শুধু এটুকুই নয়, ভরতের রাজা হওয়া আর শ্রীরামচন্দ্রের বনবাসে যাওয়ার পিছনে এক শক্তিশালী ‘বি’ কাজ করেছে। ভরতের পক্ষে বশিষ্ঠের লবি এবং শ্রীরামচন্দ্রের পক্ষে বিশ্বামিত্রের লবি। বিশ্বামিত্র আর বশিষ্ঠের মধ্যে বিরোধের কাহিনি সর্বজনবিদিত (দুই ঋষি বিরোধের কাহিনি বিশ্বামিত্রের আলোচনার সময়ে বিস্তারিত বলব।)। এই দুই ঋষির ব্যক্তিগত বিরোধই রাম-ভরতের মধ্যে আপাতনিরীহ সংঘর্ষ। রামও যথাসময়ে সেই বিপদের গন্ধ পেয়েছিলেন। রাম বুঝেছিলেন এঁদের সঙ্গে যুঝে ওঠা কোনোমতেই সম্ভব নয়। সিংহাসনের জন্য গা-জোয়ারি করলে দশরথ ও রাম গুপ্তখুনও হয়ে যেতে পারেন। রামকে বনবাসে পাঠানোর উদ্দেশ্যও কৈকেয়ীর সেই কারণেই। তিনি বনবাসে পাঠিয়েও ক্ষান্ত হননি, ভয়ংকর জঙ্গল দণ্ডকারণ্য নির্বাচন করে দিলেন। দণ্ডকারণ্য এমন এক গভীর জঙ্গল, যা শ্বাপদসংকুল ও নরমাংসখেকো রাক্ষস-খোক্ষস অধ্যুষিত–যেখানে প্রবেশ করলে আর প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা সম্ভব নয় কারোর পক্ষে। কৈকেয়ীরা ভেবেছিলেন রামচন্দ্র আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে না, ভরতও সারাজীবন নিরঙ্কুশ থাকবে। রামচন্দ্রও সমস্ত ক্ষোভ উগরে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন (নির্গত হইলে আজ কৈকেয়ী কৃতকার্য হইয়া নিষ্কণ্টক আপনার পুত্র ভরতকে রাজ্যে অভিষেক করিবেন। আমি জটাবল ধারণপূর্বক অরণ্যে প্রস্থান করিলে তিনি মনের সুখে কালযাপন করিতে পারিবেন।” ((রামায়ণ/হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য/ভারবি/প্রথম সংস্করণ/পৃষ্ঠা ১৮১)
তবে দেবী কৈকেয়ীর সাধ পূরণ করবেন, এমন সাধও শ্রীরামচন্দ্রের ছিল না। তাই কৈকেয়ীর আদেশমতো রামচন্দ্র দণ্ডকারণ্যে যাওয়ার কথা মনেই রাখেননি। কারণ রাম বিলক্ষণ জানতেন, দণ্ডকারণ্য কোনোভাবেই মনুষ্যের উপযুক্ত নয়। তাই অযোধ্যা থেকে বেরিয়ে সারথী সুমন্ত্রকে নিয়ে দণ্ডকারণ্যে নয়, গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থল প্রয়াগে ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে পৌঁছে সুমন্ত্রকে অযোধ্যায় ফিরে যেতে আদেশ করেন। সুমন্ত্রও এদিক ওদিক ঘুরে সময় অতিবাহিত করে অযোধ্যায় পৌঁছে যান। রাম-লক্ষ্মণ-সীতা মুনির কাছে রাত কাটিয়ে পরদিন দশ ক্রোশ দূরে চিত্রকুট পর্বতের কাছে পৌঁছোলেন। এখানে অসংখ্য মুনিঋষিদের বাস, খাদ্য-খাবার-পানীয়ও সহজলভ্য। অতএব রাম সিদ্ধান্ত নিলেন–“ইহা বসবাস করিবার যোগ্য স্থান৷” তিনি লক্ষ্মণকে নির্দেশ দিলেন–“দৃঢ় উৎকৃষ্ট কাষ্ঠ আনিয়া গৃহ প্রস্তুত করো। চিত্রকুটে বাস করিতে আমার অত্যন্তই অভিলাষ হইয়াছে।” বিশ্বস্ত মুনি ভরদ্বাজের গৃহে বা আশেপাশে গৃহনির্মাণ করে বসবাস করতেই পারতেন। পারতেন ঠিকই, কিন্তু সে স্থান রামেদের জন্য নিরাপদ ছিল না বলেই রামের আশঙ্কা ছিল। লোকমুখে কোনোভাবে তার এই অবস্থানের খবর অযোধ্যায় পৌঁছোলে তিনি বিপদগ্রস্ত হতে পারেন–এই ছিল আশঙ্কা। দণ্ডকারণ্যে মৃত্যুর ফাঁদে নিজেদের সঁপে না-দিয়ে, চিত্রকুটেই আত্মগোপন করে নিরাপদে থাকতে চেয়েছিলেন। বনবাসকালীন রাম সারাক্ষণই আতঙ্কে ছিলেন। এই বুঝি ভরত অরণ্যে ঢুকে পড়ে এবং তাঁকে হত্যা করে। এই আশঙ্কার কথা নিজ বন্ধু নিষাদরাজ গুহককে জানিয়ে রাখতে ভোলেননি। গুহকও রামকে রক্ষা করতে তাঁর সৈন্যদের পরোক্ষভাবে প্রস্তুত থাকতেও বলেছিলেন।
চিত্রকুট পর্বতশৃঙ্গে অবস্থানও রাম যখন দগ্ধ মৃগমাংস সহযোগে সীতার মনোরঞ্জন করছিলেন, তখন দিগন্তব্যাপী ধুলো উড়িয়ে তুমূল কোলাহল কানে এলো। লক্ষ্মণ ক্ষিপ্রতার সঙ্গে একটা দীর্ঘ শালগাছে উঠে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে রামকে বললেন–“আর্য, এক্ষণে অগ্নি নির্বাণ করিয়া ফেলুন, জানকী গৃহমধ্যে প্রবিষ্ট হউন, আর আপনি বর্ম ধারণ কামুকে জ্যা আরোপণ ও শর গ্রহণ করিয়া প্রস্তুত হইয়া থাকুন।… আর্য, কৈকেয়ীর পুত্র ভরত অভিষিক্ত হইয়া রাজ্য নিষ্কণ্টক করিবার বাসনায় আমাদের নিধন কামনায় উপস্থিত হইয়াছে।.. যাহার নিমিত্ত আপনি রাজ্যচ্যুত হইলেন, এক্ষণে সেই শত্ৰু উপস্থিত হইয়াছে। সে আমাদের বধ্য, তাহাকে বধ করিতে আমি কিছুমাত্র দোষ দেখি না।… এক্ষণে আপনি ঐ দুষ্টকে বধ করিয়া সমগ্র পৃথিবী শাসন করুন।” চতুরঙ্গ সৈন্যবাহিনী নিয়ে রামকে ফিরিয়ে আনতে (লোক-দেখানো) অযোধ্যার রাজা ভরত চিত্রকুটে পৌঁছেলে এবং পিতার মৃত্যুসংবাদ দিয়ে রামকে অযোধ্যায় ফিরে যেতে অনুরোধ করলে, রাম স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে–বনবাসের কাল অতিক্রান্ত হলেও দশরথবিহীন অযোধ্যায় আর ফিরবেন না। কোনোভাবেই তিনি ভরতের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চান না। এরপর সুদীর্ঘ চোদ্দো বছরে একবারের জন্যেও ভরতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি রাম।
ভরত চিত্রকুট থেকে বিদায় নিলে ভরতের চোখে ধুলো দিতে রাম অকুস্থল ত্যাগ করে অবশেষে দণ্ডকারণ্যের পথেই পাড়ি দিলেন। এর ফলে পিতৃসত্যও রক্ষা হল, ভরতের চোখের আড়াল করা গেল নিজেদেরকে। বাল্মীকি বলেছেন–“অনন্তর নানা কারণে রামের তথায় বাস করিতে আর প্রবৃত্তি রহিল না৷” অবশ্য ভরতও রামকে মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি যে, চিত্রকুট পর্বতের মতো মনোরম স্থানে বসবাসের জন্য বনবাস নয়, নির্বাসন দণ্ডাদেশ হয়েছিল রাক্ষস অধ্যুষিত দণ্ডকারণ্যে। কাজেই সেই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। অতএব অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাম প্রায় বাধ্য হয়েই দণ্ডকারণ্যের গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলেন এবং নানা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে থাকলেন–যা অনভিপ্রেত। গভীর অরণ্যে ভিনদেশি মানুষকে অরণ্যবাসীরা খুব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতে পারেনি। তার উপর তাঁরা আবার সশস্ত্র! ফলে প্রতিমুহূর্তে রাম-লক্ষ্মণদের সংঘর্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। দণ্ডকারণ্যে প্রবেশ থেকে শুরু করে সীতার খোঁজে পম্পা নদীর তীরে সুগ্রীবের কাছে পৌঁছোতে পৌঁছোতে টিকে থাকার তাগিদে প্রায় ১০,০০০ রাক্ষস-খোক্ষস-নিশাচরদের নির্বিচারে হত্যা করতে হয়েছিল আত্মরক্ষার তাগিদে।
