যজ্ঞেরও আয়োজন করলেন দশরথ। নিয়ম অনুযায়ী যজ্ঞের উদ্দেশে সেই অশ্ব বিভিন্ন দেশ বা রাজ্য সসৈন্যে ঘুরে বেড়াবে এবং যে যে দেশ বা রাজ্য বিনা বাধায় অতিক্রম করে যাবে সেই সেই দেশই যজ্ঞকারী রাজার অধীন হবে। কিন্তু দশরথ তা করেননি। কারণ দশরথ ছিলেন অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষমতার রাজা বা নরপতি। তাঁর পক্ষে ব্যয়বহুল তথা যথার্থ অশ্বমেধ যজ্ঞ করা প্রায় অসম্ভব। তাই নিজের রাজ্যের চারদিকে অশ্বকে ঘুরিয়ে এনে যজ্ঞ সমাপন করেছিলেন। যুদ্ধবিগ্রহও রাজা দশরথের একেবারেই না-পছন্দ। তাই রাজা দশরথের রাজ্যও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়নি। ওই ক্ষুদ্র রাজ্য নিয়েই রাজা দশরথ সন্তুষ্টই ছিলেন। যাই হোক, সংশ্লিষ্ট অশ্ব ফিরে এলে প্রধানা মহিষীকে তাঁর সঙ্গে রাত্রিযাপন করতে হত, কৌশল্যাও রাত্রিযাপন করলেন। পরদিন সেই যজ্ঞপূত অশ্বকে প্রধানা মহিষী কর্তৃক কর্তন করে ভক্ষণ করা হত। অশ্বদের পুরুষের পুত্রস্বরূপ বলা হয়েছে। তাই পুত্রার্থে অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করতেন অপুত্রক রাজারা।
মনে রাখতে হবে কৌশল্যার জ্যেষ্ঠ সন্তান শান্তা। শান্তার স্বামী ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি। আবার ঋষ্যশৃঙ্গের পিতা রোমপাদ। রোমপাদের স্ত্রী বর্ষিণী হলেন কৌশল্যার বোন। রোমপাদের দ্বারা ক্ষেত্রজ সন্তান শান্তাকে লাভ করেন কৌশল্যা। সেই হিসাবে ঋষ্যশৃঙ্গ যেমন রোমপাদের নিজের ঔরসজাত সন্তান, অপরদিকে শান্তা ক্ষেত্রজ হলেও নিজের ঔরসজাত সন্তান। তাহলে সম্পর্কটা দাঁড়াল ঋষ্যশৃঙ্গ কৌশল্যার ভগ্নীপুত্র। ভগ্নীপুত্র মানে ঋষ্যশৃঙ্গ কৌশল্যার সন্তানতুল্য। আবার কন্যার স্বামী হিসাবে জামাইও বটে। এমন এক সম্পর্কের পুরুষ, সে আবার শান্তা ও দশরথের অনুরোধে কৌশল্যাকে ‘পুত্রকামাষ্টি যজ্ঞ’ বা ‘পুত্রেষ্টি যজ্ঞ’-এর মাধ্যমে চার ক্ষেত্রজ সন্তান উপহার দেয়। সেই চার সন্তান হলেন–রাম, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন। অর্থাৎ চরম অজাচার। ( ‘immortal Love of Rama’–G. B. Kanuga) এসব ঘটনা বাল্মীকি রামায়ণের বালকাণ্ডে পাবেন।
যেসব পণ্ডিতেরা বলেন বালকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত, সেসব পণ্ডিতেরা কেন দশরথের পুত্রলাভে ঋষ্যশৃঙ্গকে টেনে আনলেন? ঋষ্যশৃঙ্গকে তো কেবলমাত্র বাল্মীকির রামায়ণে বালকাণ্ডতেই পাওয়া যায়। অন্য কোথাও নেই। দু-দিক নয়–হয় প্রক্ষিপ্ত, নয় প্রক্ষিপ্ত। যদি প্রক্ষিপ্ত হয় ঋষ্যশৃঙ্গ দ্বারা পুত্র-কন্যার জন্মবৃত্তান্তকে অগ্রাহ্য করতেই হয়। আর যদি বালকাণ্ডকে আদি বাল্মীকির স্বরচিত বলে মেনে নিই, তাহলে তো অজাচার সম্পর্ককে মেনে নিতেই হবে। ক্ষেত্রজই বলি আর পুত্রকামাষ্টি যজ্ঞই বলি, মৈথুন ছাড়া, শুক্রাণু-ডিম্বাণুর নিষেক ছাড়া সন্তানের জন্ম কোনোদিন কোনোভাবেই হয়নি। সম্ভবও নয়। অতীতে হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।
শ্রীরামচন্দ্র পিতৃসত্য পালনকারী হিসাবে বেশ প্রসিদ্ধ। পিতৃসত্য পালনের জন্য শ্রীরামচন্দ্র ভারতীয়দের মনে আদর্শ হয়ে আছেন। কেমন ছিল সেই পিতৃসত্য পালন? আসলে শ্রীরামচন্দ্রের কাছে বনবাসে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। শ্রীরামচন্দ্র বনবাসে যেতে বাধ্য। শ্রীরামচন্দ্র যদি বিনা প্রশ্নে বনবাসে না যেতেন, তাহলে দশরথের প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হত। যদি না যেতেন কী হত? বাল্মীকির রামায়ণে বিশ্লেষণ করলে যেটা পাওয়া যায়, সেটা হল, রাজ্য ও রাজত্বের জন্য শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে ভরতের যুদ্ধ অনিবার্য হত। রাম ছাড়লেও ভরত শত্রুঘ্ন-বশিষ্ঠ-কেকয়রাজ কেউ ছেড়ে দিত না। মহাভারতের মতো ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ হত। তদুপরি দশরথের সঙ্গে কেকয়রাজ অশ্বপতির যুদ্ধ হত এবং দশরথ পরাজিত হত। দশরথ যে যুদ্ধবাজ ছিলেন না, তা বোঝা যায় মাত্র ৪৯৫ বর্গমাইল ভূখণ্ড নিয়ে তাঁর খুশি থাকায়। দশরথ এবং শ্রীরামচন্দ্র দুজনেই ছিলেন শান্তিকামী মানুষ। অনাবশ্যক যুদ্ধ-সংঘর্ষ এড়াতে একবাক্যে বনবাস গমনই একমাত্র পথ। (অথচ এই শান্তিকামী রামচন্দ্রকেই পরবর্তী সময়ে দেখব আর্যদেবতাদের প্ররোচনায় পা দিয়ে কীভাবে নৃশংস যুদ্ধবাজে পরিণত হলেন)। বনবাস গমনই একমাত্র পথ ভাবার কারণ এর প্রস্তুতি পূর্বেই ছিল। হঠাৎ করে মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়েনি। কৈকেয়ীর পুত্রই ভবিষ্যতে অযোধ্যার সিংহাসনে আরোহণ করবে, এই প্রতিশ্রুতি বিয়ের আগেই দশরথ দিয়েছিলেন কৈকেয়ীর পিতাকে। কৈকেয়ীর বিয়ের সময় থেকেই দশরথ এই প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে সত্যবদ্ধ। ছিলেন। দশরথ-পরবর্তী ভরত অযোধ্যার রাজা হলে শ্রীরামচন্দ্রের আর কাজ কী বনবাসে যাওয়া ছাড়া! দশরথের সঙ্গে শ্বশুর অশ্বপতির প্রতিজ্ঞাকে দুইজন মাত্র অস্বীকার করতেই পারতেন। একজন কৈকেয়ী, তিনি যদি দশরথের কাছ থেকে ভরতের জন্য অযোধ্যার সিংহাসন না-চাইতেন। দ্বিতীয়ত ভরত, তিনি যদি দাদার অগ্রাধিকারকে মূল্য দিয়ে অযোধ্যার সিংহাসন গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন। বস্তুত ভরতও সেই সত্য জেনে জেনেই বড়ো হয়েছেন যে, তিনিই অযোধ্যার রাজা হচ্ছেন। জেনেছেন মা কৈকেয়ী ও দাদু অশ্বপতির কাছ থেকেই। দশরথকেও সর্বক্ষণ এই প্রতিজ্ঞা তাড়া করে নিয়ে বেড়াত। রামচন্দ্রসহ নিকটবর্তী সকলেই এ প্রতিজ্ঞার কথা জানতেন। দশরথ ভরতকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। দশরথ মনে করতেন রামের জন্য ভরতের ভূমিকা মারাত্মক হতে পারে। তাই দশরথ ভরত ও তাঁর দোসর শত্রুঘ্নকে মাতুলালয়ে পাঠিয়ে দেন ১২ বছরের জন্য। এই বারো বছরে একবারের জন্যেও ভরতের খোঁজ নেননি বিচক্ষণ রাজা দশরথ।
