শুধু তাই নয়–মাতা কৈকেয়ী, পিতা দশরথ এবং স্বদেশ অযোধ্যা ত্যাগ করে যাওয়ার পর ১২ বছরের মধ্যে একবারের জন্যেও অযোধ্যায় ফেরেননি ভরত। এর ফলে রাজঅন্তঃপুরে ভরতের জনপ্রিয়তা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যায়। অপরদিকে রামচন্দ্রের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে আসে। এই দীর্ঘ ১২ বছর ব্যাপী দশরথ রাজ্যাভিষেকের নিমিত্তেই রামকে প্রস্তুত করছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারেননি। রামের ২৮ বছর সমাপ্তি এবং রামের রাজ্যাভিষেকের সময় আসন্ন। আয়োজনের আগের দিন অন্দরমহলের ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন দশরথ। দশরথ বন্দি হলেন কৈকেয়ীর গৃহনজরে। অন্তরীণ করে রাখা হল তাঁকে। কৈকেয়ী দশরথকে জানিয়ে দিলেন রামকে চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে যেতে হবে এবং ভরতই হবে অযোধ্যার রাজা। নিরূপায় দশরথ ভেঙে পড়লেন, মুহ্যমান হলেন। দশরথ কৈকেয়ীর ভয়ে ভীত, সন্ত্রস্ত। কৈকেয়ীকে অগ্রাহ্য করা মানে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো। দশরথ বুঝে গিয়েছিলেন কুলগুরু বশিষ্ঠের নেতৃত্বে অযোধ্যার সিংহাসন দখলের অতঃসলিলা ষড়যন্ত্র চলছে। বশিষ্ঠ ছিলেন ভরতের প্রবল সমর্থক এবং রামের বিরোধী। ভরত কুলগুরু বশিষ্ঠের দ্বারা দীক্ষিত হন এবং রাম দীক্ষিত হন বিশ্বামিত্রের দ্বারা। বিশ্বামিত্র আর বশিষ্ঠ একে অপরের জাতশত্রু। সেই বিশ্বামিত্রকে ভ্যানিশ (অন্তর্হিত?) করে দিয়েছেন বশিষ্ঠ অনেক আগেই, যেদিন ষোলো বছর বয়সে রামচন্দ্রকে বিয়ে করিয়ে ফিরছিলেন বিশ্বামিত্র। গোটা রামায়ণে বিশ্বামিত্রকে আর দেখা যায়নি সেদিন থেকে। কেকয়রাজ বশিষ্ঠের সমর্থক। কেকয়রাজ অশ্বপতির কন্যা কৈকেয়ী এবং ভরত দৌহিত্র। অতএব চক্রান্তের গভীরতা বুঝতে দশরথের এতটুকু অসুবিধা হয়নি। ভরতের রাজা হওয়ার পথে রাম ছিলেন সাক্ষাৎ কাঁটা। কৈকেয়ী চেয়েছিলেন রামকে চিরতরে সরিয়ে ফেলতে। আর তাই তিনি রামকে কেবল বনবাসে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি, বনটিও তিনিই নির্বাচন করলেন–দণ্ডকারণ্য, দণ্ডকারণ্য যে এক ভয়াল-ভয়ংকর শ্বাপদসংকুল এবং হিংস্র মানুষখেকো রাক্ষস অধ্যুষিত জঙ্গল কৈকেয়ী তা বিলক্ষণ জানতেন। এখানে বসবাস তো দূরের কথা, প্রবেশের পর কারোর পক্ষেই জীবন্ত ফিরে আসা সম্ভব নয়। অতএব ভরতের সিংহাসন আজীবনকাল নিরঙ্কুশ।
কৈকেয়ী যখন দশরথকে ডেকে জানিয়ে দিলেন চতুর্দশ বর্ষ দণ্ডকারণ্যে রামের বসবাস এবং ভরতের অভিষেক, একথা শ্রবণ করে ক্রোধে দশরথ কৈকেয়ীকে তুই-তোকারি করে ব্যাকালাপ করতে দ্বিধা করেননি৷ বলেছেন–“এক্ষণে তোকে ও আমার ঔরসজাত পুত্র তোর ভরতকে পরিত্যাগ করিলাম। রজনী প্রভাত হইয়াছে। আমি কিছুতেই তোর কথা শুনিব না। তোকে অবমাননা করিব ও রামকে রাজ্য দিব।” অতএব দশরথ রামকে বনবাসে পাঠাতে একদম পাঠাতে রাজি নন। ভরতকেও রাজা করতে চান না। কিন্তু কৈকেয়ীও সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন, কড়া ভাষায় হুকুম দিলেন–“তুমি এখন রামকে এ স্থানে আনাও এবং তাহাকে বনবাসে দিয়া ভরতকে রাজা করো। তুমি আমার শত্রু দূর না করিয়া এ স্থান হইতে এক পদও যাইতে পারিবে না।” (রামায়ণ/ভারবী/প্রথম সংস্করণ/পৃঃ ১৬৫) দশরথ কার্যত কৈকেয়ীর ক্রোধাগারে বন্দি হলেন। ইতিমধ্যে সুহৃদ অমাত্য ও সারথি সুমন্ত্র দশরথকে জানিয়ে দিয়ে গেছেন পরিস্থিতি খুবই প্রতিকূল। রাজদরবার এখন ব্রাহ্মণ বশিষ্ঠ তাঁর সঙ্গীদের দখলে, ক্ষত্রিয়রা নেই। আগের রাতে দশরথ রামকে জীবনসংশয় আছে বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। রামও পিতার আসন্ন বিপদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনবহিত ছিলেন।
দশরথের আদেশে সুমন্ত্র রামকে নিয়ে যেতে আসেন। রামের আজ অভিষেক হওয়ার কথা। যাওয়ার সময় জানকীকে তিনি বলে গেলেন–“প্রিয়ে, আমার নিমিত্ত পিতা দেবী কৈকেয়ীর সহিত সমাগত হইয়া আমারই অভিষেকের পরামর্শ করিতেছেন সন্দেহ নাই।.. পিতা নিশ্চয়ই আজ আমাকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিবেন।” রাম খুশি খুশি মনে দশরথের কাছে পৌঁছোলেন। কিন্তু পিতার অবস্থা দর্শন করে রাম চুপসে গেলেন। হাওয়া ভালো নয় বুঝে গেলেন বিচক্ষণ রাম। রামের দর্শনমাত্রই দশরথ কেবল ধরা-ধরা গলায় ‘রাম’ শব্দটিই উচ্চারণ পারলেন। দশরথের চোখে জল, বাঁধ মানে না। এতই জল যে রামকে দেখতেই পারছেন না, নির্মম কথাগুলিও রামকে বলতে পারলেন না। যে কথা বলতে দশরথ কষ্ট পাচ্ছেন, সে কথা কৈকেয়ী অবশ্যই অবলীলায় বলে ফেললেন।
রাম বিচক্ষণ পুরুষ। তিনি বুঝলেন প্রাসাদের পরিবেশ খুবই ভয়ংকর। প্রাসাদ-বিপ্লবের শিকার তাঁরা। প্রাসাদ এখন দেবী কৈকেয়ীর দখলে। পিতা বন্দি। উচ্চবাচ্য করলেই পিতার জীবনহানি তো হতে পারে, উপরন্তু মাতা কৌশল্যা ও তাঁদেরও ক্ষতির আশঙ্কা আছে। ভরত বশিষ্ঠের কাছে দীক্ষিত হয়েছেন, রাম নয়। রাম দীক্ষিত বিশ্বামিত্রের কাছে। বিশ্বামিত্রের পথই রামের পথ। অতএব কুলগুরু বশিষ্ঠ ভরতের পক্ষ নিয়ে ষড়যন্ত্রের খুঁটি সাজাচ্ছেন, এ ভাবনায় সন্দেহের অবকাশ কোথায়! তার উপর যখন বশিষ্ঠের সঙ্গে কৈকেয়ীর মতো দুরাচার রাজমাতা, পরম বন্ধু কেকয়রাজ ও তাঁর পুত্র যুধাজিৎ আছেন, তখন দশরথকে শুইয়ে দিতে কঠিন কোথায়? পূর্বে ভরতকে নিষ্কণ্টক করতে প্রতিপক্ষ রামকে বিশ্বামিত্রের সঙ্গে বনে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বশিষ্ঠই। বশিষ্ঠ ভেবেছিলেন প্রতিপক্ষ রাম আর শত্রুপক্ষ বিশ্বামিত্রের বিনাশ হবে ভয়ংকর নিশাচরদের বিনাশ করতে গিয়ে। ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করলে একথা স্পষ্ট হয় যে, বশিষ্ঠ ভরতের সমর্থক এবং রামচন্দ্রের বিরোধী। কেকয়রাজ বশিষ্ঠের সমর্থক, কৈকেয়ীর পিতা এবং ভরত তাঁর দৌহিত্র। দশরথ এদের একদম পছন্দ করতেন না। কোনো শুভাশুভ কাজে এদের আমন্ত্রণ জানাতেন না, সোজা ইগনোর করতেন। রামের বিয়ে বা রামের রাজ্যাভিষেক–এমন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি দশরথের পক্ষ থেকে। দশরথ জানতেন রাম নয়, ভরতেরই দল ভারী। রামের ছিল কেবল রাজশক্তির প্রতি প্রজাগণের নিরঙ্কুশ আনুগত্য। রামচন্দ্রের প্রতি প্রজাদের এই নিরঙ্কুশ আনুগত্য বশিষ্ঠদের ভীত করেছিল৷ বিবাহসূত্রে রাম যদি জনকরাজা সীরধ্বজের আনুকূল্যে অধিক শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, সেই পথও বন্ধ করতে প্রয়াস চালালেন এবং সফলও হলেন। মিথিলায় বশিষ্ঠ, যুধাজিৎ, ভরত, শত্রুঘ্ন নিমন্ত্রিত ছিলেন না, তা সত্ত্বেও তাঁরা অনাহূত হয়ে পৌঁছে গেলেন মিথিলায় বিয়ের আসরে। বশিষ্ঠ ভাবলেন রাম ও লক্ষ্মণ মিথিলাপতির সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়ে গেলে রামচন্দ্রের শক্তি বৃদ্ধি হবে। ভরতের কী হবে! কিন্তু মিথিলাপতি সীরধ্বজের মাত্র দুটি কন্যা–সীতা ও ঊর্মিলা। সীতা রামের স্ত্রী হবেন, ঊর্মিলা লক্ষ্মণের। ভরতের তো কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে! ভরতকে মিথিলার যুক্ত করতেই হবে। অতএব সীরধ্বজের কন্যা নেই তো তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা কুশধ্বজের দুটি কন্যা আছে তো–মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্তি। তাঁর উপর আবার কুশধ্বজ বশিষ্ঠপন্থী। এক্কেবারে সোনায় সোহাগা! শেষপর্যন্ত পনেরো কলা পূর্ণ হল বশিষ্ঠের–রাজর্ষি সীরধ্বজের কন্যা সীতা ও ঊর্মিলার সঙ্গে যথাক্রমে রাম ও লক্ষ্মণের এবং কুশধ্বজের কন্যা মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্তির সঙ্গে ভরত ও শত্রুঘ্নের বিয়ে সম্পন্ন হল।
