈনাক, নারায়ণ, শিখর, বায়ব্য হয়শির, ক্রৌঞ্জ, কঙ্কাল, মুষল, কপাল, শক্তি, খড়গ, গদা, শূল, বস্ত্র, কিঙ্কিণী, নন্দন, মোহন, প্রস্বাপন, প্রশমণ, বর্ষণ, শোষণ, সন্তাপন, বিলাপন, মাদন, মানব, তামস, সৌমন, সংবর্ত। আরও অনেক নাম-না-জানা অস্ত্র! তা এমন বিপুল অস্ত্র কারও কাছে থাকলে এ গ্রহে তাঁকে রুখবে এমন সাধ্যি কার! এমন অস্ত্রে সজ্জিত একজনকে ‘মহামানব’ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, সাধারণ হলেই চলে। কেবল এক ব্রহ্মাস্ত্রই নাকি যথেষ্ট। এটা একবার ছুঁড়লে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।)।
বস্তুত আমরা মানবজাতির বড়ো অংশই বিজয়ীর পক্ষেই থাকি, বিজেতার পক্ষে নয়। বিজয়ীর সব ন্যায়, বিজেতার সবই অন্যায় হিসাবেই দেখি। তাই বেশির ভাগ মানুষ রামের পক্ষে, রাবণের নয়। তাই অক্ষশক্তির বিজেতা হিটলার বিশ্বাস হয়, মিত্রশক্তি আমেরিকানরা নয়। হিরোসিকা নাগাসাকিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করলেও নয়। অনুরূপ বিজেতা সাদ্দাম হোসেনেরও বিপক্ষে থাকি, বিজয়ী আমেরিকার বিপক্ষে নয়। বিজয়ীর পক্ষে সবাই থাকেন না, কেউ কেউ বিজেতার পক্ষেও থাকেন তাঁদের বিচারে। তাই দক্ষিণ ভারতে অনেকেই বিজেতা রাবণকে বীর হিসাবে পুজো করেন। তাই অনেকেই মিত্রপক্ষ এবং আগ্রাসী আমেরিকার বিপক্ষেও ধিক্কার জানায়। মিথিলা থেকে বিয়ে করে অযোধ্যায় ফেরার পথে দেখা হয়ে যায় অন্য এক রামের সঙ্গে, যিনি ভৃগুনন্দন ‘পরশুরাম’ বলে পরিচিত। ‘পরশু’ কথার অর্থ কুঠার। ক্ষত্রিয় রাজা কার্তবীর্যাজুনের সঙ্গে তাঁর মা রেণুকা প্রেমাসক্ত হয়েছিলেন। সেই অপরাধে বাবার নির্দেশে কুঠার দিয়ে মায়ের মুণ্ডুচ্ছেদ করেছিলেন তিনি। তাঁর এই গুণকীর্তির জন্য হয়ে যান পরশুরাম। এই বিদ্রোহী ব্রাহ্মণ সন্তান পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন বলে কাহিনিতে জানা যায়। এখন দাশরথি রামকে হত্যা করে বাইশতম ক্ষত্রিয় হত্যা করার ইচ্ছা পোষণ করেন পরশুরাম। অতএব রামের পথ অবরোধ করেন এবং যুদ্ধের আহ্বান করেন। রামের উদ্দেশ্যে পরশুরাম বলেন–“তুমি আমার পূর্বপুরুষগণের শরাসনে শর যোজনায় যদি সক্ষম হও তবে আমি তোমার সঙ্গে প্রবল রূপে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ করব। শর সংযোজন করো।” ‘নরচন্দ্রমা’ শ্রীরাম শর ও শরাসন গ্রহণ করে ধনুতে গুণ সংযোগ ও শর সংযোগ করে পরশুরামকে বলেন–“তুমি ব্রাহ্মণ, বিশেষত বিশ্বামিত্র আমার পূজনীয়। কেবল সেই কারণেই আমি এই প্রাণহরণকারী শর পরিত্যাগ করতে পারছি না। আমি এই শর কোথায় নিক্ষেপ করব?” শ্রীরাম প্রথম আলাপে পরশুরামকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করলেও কিছুক্ষণ পরেই অবজ্ঞাভরে ‘তুমি’ সম্বোধন করতে থাকলেন। যাই হোক শ্রীরামের পরাক্রম দর্শন করে পরশুরাম স্তম্ভিত এবং ভীত হয়ে পড়লেন। তিনি শ্রীরামের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলেন। বললেন–“হে রাম, তুমি আমাকে পলায়ণ করতে দাও। এক্ষণে তুমি এই অসম শর শরাসন থেকে মোচন করো।” রাম পরশুরামকে পলায়ণের সুযোগ দিলেন। পরশুরামে দ্রুতবেগে স্থান ত্যাগ করলেন। যঃ পলায়তি সঃ জীবতি।
