কোথায় ভরতের অযোধ্যা, আর কোথায় বালীর কিষ্কিন্ধ্যা! কিষ্কিন্ধ্যা কবে ইক্ষ্বাকুবংশীয়দের অধিকৃত রাজ্য হয়ে গেল? অন্যায়ভাবে বালীকে হত্যার অপরাধ ঢাকতে মিথ্যাচারের অপরাধ! ভরত পৃথিবীর অধীশ্বর? ভরতের পৃথিবীর আয়তন কতটুকু? ইক্ষ্বাকুবংশীয়রা তো কোশলরাজ বলেই জানা যায়! কোশল কোথায়? রামায়ণ উল্লিখিত কোশল বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের কাশীর উত্তরে সরযূ নদী সন্নিহিত সমগ্ৰ অঞ্চল। সমগ্র অঞ্চল বলতে–এই কোশল রাজ্যটি দুইভাগে বিভক্ত–উত্তর কোশল ও দক্ষিণ কোশল। উত্তর কোশল কৌশল্যার পিত্রালয় এবং দক্ষিণ কোশল দশরথের। দুই কোশলের মাঝে সরযূ নদী। দক্ষিণ কোশলের রাজধানী অযোধ্যা। আয়তন দৈর্ঘ্যে ৪৮ ক্রোশ, প্রস্থে ৮ ক্রোশ। পাপ ঢাকতে মিথ্যা আধিপত্য!
দ্রোণাচার্য বধে যেমন সারা পৃথিবী যেমন চিরকাল যুধিষ্ঠিরের অপশের কীর্তন করে, তেমনই বালী বধে রামেরও অপযশ হয়েছে। রাম অধার্মিক উপারে কাপুরুষের মতো বালীকে হত্যা করেছিলেন। বালী এত বড়ো বীর ছিলেন যে, সম্মুখ সমরে তিনি পরাজিত হতে পারেন এমন আশঙ্কা রামের ছিলই। তাই ক্ষাত্রধর্ম, বীরধর্ম জলাঞ্জলি দিয়ে যেনতেনপ্রকারেণ স্বার্থসিদ্ধি করেছেন। অতঃপর ড্যামেজ কন্ট্রোলের তাগিদে রামচন্দ্র বালীকে নিজের প্রজা বলে শাসন করেছেন বলেছেন, যা নিতান্তই অযৌক্তিক। তখনও পর্যন্ত রাম রাজা ছিলেন না, তিনি বনবাসী। কিষ্কিন্ধ্যার রাজাও তিনি নন, এমনকি কিষ্কিন্ধ্যা অযোধ্যার অন্তর্ভুক্তও নয়। কিষ্কিন্ধ্যা দাক্ষিণাত্যের দেশ, অযোধ্যা আর্যাবর্তের দেশ। তার উপর বালী হত্যাকে ‘মৃগয়া’ বলা হয়েছে, বানর মাংস অভক্ষ্য তবুও বালী হত্যাকে ‘মৃগয়া’ বলার মতো প্রভূত কুযুক্তির অবতারণা করেছেন। রামায়ণের বালীই মহাভারতের জরা নামক ব্যাধই নাকি দ্বাপর যুগে কৃষ্ণের হত্যার কারণ হয়েছিলেন–এমন গল্পও বলা হয়েছে। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা রামকে বিষ্ণুর অবতার বলেছেন, কৃষ্ণকেও বিষ্ণুর অবতার বলেছেন–তাই বুঝি রাম আড়াল থেকে বালীকে হত্যা করলেও বালী জরারূপে কৃষ্ণকেও আড়াল থেকে হত্যা করে গায়ের ঝাল মিটিয়ে নিলেন? তবে ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের কবি জুড়ে দিয়েছেন–সীতাহরণের সংবাদ পাইবার পর ভরত অযোধ্যা এবং আর্যাবর্তের সমস্ত সৈন্য একত্র করিয়া লঙ্কা অভিযানে প্রেরণ করেন–“অক্ষৌহিণণ্যাহি তত্রাস রাঘবার্থে সমুদ্যতাঃ”। বোঝাই যাচ্ছে রাম কর্তৃক বালীবধকে বৈধতা দেওয়ার জন্যেই এই সংযোজন হয়েছে। অর্থাৎ রামচন্দ্র সুগ্রীবের সৈন্য-সাহায্য ছাড়াই রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হতেন। তাহলে রামও কলুষ থেকে মুক্ত হয়। স্বার্থসিদ্ধির পর অকৃতজ্ঞতার শেষ নেই যেন!
অবশ্য এছাড়া রাম আর কিই-বা করতে পারতেন! রাজশক্তি যে তাঁর বড়াই প্রয়োজন, নাহলে আর্য-উপনিবেশ কীভাবে সম্ভব! কিষ্কিন্ধ্যাকে এড়িয়ে লঙ্কায় পৌঁছোনো একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু সেখানেও কাঁটা। মৃত্যুপথযাত্রী বালী রামকে বলেছিলেন, অন্যায়ের পথে কেন, “যদি পূর্বে জানকীর আনয়নার্থ আমার কহিতে, তবে আমি এক দিবসেই তাহাকে (রাবণকে) আনিয়া দিতে পারিতাম।” হয়তো পারত কিংবা নয়। বালী এখন মৃত, একথার আর কোনো দাম নেই। তা ছাড়া স্বার্থ ছাড়া কেউ কোনো কাজ করেন না, বালীও করতেন না। নাহলে এক অপরিচিত ব্যক্তির জন্য বালী কেন সৈন্যক্ষয়, অর্থক্ষয় করতে যাবেন?
বালীর মৃত্যুতে সুগ্রীব এবার সত্যি সত্যিই কিষ্কিন্ধ্যার নিরঙ্কুশ রাজা হলেন। নিজের স্ত্রী রুমাকে তো ফিরে পেলেনই, উপরি হিসাবে পেলেন বালীর স্ত্রী তারাকেও।
দিন যায় মাস যায়, সুগ্রীবের কোনো খবর নেই। বিলাসব্যসনে মত্ত সুগ্রীব সীতা উদ্ধারের অঙ্গীকারের কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। মহামন্ত্রী হনুমান সুগ্রীবকে মনে করিয়ে দিলেন অঙ্গীকারের কথা। চার মাস অতিক্রান্ত। রাম হতাশ, লক্ষ্মণ ক্রুব্ধ। ক্রুব্ধ লক্ষ্মণ রামকে জানালেন, প্রয়োজনে সুগ্রীবকে হত্যা করে তাঁর পুত্র অঙ্গদের সাহায্যে জানকীর সন্ধান করা হোক। বাঁধনহারা লক্ষ্মণ সুগ্রীবের অন্তঃপুরে ঢুকে ধনুকে টঙ্কার দিলেন। সুগ্রীব বেজায় ভয়ে ভীত হয়ে পড়লেন। পরিস্থিতি সামলাতে সুগ্রীব তারা সহ সুন্দরী মেয়েদের লেলিয়ে দিলেন। লক্ষ্মণকে কামার্ত করতে। কিন্তু লক্ষ্মণের রক্তচক্ষুর সামনে কোনো সুন্দরী নারীই ঘেঁষতে পারলেন না। অবশেষে সুগ্রীব লক্ষ্মণকে জানিয়ে দিলেন, তিনি সৈন্য সংগ্রহে মনোনিবেশ করেছেন। মাত্র দশদিনের মধ্যেই সেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। রামও খুশি। (বালী আর সুগ্রীবের পরিচয় একটু নেওয়া যেতে পারে–বর্ণিত আছে যে, বালী ছিলেন ইন্দ্রের পুত্র, আর সুগ্রীব ছিলেন সূর্যের পুত্র। ঋক্ষরজার চুলে ইন্দ্রের বীর্যপাতে এঁর জন্ম হয়েছিল। ঋক্ষরজার মৃত্যুর পর বালী রাজা হন। ইনি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন। এঁর স্ত্রীর নাম তারা এবং পুত্র অঙ্গদ। একবার রাবণ দিগ্বিজয়ে বের হয়ে বালীর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য কিষ্কিন্ধ্যায় উপস্থিত হন। সেখানে পৌঁছে ইনি জানতে পারলেন যে বালী চার সমুদ্রে সন্ধ্যাবন্দনা করতে গিয়েছেন। রাবণ বালীর সন্ধানে দক্ষিণ সমুদ্রে উপস্থিত হলে বালী অতর্কিতে তাঁকে মুঠোয় পুরে আকাশে উঠে গেলেন। এরপর পরপর চার সমুদ্রে সন্ধ্যাবন্দনা শেষ করলেন। রাবণ বালীর এরূপ শক্তি দেখে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন এবং ফিরে আসেন। দুন্ধুভি নামক এক মহিষরূপী অসুর তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে এলে ইনি উক্ত অসুরের শিং ধরে ভূমিতে আছড়ে খুন করেন। পরে এই অসুরের শরীর দূরে আছাড় দিলে অসুরের মুখ থেকে রক্ত বেরিয়ে মাতঙ্গ মুনির আশ্রমকে সিক্ত করে দেয়। ফলে মাতঙ্গ মুনি অভিশাপ দেন–আশ্রমদুষিতকারী তাঁর আশ্রমের এক যোজনের মধ্যে উপস্থিত হলে তাঁর মৃত্যু হবে।)
