এ পর্যন্ত ক্ষমতার লড়াইয়ে জয় বশিষ্ঠরই হল, বিশ্বামিত্রের পরাজয়৷ পনেরো আনা পূর্ণ হয়েছে, ভরতরকে নিরঙ্কুশ করতে আর-একটি কাঁটা উপড়ে ফেলতে পারলেই ষোলো আনা পূর্ণ। সেই কাঁটার নাম বিশ্বামিত্র। যে বশিষ্ঠের পরম শত্রু, সে রামের পক্ষে। বিবাহের পরদিন সকালে কী এমন হল, বিশ্বামিত্র অযোধ্যায় ফিরলেন না। মহর্ষি বিশ্বামিত্র রাজা দশরথ ও জনককে সম্ভাষণ জানিয়ে হিমাচলে প্রস্থান করলেন। হিমাচলে কেন? তাহলে বিশ্বামিত্রও কি ষড়যন্ত্রের শিকার? বশিষ্ঠদের তরফ থেকে কোনো জীবনহানির ‘গ্রেড’ ছিল কী বিশ্বামিত্রের উপর? বিশ্বামিত্রের এটা প্রস্থান, না অন্তর্ধান? জনকপুরীতে অবস্থানকালেই বিশ্বামিত্রকে অন্তর্হিত হতে হল। বিদায়কালে দশরথ ও জনকরাজাকে যথাযথ সম্ভাষণ জানালেও, বশিষ্ঠকে কোনো সম্ভাষণ বিশ্বামিত্র জানাননি। এরপর থেকে বিশ্বামিত্রকে আমরা আর পাইনি গোটা রামায়ণে। তাহলে কি বশিষ্ঠ নিজের শতপুত্র হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে নিলেন সুযোগ বুঝে। সেই সুযোগ, যে সুযোগে এক ঢিলে তিন পাখি মারা যায়। পুত্রহত্যার প্রতিশোধ, রামকে শক্তিহীন করে দেওয়া এবং ভরতের নিরঙ্কুশ রাজ্য প্রদান করা। কারণ ভরতকে অযোধ্যার রাজা করতে পারলেই রাজদরবারে বশিষ্ঠের আধিপত্য থাকবে, রামের ক্ষেত্রে সেটা উলটো হবে। রাম অযোধ্যার রাজা হলে বিশ্বামিত্রের আধিপত্য রক্ষা হত। বশিষ্ঠ কোণঠাসা হয়ে পড়ত। এ অপমান বশিষ্ঠের সহ্য হবে কেন? ব্রাহ্মণ বলে কথা!
অযোধ্যার পরিস্থিতি বড়ই জটিল। রাজা দশরথ ভয়ে জুজু, অসহায়। লোকবল, সৈন্যবল সবই কৈকেয়ীর নিয়ন্ত্রণে। এমতাবস্থায় রামের যত দ্রুত সম্ভব অযোধ্যা ত্যাগ করাই বিধেয়। তাতে পিতা দশরথ, মাতা কৌশল্যা এং নিজের প্রাণ রক্ষা করতে পারবেন। বাল্মীকির রামায়ণে রাম সরাসরিই বলেছেন–“লক্ষ্মণ আমার বোধ হইতেছে যে, ভরতকে রাজ্যে নিয়োজিত, আমাকে নির্বাসিত ও পিতার প্রাণান্ত করিবার নিমিত্তেই কৈকেয়ী আসিয়াছেন।” অযোধ্যা ত্যাগ তথা বনবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ঘটনায় রামচন্দ্র যতটা-না পিতাকে মান্য করেছেন, তার চেয়ে বেশি মান্য (?) করেছেন বিমাতা কৈকেয়ীকে। বাল্মীকির রামায়ণে রামের মনোভাবকে স্পষ্ট করেছে, ক্ষোভে রাম বলছেন লক্ষ্মণকে–“ভার্যার সহিত ভরতই সুখী, তিনি একাকী অধিরাজের ন্যায় সমগ্র কোশল রাজ্য উপভোগ করিবেন। পিতা জীর্ণ হইয়াছেন, আমিও অরণ্য আশ্রয় করিলাম, সুতরাং তিনি একাকীই রাজা হইবেন।” পিতা দশরথের উদ্দেশে বলেন–“যিনি ধর্ম ও অর্থ পরিত্যাগ করিয়া কামের অনুসরণ করেন, তিনি শীঘ্রই রাজা দশরথের ন্যায় এইরূপ বিপন্ন হন, সন্দেহ নাই।” নির্বাসন-ক্ষুব্ধ রাম পিতা দশরথকে কামের অনুসরণকারী বলে উল্লেখ করেছেন। পিতা দশরথকে কামুক’ বলেছেন লক্ষ্মণও। বাল্মীকির রামায়ণে কৈকেয়ীর মুখের কথাতেই রামচন্দ্র বনবাসগমনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দশরথ তো তাঁর নিজের মুখে শ্রীরামচন্দ্রকে বনবাসেই যেতে বলেননি। দশরথ সেকথা কোনোদিন বলতেও পারতেন না এমন কঠিন কথা। পিতা দশরথ একবারের জন্যেও রামকে বনবাসে যেতে আজ্ঞা করেননি–জনসমক্ষেও নয়, একান্তিকেও নয়। কারণ রামচন্দ্রকে দশরথ নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি স্নেহ করতেন। সেই কঠিন কথা অন্য কেউ বলে ফেলেছেন তা শুনেই দশরথ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দশরথ যতই রামচন্দ্রকে অন্ধের মতো স্নেহ করুক না-কেন, রামচন্দ্র যে পিতার প্রতি অন্ধভক্ত ছিলেন তার কিন্তু কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না৷ এক, বনবাসের যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পিতার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকেননি। সিদ্ধান্তটা তিনি একাই চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। দুই, বনবাসের আগে মাত্র ষোলো বছর বয়সে যখন যজ্ঞবিনাশকারীদের বিনাশ করতে বিশ্বামিত্রের সঙ্গে অরণ্যে রওনা দিয়েছিলেন, তখনও দশরথের ওজর-আপত্তিকে রামচন্দ্র গ্রাহ্য করেননি। বস্তুত রামচন্দ্র বড়ো ও উপযুক্ত হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দশরথ খুব চাপের মধ্যে কাটাচ্ছিলেন। দশরথ যে কেকয়রাজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন, তা তিনি নিজেই মনে রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। সেই প্রতিজ্ঞাকে স্বয়ং দশরথই পাত্তা দেননি। পাত্তা দেননি তার প্রমাণ মিথিলা থেকে রামের বিয়ে করে আসার পর দশরথ ভরত ও তাঁর অঙ্গরক্ষক শত্রুঘ্নকে ১২ বছরের জন্য মাতুলালয় কেকয়রাজের কাছে কৌশল করে পাঠিয়ে দেন। দশরথ জানতেন ভরত রামের জন্য বিপজ্জনক। পরবর্তী ১২ বছর ব্যাপী পিতা দশরথ পুত্র রামচন্দ্রকে অযোধ্যার পরবর্তী রাজা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই ১২ বছর দশরথ ভুলেও ভরতকে অযোধ্যায় আসতে বলা তো দূরের কথা, স্মরণ পর্যন্ত করেননি। বাস্তবিক ক্ষেত্রে শেষরক্ষা করতে পারেননি দশরথ। তীরে এসে তরী ডুবে যায়। শ্রীরামচন্দ্রের রাজা হতে না-পারাটা দশরথ মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। রাজা দশরথ অসুস্থ হয়ে পড়েন। কৈকেয়ীর নির্দেশে সত্যাসত্য পিতার কাছ থেকে যাচাই করার সাহস দেখালেন না পুত্র রামচন্দ্র।
কয়েকদিনের মধ্যেই দশরথ প্রাণত্যাগ করলেন। রামচন্দ্র পিতা দশরথের মানসিক বিপর্যস্ততা উপলব্ধি করতে পারলেন না। রামের বনবাস এবং ভরতের রাজত্বলাভ দশরথ কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। পিতার সত্যরক্ষা করতে গিয়ে পিতারই মৃত্যুর কারণ হলেন রামচন্দ্র। যাঁর জন্য রামচন্দ্র মহত্বের পরিচয় দিলেন, সেই ব্যক্তির মৃত্যু হল বনগমনের পর। যাঁর জন্য সত্যরক্ষা, তিনিই থাকলেন না। তাহলে কি এটাই বোঝায় প্রাণ দিতে হলেও সত্যরক্ষা করতেই হবে? দশরথ তো সত্যরক্ষা করতে পারেননি। দশরথের যৎসামান্য সত্যরক্ষা হয়েছে রামের বনবাসের মাধ্যমেই। রাম বনবাস মেনে না নিলে দশরথের মৃত্যু হত না। আর দশরথের মৃত্যু না-হলে ভরত কোনোদিনই রাজা হতে পারতেন না। দশরথ কখনোই ভরতের হাতে রাজত্ব তুলে দিতেন না।
