অতিরঞ্জিত, অতিকথন, অতিশোয়াক্তি, দেবতারোপ, অধ্যাত্মবাদ তথা সুপারন্যাচারাল বিষয়গুলি দূরে সরিয়ে রাখলে রামায়ণের ইতিহাস হয়ে উঠতে বাধা কোথায়? একটু তলিয়ে দেখা যেতে পারে–রামায়ণ মূলত শিববিদ্বেষী আর্যদের (শ্রীরামচন্দ্র) সঙ্গে শিবভক্ত অনার্যদের (রাবণ) বিরোধের ইতিহাস। প্রাবন্ধিক হরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলছেন–“হরধনুতে জ্যা আরোপণ করতে যে সক্ষম হবে অর্থাৎ শিবভক্ত অনার্যদের প্রতিরোধ করতে সক্ষম ব্যক্তির হস্তেই তিনি নিজ কন্যা তথা এই কৃষিবিদ্যা সমর্পণ করবেন, এটাই ছিল রাজা জনকের সংকল্প।” দক্ষিণ ভারতে শ্রীরামচন্দ্র কৃষিকার্যের বিস্তার করেছেন এমন কোনো কোনো প্রমাণ বাল্মীকি রামায়ণে নেই। ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের অনেক উপাদান রামায়ণ, মহাভারতে কখনো রূপক হিসাবে কখনো-বা সরাসরিই পাওয়া যায়। প্রাগৈতিহাসিক, অনৈতিহাসিক সমস্ত লুপ্ত ইতিহাস উদ্ধারের জন্য পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণের উপর নির্ভর করতেই হয়। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণগুলিতে ভারতের অনেক লুপ্ত ইতিহাস আলোকিত হয়েছে। শুধু রামই নয়, রাম সহ রামায়ণের অন্যান্য চরিত্রগুলিও সমান ঐতিহাসিক। হ্যাঁ, অতিরঞ্জিত হয়েছে কোথাও কোথাও। হতেই পারে, ইতিহাসে অতিরঞ্জন তো হয়ই। ঐতিহাসিক রচিত্র চন্দ্রগুপ্ত, অশোক, আকবর, ঔরঙ্গজেব, বুদ্ধ, মোহম্মদ, জিশু, শাহজাহানের ইতিহাস কি অতিরঞ্জিত হয়নি! এরা যথার্থ ইতিহাস হলে রাম রাবণ-সীতা নয় কেন? বস্তুত বাল্মীকির রামায়ণ (অন্য কোনো রামায়ণ নয়) আর্য সাম্রাজ্যবাদীদের দাক্ষিণাত্যে ও সাগরপারে দক্ষিণী দ্বীপ লঙ্কাবিজয়ের কাব্যরূপ ইতিকথা। এর সঙ্গে অলৌকিক অপার্থিব দেবদেবতাদের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রাচীন যুগে রাজা ও পুরোহিত সম্প্রদায়কে জগৎ-স্রষ্টার সমকক্ষ ভাবা হত, ভাবানো হত। তা ইতিকথা আর নির্জলা ইতিহাস হয়ে যায়। সময়ান্তরে অবয়বে জমতে থাকে রূপকথার শ্যাওলা। সেই রীতি অনুসারে ইতিহাসের সঙ্গে রূপকথার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে রামকথার কথকরা পরবর্তীকালে রাজা রামচন্দ্রকে ঈশ্বরের অবতার এবং কালক্রমে স্বয়ং ঈশ্বররূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাল্মীকি, বেদব্যাসরা তাঁরা তাঁদের মহাকাব্যে কোনো সত্যই গোপন করেননি। গোপন করেছি আমরা, সুবিধাবাদী ধান্ধাবাজেরা। বাল্মীকির রামায়ণকে অবমাননা করে অগ্রাহ্য করে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে চলেছি। সত্য সামনে এসে পড়লেই মারমুখী। বাল্মীকি, বেদব্যাসরা সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছেন, ন্যায়কে ন্যায়, অন্যায়কে অন্যায় বলেছেন। ঘোঁট পাকাচ্ছি আমরা, আমরা মানে ভণ্ড ধার্মিকেরা। বেশি ভক্তিরস দেখাতে গিয়ে ইতিহাসকেই অস্বীকার করে ফেলছি, সত্যকে অস্বীকার করছি। প্রাবন্ধিক হিসাবে আমি বলব–মূল সংস্কৃত ভাষায় লেখা বাল্মীকির রামায়ণ পড়ন। সংস্কৃত ভাষা যাঁরা জানেন না, তাঁরা হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের অনূদিত বাংলা ভাষায় রামায়ণ পড়ুন। পণ্ডিতপ্রবর হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য মহাশয় তাঁর অনুবাদ গ্রন্থটিতে বাল্মীকি রচিত সংস্কৃত রামায়ণের মূলানুসারী অনুবাদক্রিয়ায় অসাধারণ কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। একদিকে তিনি যেমন মূল রামায়ণের প্রতিটি তথ্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরেছেন বাংলা প্রতিশব্দের মাধ্যমে, তেমনি অপরদিকে মহাকাব্যকে উপমা অলংকার সংবলিত বিরাট রসৈশ্বর্যটিকেও অবিকৃতভাবে পরিবেশন করেছেন। কোথাও ন্যূনতম সংযোজন ও বর্জন করার ধৃষ্টতা দেখাননি। তাঁর অনূদিত রামায়ণ অনেক চিরাচরিত ভুল ধারণারও নিরসন হয়েছে। আমার গ্রন্থের মূল হাতিয়ারই হল হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের রামায়ণ।
বীরেন্দ্র মিত্র তাঁর ‘রামায়ণে দেবশিবির’ গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলেছেন–“ধর্মাধর্মের সঙ্গে নিঃসম্পর্কিত রামকথায় প্রতিভাসিত হয়েছে যে আশ্চর্য পুরাবৃত্ত, সেটি যেমন রাবণের তেমনিই আবার রামচন্দ্রেরও করুণ পরিণতির ধারাবাহিক প্রতিবেদন। আর্য দেববাহিনী এবং ব্রহ্মাবাদী ব্রাহ্মণদের চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও নিষ্ঠুরতা তদানীন্তন ভারতবর্ষে যে ভয়াল এক রাষ্ট্রব্যবস্থার পত্তন করেছিল, উত্তরকাণ্ড সহ বাল্মীকি রামায়ণে তারই পর্বানুক্রমিক চিত্ৰণ অনুসন্ধিৎসু পাঠককে অভিভূত করে। রামায়ণ সম্পর্কিত বিভ্রান্তির মূলে আছে রামস্তুতিমূলক বাজার-চালু রামচরিতগুলি–সাধারণ্যে সেই নবরূপায়িত কল্পিত কাহিনিমালাই রামায়ণ’ নামে প্রচলিত, কিন্তু সেগুলির কোনোটিই প্রকৃত রামকথা নয়, প্রাচীন পুরাবৃত্তের অপব ঘটিয়ে এই স্তবকুসুমাঞ্জলি বিরচিত। ঐ সব গ্রন্থে ইতিহাস অবলুপ্ত হয়েছে উপন্যাসের কথা-আবর্জনার তলায়। রামচন্দ্রের জীবনাবসানের কয়েক সহস্রাব্দ পরে গ্রন্থিত হয় বাল্মীকি রামায়ণ। আবার সেই আদি মহাকাব্য বিরচিত হওয়ারও কয়েক শতক পরে হয়েছিল রামচন্দ্রের অবতারি প্রতিষ্ঠা। তৎপরবর্তী আমলে যথেচ্ছ ভক্তিমূলক প্রক্ষিপ্ত রচনার দ্বারা সম্ভবত মূল রামকথায়ও বিকৃতি ঘটতে শুরু করে। যে আগ্রাসী ব্রাহ্মণরা ক্ষমতা লালসায় অযোধ্যাকে শ্মশান বানিয়ে দীর্ঘকাল রামের পিতৃরাজ্যকে জনশূন্য করে রাখেন, সেই ব্রাহ্মণনেতৃত্বেরই পাহারাদার দুর্বুদ্ধিজীবী মতলবী ব্রাহ্মণ কথকরা পুনরায় রামকে ভগবান বানিয়ে এককালে ব্রাহ্মণ্যশোষণের বনিয়াদটি পাকাঁপোক্ত করে নেন।”
