রামায়ণের ভিতরে ঢোকার আগে স্পষ্ট করে বলে নিতে চাই–কৃত্তিবাস, রঙ্গনাথন, তুলসীদাস রচয়িতাদের ভক্তিরসে ভোবানো রামায়ণ বা রামকথা যথার্থ রামায়ণ নয়। সেইসব রামায়ণ নিয়ে আমার আগ্রহ নেই। আমার আগ্রহ বাল্মীকি বিরচিত রামায়ণেই। হতাশ হবেন না, কোথাও কোথাও আঞ্চলিক অন্য কবিদের রূপকথাগুলি উল্লেখ করেছি তুলনামূলক সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য তুলে ধরার জন্য। ইতিহাসের সন্ধানে আমি বাল্মীকির রামায়ণেই থাকব। বাল্মীকির রামায়ণ কি কিংবদন্তি, না মিথ? বাল্মীকির যে রামায়ণটি আমরা পাই, সেটির সম্পূর্ণ অংশ কিংবদন্তি নয়। আবার সম্পূর্ণ অংশ মিথও নয়। আদি বাল্মীকি বিরচিত অযোধ্যাকাণ্ড থেকে যুদ্ধকাণ্ড এই পাঁচটি কাণ্ড কিংবদন্তি। প্রক্ষিপ্ত রচনা বালকাণ্ড বা আদিকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ড দুটিকে আংশিক কিংবদন্তি বলাই যায়। কিংবদন্তি হল সেটাই, যা–(১) এই ধরনের কাহিনিতে মানুষের কর্মকাণ্ড ও শক্তির উপর বেশি আরোপ করা হয়। মানুষ হল কিংবদন্তি কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র, এক অসামান্য ব্যক্তিচরিত্র এবং তাঁর কার্যাবলিই কিংবদন্তির বিষয়বস্তু। (২) কিংবদন্তি কাহিনিগুলিতে ঐতিহাসিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ভিত্তি থাকে। পুঙ্খানুপুঙ্খ ভৌগোলিক বিবরণ থাকে। কোনো একটি বিশেষ অঞ্চলের সংস্কার, সামাজিক রীতিনীতি, লোকাঁচার, লোকবিশ্বাসের উপর করে গড়ে ওঠে। (৩) সম্পূর্ণ যথার্থ না-হলেও বর্তমান সময়ের ভিত্তিতে কিংবদন্তির ঘটনাগুলির একটি আনুমানিক কালপঞ্জি থাকে। (৪) কিংবদন্তির গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে সহায়ক উপাদান হিসাবে বিভিন্ন কাল্পনিক উপাদানকে ব্যবহার করা হয়। অপরদিক মিথ হল সেটাই, যা–(১) এই ধরনের কাহিনিতে ঈশ্বর বা দেব-দেবতাদের কর্মকাণ্ড ও শক্তির উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এই কাহিনিগুলিতে অলৌকিক জগতের ঈশ্বর বা দেব-দেবতারাই নায়িকা। (২) মিথের কাহিনিগুলি মূলত ধর্মভিত্তিক, ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় সংস্কার, ধর্মীয় রীতিনীতি, পুজো-প্রার্থনা, ধর্মোৎসব, উপাচার ইত্যাদির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। (৩) মিথে বর্তমান সময়ের নিরিখে ঘটনাভিত্তিক ধারাবাহিক সময়কালের উল্লেখ বা কালপঞ্জি থাকে না। (৪) মিথে ব্যক্তি বা ঘটনার সঠিক কোনো প্রমাণ বা ঐতিহাসিক ভিত্তি থাকে না। ভিত্তি থাকলেও তা অত্যন্ত দুর্বল হয়। যেমন–হিন্দু পুরাণোক্ত সৃষ্টির পর পৃথিবী একটি কচ্ছপের মাথার উপর অবস্থান করত। কিংবা ক্ষুধার্ত হনুমানের সূর্যকে ফল ভেবে খাওয়ার জন্য লাফ দেওয়া, বাইবেলে নোয়ার কাহিনি, রোমের রোমুলাসের জীবনকাহিনি ইত্যাদি। (৫) মিথের গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পিছনে সহায়ক উপাচার হিসাবে উপমার ব্যাপক করা হয়। কিংবদন্তিতে বাস্তব চরিত্রে কাল্পনিক রূপ পায়, মিথের সব চরিত্রই কাল্পনিক।
‘নরচন্দ্রমা’ শ্রীরামচন্দ্র : ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসক? ভগবান? ঐতিহাসিক মানুষ?
বাল্মীকির রাম কেবল ক্ষত্রিয় রাজা, কোনো অবতার বা ভগবান নন। বিভিন্ন পৌরাণিক সূত্র থেকে জানা যায়, রাম রাজত্ব করেছিলেন ত্রেতা যুগেত্রেতা যুগের সময়কাল ১২ লাখ ৯৬ হাজার বছর। অনেকে বলেন, রাম বেঁচেছিলেন ১০,০০০ বছর, “দশবর্ষ সহস্রাণি দশবর্ষ শতানিচ/রামোরাজ্য মুপাসিত্বা ব্রহ্মলোকং প্রস্যতি”। উচ্চতায় ছিলেন তাঁর নিজের হাতের মাপে ১৪ হাত। রামায়ণে মানুষের এরকম বিশাল বিশাল আয়ুর কথা নানা জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক কেদারনাথ মজুমদার বলেছেন–“এইরূপ বৃহৎ সংখ্যাবাচক নির্দেশগুলি যে পৌরাণিক যুগের কল্পনাসম্ভুত, তাহা বলাই বাহুল্য।” শ্রীরামচন্দ্রের জন্ম আর জন্মভূমি নিয়ে এ দেশে তুমুল বিতর্ক। শ্রীরামের জন্মকাল সুনির্দিষ্ট সাল-তারিখ দিয়ে নির্ধারণের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা বিশেষ নেই। রাম দশরথ-কৌশল্যার জ্যেষ্ঠ পুত্র-সন্তান। তবে সন্তান হিসাবে জ্যেষ্ঠ নন। তার কারণ দশরথের প্রথমটি কন্যা-সন্তান, শান্তা৷ রামায়ণের মুখ্য পুরুষ চরিত্র রাম ও তার অনুজ ভরত, লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নের জন্ম বেশ বিতর্ক আছে। অনেক গবেষক-পণ্ডিত বলেন শ্রীরামচন্দ্র দশরথের ঔরসজাত সন্তান নন। তিনি এবং তার অন্যান্য ভ্রাতৃসকল ঋষ্যশৃঙ্গেরই ‘ক্ষেত্রজ’ সন্তান। অতএব রামের জন্মদাতা পিতা ঋষ্যশৃঙ্গ, দশরথ পালকপিতা। বাল্মীকির রামায়ণে বলাই হয়েছে–“বিপ্রবর ঋষ্যশৃঙ্গ হইতে তাঁহার এই পুত্রেষ্টি পূর্ণ হইবে এবং তাঁহার ঔরসে ত্রিলোক বিখ্যাত অতুল বলসম্পন্ন বংশধর চারিপুত্র উৎপন্ন হইবে।” (রামায়ণ/হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যভারবি/প্রথম সংস্করণ/পৃষ্ঠা ৩৯) সারথী সুমন্ত্রও একই আশ্বাস দিয়েছিলেন–“ঋষ্যশৃঙ্গই আপনার (দশরথের) সন্তানকামনা পূর্ণ করিবেন।” (রামায়ণ/হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যভারবি/প্রথম সংস্করণ/পৃষ্ঠা ৩৫) অশ্বমেধ যজ্ঞের আস্থা না-থাকায় দশরথও যজ্ঞশেষে ঋষ্যশৃঙ্গকে বিনীতভাবে অনুরোধ করেছিলেন–“সুব্রত! যাহাতে আমার বংশরক্ষা হয়, আপনি এইরূপ কার্য অনুষ্ঠান করুন।”(পৃষ্ঠা ৪৬) এত বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের পিতা হওয়ার ব্যাপারটায় পাছে প্রজাদের সন্দেহ হয়, সেই সন্দেহ নিরসনের জন্য একটি লোক-দেখানো অশ্বমেধ (এই অশ্ব পক্ষবিশিষ্ট বলে বাল্মীকির রামায়ণে উল্লেখ হয়েছে। ঋগবেদে বলা হয়েছে এই অশ্ব সমুদ্র থেকে জায়মান। বেদ বলছে, শ্যেনপক্ষীর মতো এদের পাখা ছিল। যেসব প্রাণীতত্ত্ববিদ এই অশ্ব সম্বন্ধে গবেষণা করেন তাঁরাই বলতে পারবেন এমন পক্ষযুক্ত অশ্বের উদ্ভব সম্ভব ছিল কি না। তবে ঋগবেদের সময় থেকে রূপকথার পক্ষীরাজ ঘোড়া পর্যন্ত এই পক্ষবিশিষ্ট অশ্ব সম্বন্ধে কিংবদন্তি চলে আসছে। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে আছে–“অপসু যোনির্বা অশ্বঃ”, অর্থাৎ জল থেকে অভ্যুদয় হয়েছে বলেই একে অশ্ব বলা হয়।)
