বাল্মীকি ‘ইতিহাস’ উল্লেখ করে রামায়ণ রচনা করেননি ঠিকই, তাই বলে ইতিহাস নয় একথাও জোর গলায় বলা যায় না। রামও বাল্মীকির মনোভূমে উদিত হওয়া সম্পূর্ণভাবে কাল্পনিক চরিত্র নয়। রবীন্দ্রনাথ রামায়ণকে কেবল কাব্য বলেই ছেড়ে দেননি, তিনি পাশাপাশি ইতিহাসও বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়–“রামায়ণ মহাভারত কেবলমাত্র মহাকাব্য বলিলে চলিবে না, তাহা ইতিহাসও বটে; ঘটনাবলির ইতিহাস নহে, কারণ সেরূপ ইতিহাস সময় বিশেষকে অবলম্বন করিয়া থাকে। রামায়ণ মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস।” বস্তুত ভারতীয়রা সে সময় দর্শন, ভূগোল, গণিত, বিজ্ঞান নিয়ে প্রভূত চর্চা করলেও সাল-তারিখ সহ ইতিহাস চর্চা শুরু করেননি। তবে সাল-তারিখ না-থাকলেও বাল্মীকির রামায়ণে শুরু থেকে শেষপর্যন্ত যেরকমভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভৌগোলিক স্থানের বিবরণ আছে এবং প্রায় সমস্ত ঘটনার তিথি-নক্ষত্রের উল্লেখ আছে, তাতে এ গ্রন্থকে ইতিহাস না-বলে উপায় নেই। রামায়ণে উল্লিখিত বিভিন্ন স্থাপত্য এখনও রক্ষিত আছে। সাল-তারিখ না থাকার কারণে যদি বাল্মীকির রামায়ণকে ইতিহাস বলতে আপত্তি থাকে–তাহলে মেগাস্থিনিস, টলেমি, প্লিনি, সলিনাস, আম্ব্রোসিয়াস, এরিয়ান, স্ট্রাবো প্রমুখের বিবরণগুলিকে ইতিহাস বলা যায় না। এদের যে গ্রন্থগুলি আমাদের ইতিহাসের উপাদান জোগান দেয়, সেখানেও সাল-তারিখ পাওয়া যায় না। বস্তুত খ্রিস্টাব্দ ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকেই নির্দিষ্টভাবে সাল-তারিখের উল্লেখ হতে শুরু করে। তার আগের ঘটনাগুলিকে খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। রামায়ণ খ্রিস্টাব্দ ব্যবস্থা চালু হওয়ার বহু বহু আগে রচিত। সময়কালটা খেয়াল রাখতে হবে। ভারতীয়রা অনেক অনেক যুগ পরে প্রকৃত ইতিহাস লিখতে করতে শুরু করেন। ভারতের প্রাচীন ইতিহাস যেটুকু জানতে পারি সেগুলি সবই বিদেশি পরিব্রাজকদের লেখা থেকে। যেমন–মেগাস্থিনিস, টলেমি, প্লিনি, সলিনাস, আস্ত্রোসিয়াস, এরিয়ান, স্ট্রাবো প্রমুখ। প্রাচীন যুগের ভারতে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণে গল্পের মাধ্যমে ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। সেসময় এমনই রীতি ছিল। অতএব রামায়ণকে নিছক এক কবিকল্পনাপ্রসূত কাহিনি ভাবলে মস্ত বড়ো ভুল হয়ে যাবে।
অপরদিকে বাল্মীকির রামায়ণ প্রসঙ্গে শ্রীপ্রবোধচন্দ্র সেন লিখেছেন–“রামায়ণ হচ্ছে প্রত্যক্ষতঃ কবিকল্পনার সৃষ্টি, তৎকাল প্রচলিত কাহিনী ও জনশ্রুতিকে সংকলন করার কোনো প্রত্যক্ষ অভিপ্রায় এই গ্রন্থ রচনার মূলে নেই। বরং কবি সচেতনভাবেই প্রচলিত কাহিনীকে কাব্যসৃষ্টির প্রয়োজনে রূপান্তরিত করে নিয়েছেন। যে কহিনী অবলম্বন করে রামায়ণ কাব্য রচিত সে কাহিনী অবশ্য কবিকল্পনা নয়।” অর্থাৎ ঐতিহাসিক উপন্যাসে যেমন ইতিহাসের যথার্থ অনুসরণ না হলেও তা ইতিহাসের ওপরেই রচিত, রামায়ণও তেমনি অনেকাংশে ঐতিহাসিক কাহিনিকাব্য। তুলনীয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবীচৌধুরানী’, ‘রাজসিংহ’; দ্বৈপায়নের মীরজাফর’, ‘মহারাণা প্রতাপ’, ‘পৃথ্বীরাজ চৌহান’; শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের শাহজাদা দারাশুকো’ ইত্যাদি।
রামায়ণ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের বিরোধের ইতিহাস, রামায়ণ আর্য ও অনার্যের আধিপত্যের ইতিহাস, রামায়ণ শৈবধর্ম ও বৈষ্ণব ধর্মের সংঘাতের ইতিহাস, রামায়ণ উত্তর ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতে রাজ্যবিস্তারের ইতিহাস, রামায়ণ অরণ্যচারীদের সঙ্গে কৃষিজীবীদের বিকাশের ইতিহাস–যেভাবেই দেখা হোক না-কেন ইতিহাস নয় কেন? শুধু রামায়ণ কেন–মহাভারত, পুরাণ সবই কাব্যের মোড়কে ইতিহাস তো বটেই। মানুষের সমীহ আদায়ের জন্য, মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য অলৌকিক ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে এবং দেবত্ব আরোপ করা হয়েছে। মানুষ যা পারে না, তাই-ই দেবতারা পারে! তাই মহাভারত-রামায়ণে যখনই অতিশক্তি অলৌকিকতার প্রয়োজন হয়েছে তখনই দেবতার ম্যাজিক উত্থাপন হয়েছে। আসলে এর মাধ্যমে ক্ষত্রিয় আর ব্রাহ্মণদের আধিপত্য বিস্তার করেছে। ব্রাহ্মণদের ভয় করতে শুরু করেছে বাকিরা। রামায়ণ যতটা না ইতিহাস, তার চেয়ে বেশি অলৌকিক হয়ে উঠেছে। যুক্তিবাদী সত্যসন্ধানীরা রাজহাঁসের মতো দুধ থেকে জল বাদ দিয়ে পান করতে পারলে লাভবান হবেন। ভক্তি থাক বা না-থাক, রামায়ণ ইতিহাসের আকর হয়েই থাকবে।
কবি বা লেখক কেউই সমাজের বাইরের সদস্য নয়, সমাজ বহির্ভূত অলৌকিক কেউ নন। তাই যিনিই লিখুন, যখনই লিখুন তাঁর রচনার সমাজের কিছু চিত্র লিপিবদ্ধ হবে এতে আশ্চর্যের কী আছে! ইতিহাসে অলৌকিক বিষয় লিপিবদ্ধ হয় না, অপরদিকে সাহিত্যে অলৌকিকত্ব লিপিবদ্ধ করার অবাধ স্বাধীনতা রয়েছে। কোনো সাহিত্যিকের সাহিত্যে বা কাব্যে অলৌকিকত্ব প্রমাণ করার কোনো দায় নেই। কিন্তু ইতিহাস সে দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।
আমাদের যে ইতিহাস জ্ঞান তার সবই বিদেশি ঐতিহাসিকদের থেকে অর্জন করেছি। প্রাচীন যুগ ও মধ্যযুগের কোনো ইতিহাস ভারতীয়রা লিখে উঠতে পারেননি। সেই ইতিহাসটা সম্পূর্ণই অন্ধকারে। মুসলমান আক্রমণের আগে ভারতের বহু ইতিহাস পাওয়া যায় না ভারতীয়রা দর্শন, কাব্য, বিজ্ঞান বিষয়ক ভুরি ভুরি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা লিখেছেন, কিন্তু একটিও ইতিহাস লেখেননি। প্রাচীন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ব্রাহ্মণরাই পণ্ডিত ও উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। কিন্তু তাঁরা পরম পিতার ধ্যানেই লিপ্ত থাকতেন। আধ্যাত্মিকতায় বিভোর থাকবেন। এতটাই বিভোর থাকতেন যে, তাঁরা অত্যাবশ্যক ঘটনাগুলি লিপিবদ্ধ করে উঠতে পারেননি। ভারতীয় প্রাচীন ইতিহাস গভীর তমসাচ্ছন্ন ছিল। ম্যাক্রিন্ডল বলেন, গ্রিক ও রোমান গ্রন্থকারের বর্ণনা না-থাকলে তৎকালীন ভারতীয় ইতিহাসের কোনো উপাদানই পাওয়া যেত না। সেলুকাসের দূত মেগাস্থিনিসের ‘ভারতের বিবরণ থেকে আমরা বেশকিছু প্রাচীন তথ্য জানতে পারি। যদিও মেগাস্থিনিসের ইতিহাসে প্রচুর অলৌকিক, উদ্ভট বর্ণনা আছে। সেসব মেগাস্থিনিস কোথায় পেলেন সেটা মেগাস্থিনিসই জানেন। তবে মেগাস্থিনিসের ইতিহাস পাঠ করলেই বোঝা যায়, প্রাচীন যুগে মানুষদের মধ্যে সুপারন্যাচারাল উদ্ভট কাহিনি লেখার সংক্রমণ ছিল। রামায়ণ, মহাভারত, ৩৬টি পুরাণ ইত্যাদি সব কাহিনিই একইভাবে ভয়ানক সংক্রমিত। শুধুমাত্র প্রাচীন যুগেই নয়, মধ্যযুগের অনেকটা সময় পর্যন্ত সুপারন্যাচারাল কাহিনির রমরমা। এমনকি মেগাস্থিনিস, হিউয়েন সাঙ, ফা হিয়েন, ইবনবতুতার গ্রন্থগুলিতে এমনই সব সংখ্য সুপারন্যাচারাল কাহিনি পাওয়া যায়। সেই উর্বর মস্তিষ্কের চাষবাস মানুষ এখনও অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন। মেগাস্থিনিস, হিউয়েন সাঙ, ফা-হিয়েন, ইবান বতুতা, আবুল ফজল, বাণভট্ট, কনুন, বিহুন–এঁরা যাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকতেন, তাঁরা তাঁদের প্রভুদেরই গুণগান লিখে গেছেন অতিরঞ্জিত করে।
