যেসব ইতিহাস আর জীবনী নিয়ে আমাদের ইতিহাসজ্ঞান ও ইতিহাসের উপাদান বলে মাথায় করে রেখেছি, সেগুলি মিথ্যাকথন আর অলৌকিকতার সাজানো। প্রাচীন যুগ ও মধ্যযুগের শেষদিক পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল। হিউয়েন সাঙ তাঁর ভারতভ্রমণ নিয়ে যে গ্রন্থটি লিখেছেন সেখানে কীভাবে অলৌকিকত্ব ও মিথ্যাচার লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা একটু দেখে নিতে পারি। হিউয়েন সাঙের ভারত বিবরণ থেকে জানা যায়, হিউয়েন সাঙ ভারতে এলে কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মন তিন-তিনবার নিমন্ত্রণ পাঠালেও হিউয়েন তাঁর রাজ্যে যাননি। হিউয়েন সাঙ যাতে তাঁর রাজ্যে যায়, সেজন্য নালন্দার আচার্য শীলভদ্রের কাছে দু-দুবার দূত মারফত সংবাদ পাঠান ভাস্করবর্মন। কিন্তু খুব শীঘ্রই দেশে ফিরে যাবে এই অজুহাতে হিউয়েন সাঙ না-গেলে, ভাস্করবর্মন ক্ষেপে গিয়ে হুমকি দিয়ে পত্র পাঠিয়ে বলেন, যদি হিউয়েন না-আসেন তবে শশাঙ্ক রাজা যেভাবে বৌদ্ধধর্মের নাশ করেন এবং বোধিবৃক্ষ ধ্বংস করেন তিনিও ওইভাবে সেনা ও হাতি পাঠিয়ে নালন্দা মহাবিহার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবেন। পাঠক বিশ্বাস করব, নাকি যাচাই করব? আসুন, যাচাই করি–এ ঘটনা ব্রাহ্মণ্যধর্ম বা হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে বৌদ্ধধর্মের নির্জলা মিথ্যাচার। প্রথমত, একজন বৌদ্ধ শ্রমণের জন্য ভাস্করবর্মণ নালন্দা মহাবিহারই গুঁড়িয়ে দিতে চাইবেন? ভাস্করবর্মন গবেট নাকি? দ্বিতীয়ত, মহাবিহার নিজের রাজ্যে নয়, সম্রাট হর্ষবর্ধনের রাজ্যে। কেউ অন্য রাজ্যে মহাবিহার ভেঙে দিয়ে যাবে, মামদোবাজি নাকি! এছাড়া ধর্মীয় অলৌকিকত্বে বিশ্বাসী হিউয়েন সাঙ অলৌকিকতার ক্ষেত্রেও কিন্তু কোনোরূপ ত্রুটি রাখেননি তাঁর লেখায়। তিনি যেমন বৌদ্ধ বোধিসত্ব মূর্তি, বুদ্ধমূর্তি, স্তূপ, দেহাবশেষের অলৌকিকত্বের বর্ণনা করেছেন, তেমনই হিন্দু দেবদেবী, বিগ্রহ বা মন্দিরের অলৌকিকত্ব ও মহিমা ব্যক্ত করতে কুণ্ঠিত হননি। তবে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ধর্ম কোন্ অতলে খসে গিয়েছিল, কীরূপ পসরা সাজিয়েছিল, তা এইসব গ্রন্থে অজস্র উদাহরণ পাওয়া যায়। শুধু হিন্দুধর্মেই নয়, সব ধর্মগ্রন্থগুলিতেই এইসব চরম অলৌকিকতা সমানভাবে বর্ণিত হয়েছে। ভারতীয় তৎকালীন সমাজ তথাকথিত ধর্মীয় পরিবেশে ধর্মের মহিমা ও মাহাত্ম্য বাড়াতে গিয়ে নানা গালগল্পের আষাঢ়ে গোরুর মতো অতিরঞ্জিত করে ইতিহাসকে বিকৃত করে সত্যকে অতলে তলিয়ে দিতে পিছপা হননি কেউ। পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারতও এর বাইরে নয়। মনে রাখতে হবে, প্রাচীন যুগে মানুষ ভারত উপমহাদেশকে ভারত নয়, ‘ব্রাহ্মণের দেশ’ বলেই চিনত।
প্রথম অলৌকিকতামুক্ত ইতিহাস রচিত হয় সম্ভবত ব্রিটিশদের হাত ধরেই। অলৌককতা মুক্ত হলেও মিথ্যাচার অব্যাহতই ছিল। ইংরেজরা ভারতে উপনিবেশ গড়ার পর ব্রিটিশ ইতিহাসবিদরা অলৌকিকতা বর্জন করলেও মিথ্যাচারের পথেই ইতিহাস রচনার ব্রতী হয়েছিলেন। বিশেষ করে উদ্দেশ্যপ্রোণদিতভাবে হিন্দু-মুসলমানের ঘটনা লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভুড়িভুড়ি মিথ্যাবর্ণন করে সমাজে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। তাঁদের শাসনকার্য নিরঙ্কুশ করতেই ‘ভাগ করো, শাসন করো’ (divided and rule policy) প্রয়োগ হল শুরু থেকেই, জাতিকে দুইভাগে ভাগ করে নির্বিঘ্নে ২০০ বছর টিকেছিল এবং জাতিকে দুইভাগ করেই তাঁরা ভারত ছেড়েছেন। যাই হোক, আমরা কিন্তু সেই মিথ্যাচারগুলি বিশ্বাস করি! সেই যে বিদ্বেষের বীজ বপন করে গেছেন তাঁরা, আজ তা বিষবৃক্ষ।
ইতিহাস কাকে বলে? ইতিহাসবিদরা বলেন–ইতিহাস সেটাই, যেখানে বিশেষ রাজবংশ বা ঘটনাবলির নামমালা বা যুদ্ধকৌশলের বর্ণনামাত্র। আমি মনে করি না ইতিহাস বলতে এটুকুই বোঝায়। বরং এই তত্ত্বে বলা যায়, এটা ইতিহাসের সংযোগস্থলমাত্র। কিন্তু ইতিহাসের তো এটুকুই ধর্ম হতে পারে না। হলে তা আংশিক হয়, অর্ধ-ইতিহাস হয়। এই ইতিহাস মানুষের কাজে আসে না, যতক্ষণ-না মানবজীবন বা তৎসমষ্টির উত্থাপন, উন্নতি, অবনতি এবং তার পুনরুদয় ও তৎসহ আনুষঙ্গিক বৃত্তিসমূহ যথার্থ প্রতিকৃতি দ্বারা প্রদর্শিত হয়। ততক্ষণ পর্যন্ত ইতিহাসও নয়। অনেকে বলে থাকেন, প্রাচীন ভারতের কোনো ইতিহাস নেই। একথা পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান রয়েছে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণগুলিতে। মুনি-ঋষি মহাকবিরা এই কাহিনিগুলিতে গালগপ্পো রচনা করেননি। অলৌকিক ও অ-পার্থিব বর্ণনার সংমিশ্রণে অতিকল্পনার স্বপ্নপূরণে তাঁরা ইতিহাসকেই সংরক্ষণ করে গেছেন। রামায়ণকে কেবল কল্পনা-কাব্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। আখ্যানময় ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানময় ইতিহাসে প্রবেশার্থে সচ্ছল পথস্বরূপ। এইসব রচনায় অ-জাগতিক বর্ণনা উপস্থিত থাকলেও ইতিহাস নয় একথা বলা যায় না। সর্বাঙ্গীণ ইতিহাস নয় ঠিকই। কোন্ প্রাচীন ইতিহাসই-বা সর্বাঙ্গীণ! গ্রিসের প্রাচীন ইতিহাস, মিশরের প্রাচীন ইতিহাস, রোমের প্রাচীন ইতিহাসকে সর্বাঙ্গীণ ইতিহাস বলা যায়? অতিরঞ্জন ও অতিকথন কি নেই? ইউরোপীয়রা যদি ট্রয়ের যুদ্ধকে ইতিহাস পদবাচ্য করে তৃপ্তিসাধন করতে পারে, তবে আমরা কেন রাম-রাবণের যুদ্ধকে, কৌরব-পাণ্ডবের যুদ্ধকে কালনির্ণয়পূর্বক ইতিহাস বলে মেনে নিতে দ্বিধান্বিত হব।
