রামও বুঝলেন এত ক্ষুদ্র ক্ষমতা নিয়ে ভার্যা-উদ্ধার কোনোমতেই সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজার বিরুদ্ধে রাজশক্তি। প্রয়োজন প্রচুর লোকবল, প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। লঙ্কার খুব কাছেই পম্পা নদীর তীরে তাঁরা পৌঁছোলেন। সেইসময় ঋষ্যমূক পর্বতে বিষণ্ণ হৃদয়ে স্বরাজ্য থেকে বিতারিত পত্নীহারা সুগ্রীব অবস্থান করছিলেন। সুগ্রীব কিন্তু সেনাবাহিনীসহ সশস্ত্র রাম-লক্ষ্মণকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। ভেবেছিলেন বালীর চর। বালী সুগ্রীবের আপন ভাই। অবশেষে হনুমানের মধ্যস্থতায় সুগ্রীব সংশয়মুক্ত হলেন। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত হনুমান ছিলেন সুগ্রীবের মহামন্ত্রী। কী হয়েছিল সুগ্রীবের সঙ্গে সে কাহিনি রাম-লক্ষ্মণকে জানানো হল–পিতার মৃত্যুর পর বড়োভাই বালী স্বাভাবিক নিয়মে কিষ্কিন্ধ্যার (বর্তমানের মহিশূরের উত্তরে পম্পা নদর কাছেই বালীর সমৃদ্ধিশালী রাজ্য কিষ্কিন্ধ্যা। স্বর্ণখচিত, যন্ত্রপূর্ণ বানরসংকুল ও ধ্বজশোভিত।) রাজা হলেন আর সুগ্রীব হলেন বালীর পদানত দাস। একসময় নারীঘটিত এক কেলেংকারীতে জড়িয়ে পড়েন বালী। এ নিয়ে মায়াবী নামে এক বিক্রমশালী অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় এবং বালী পরাজিত হন। সে যুগে যুদ্ধে পরাজিত হলে হয় মৃত্যু নয় বন্দি হতে হত। বিপদ বুঝে এক বিস্তীর্ণ জঙ্গলে দুর্গম গর্তে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েন বালী। মায়াবীও বালীর পিছু নিয়েছিলেন। সে সময় উপায়ান্তর না-দেখে গুহার মুখে সুগ্রীবকে প্রহরায় রেখে বালী গুহার ভিতর গা-ঢাকা দিয়ে বাঁচে। গুহার ভিতর ঢোকার আগে সুগ্রীবকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেয়–তিনি না-ফেরা পর্যন্ত সুগ্রীব যেন দ্বাররক্ষা করেন। দিন যায় মাস যায় বালী আর ফেরে না। এমতাবস্থায় সুগ্রীব গুহামুখে এক বিশাল পাথর চাপা দিয়ে কিষ্কিন্ধ্যায় ফিরে আসেন। কিষ্কিন্ধ্যায় ফিরে এসে সুগ্রীব সারাদেশ রটিয়ে দিলেন যুদ্ধে বালীর মৃত্যু হয়েছে। অবশেষে সুগ্রীবকেই কিষ্কিন্ধ্যার রাজা করলেন মন্ত্রী-অমাত্যরা। চালাকির দ্বারা মহৎ কাজ হয় না। সুগ্রীবেরও সুখের দিন ফুরোলো। বালী দ্বারমুক্ত করে কিষ্কিন্ধ্যায় ফিরে এসে দেখেন সুগ্রীব কিষ্কিন্ধ্যার রাজা হয়ে বসে আছেন। খুব ক্ষেপে গেলেন বালী। সুগ্রীবকে একবস্ত্রে দেশ থেকে বহিষ্কার করলেন। সুগ্রীব তাঁর বিশ্বস্ত বান্ধবদের ঋষ্যমুক পর্বতে ঠাঁই নিলেন। এই বিশ্বস্ত বান্ধবেরা হলেন–হনুমান, নল, নীল প্রমুখ ব্যক্তি। শুধু বহিষ্কারই করলেন না, সেইসঙ্গে সুগ্রীবের স্ত্রী রুমাকে অপহরণ করে ভোগ করতে থাকলেন বালী।
তো এই হল সুগ্রীবের রাজ্য ও স্ত্রী হারানোর গল্প। রামও শুনিয়ে দিলেন তাঁর রাজ্য ও স্ত্রী হারানোর গল্প। দুই সমব্যথী বন্ধুত্ব স্থাপন করলেন এবং চুক্তিবদ্ধ হলেন। চুক্তি হল রাম সুগ্রীবের রাজ্য ও স্ত্রীকে ফিরিয়ে দেবেন, বিনিময়ে সুগ্রীব রামের স্ত্রীকে ফিরিয়ে বন্দোবস্ত করবেন। তবে তাঁর আগে যাচাই করে নেওয়া দরকার, রাম কি সত্যিই পারবে তাঁর রাজ্য ও স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিতে–বিচক্ষণ সুগ্রীব এমনই ভাবলেন। যেই ভাবা সেই কাজ। রামচন্দ্রকে শক্তিপরীক্ষা দিতে বললে রাম একটিমাত্র তীক্ষ্ণ শরে সাত-সাতটি তালগাছ ছেদ করে শক্তিপরীক্ষায় সফল হলেন। সুগ্রীব অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন। কিন্তু রামের এই অধীত শক্তি খুব খারাপভাবে প্রয়োগ হল। যে ঘটনা রামকে কলঙ্কময় কলুষিত করে দিল। গিভ অ্যান্ড টেক’ পলিসিতে রামকে দিয়ে আগেই অঙ্গীকার অনুযায়ী কাজ করতে অগ্রসর হতে হল। কীভাবে? রামের পরামর্শে সুগ্রীব কিষ্কিন্ধ্যায় ফিরে গিয়ে বালীকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করলেন। বালী নিশ্চয়ই এ আহ্বান শুনে উপলব্ধি করলেন–শত্রুর শেষ রাখতে নেই! শত্রুর শেষ রাখতে গিয়ে কত রাজা যে নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। ইতিহাস সাক্ষী। প্রসঙ্গত পৃথ্বীরাজ চৌহানের কাহিনিটা স্মরণ করতে পারেন। পৃথ্বীরাজ চৌহান পরাজিত মোহম্মদ ঘুরিকে মুক্তি না-দিলে শক্তিসঞ্চয় করে মোহম্মদ ঘুরি ফিরে এসে পৃথ্বীরাজকে হত্যা করতে পারতেন না। পৃথ্বীরাজ এমন ভুল না-করলে ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত। সেই একই ভুল বালীও করেছিল এবং মাসুল গুণতে হল।
কিন্তু রাম কীভাবে সুগ্রীবকে তাঁর রাজ্য ও স্ত্রী ফিরিয়ে দেবেন–তাঁর না-আছে লোকবল, না-আছে অস্ত্রবল! অতএব “বুদ্ধিস্য বলংতস্য নৈবতুল্যং কদাচন। এক্ষেত্রে অবশ্য কুবুদ্ধি। কথা হল বালী যখন সুগ্রীবের সঙ্গে দ্বন্দ্ব করবেন তখন রাম গাছের আড়ালে লুকিয়ে এবং সেখান থেকে গোপনে বালীকে লক্ষ করে প্রাণান্তকর তীর ছুঁড়ে বালীকে হত্যা করবেন। নাঃ, সব প্ল্যান ভেস্তে গেল। বালীকে রাম হত্যা করতে পারলেন না। উল্টে সুগ্রীবকে মেরে পিঠ ফাটিয়ে দিল বালী। প্রাণেই মেরে ফেলত, যদি-না সেখান থেকে পালিয়ে পুনরায় ঋষ্যমূক পর্বতে ঠাঁই মিলত। কিংকর্তব্যবিমূঢ় রাম সুগ্রীবের কাছে গিয়ে তাঁর অপারগতার কারণ বললেন এবং বালীর কাছে গিয়ে পুনরায় দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করতে বললেন সুগ্রীবকে। সেইসঙ্গে বলে দিলেন সুগ্রীব যেন নাগপুষ্পী লতার মালা পরে নেন। তাহলে চিনে নিতে সুবিধা হবে। কারণ দুজনেই একইরকম দেখতে৷ পৃথক দেখাতেই এই মালা। ঘোর দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু হল। এবার আর ভুল করলেন না রাম। দ্বন্দ্বযুদ্ধে সুগ্রীবের পরাজয় আসন্ন হলে রামচন্দ্র আড়াল থেকে তীর ছুঁড়ে বালীকে হত্যা করলেন। জীবনের সবচেয়ে জঘন্যতম কাজটি করে ফেললেন স্বয়ং রাম। বালী রামের শত্রু ছিলেন না। রামের কোনো অনিষ্ট তিনি করেননি। একটা হীন চরিত্রের লোকের হয়ে কিষ্কিধ্যার রাজাকে হত্যা করে ফেললেন রাম। গুপ্তঘাতকের মতো বিনা অপরাধে বালীকে হত্যা করে রাম নিজের চরিত্রকেই কলঙ্কিত করলেন। মুমূর্ষ মৃতপ্রায় বালী ভগবান রামের উদ্দেশে কী বললেন, পড়ুন–“রাম!.. তুমি অতি দুরাত্মা, ধর্মধ্বজী ও অধার্মিক। তুমি ধর্মের আবরণ ধারণপূর্বক তৃণাচ্ছন্ন কূপ ও ভস্মাবৃত অগ্নির ন্যায় রহিয়াছ। তুমি দুরাচার ও পাপিষ্ঠ, কিন্তু সাধুর আকার পরিগ্রহ করিতেছ।” বালীর এহেন তিরস্কারে রাম বিন্দুমাত্র অনুতপ্তে দগ্ধ হয়ে যাননি, লজ্জায় নতমস্তক হয়ে যাননি। বরং ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে মিথ্যাচার করলেন–“এই শৈলকাননপূর্ণ ভুভাগ ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজগণের অধিকৃত, এই স্থানের মৃগপক্ষী ও মনুষ্যগণের দণ্ডপুরস্কার তাঁহারাই করিয়া থাকেন। … রাজা ভরত এই ভূমির রক্ষার স্বয়ং গ্রহণ করিয়াছেন।… সেই মহাবীরই পৃথিবীর রাজা।”
