রামায়ণের রাম-সীতার মাহাত্ম্য, ভাবের গভীরতায় এবং ভাষার প্রাঞ্জলতায় এমনই হৃদয়গ্রাহী যে, ভারতের আবালবৃদ্ধবনিতা তাঁর দ্বারা চির-অনুপ্রাণিত। রামের অসাধারণ মাতৃশক্তি, ভরত ও লক্ষ্মণের অতুলনীয় ভাতৃভক্তি ও সীতার অনুপম পাতিব্ৰত্য জনমানসকে মুগ্ধ করে এবং অনুপ্রাণিত করে। ত্যাগের মহিমায় এঁরা সকলেই স্বমহিমায় ভাস্বর। ক্ষমা, ত্যাগ, সত্য, সহিষ্ণুতা, প্রজাবৎসল্য ও দৃপ্ত পুরুষকারের জ্বলন্ত বিগ্রহ রামচন্দ্র। সতীকুল শিরোমণি সীতা রমণীকুলের রত্নস্বরূপা। দশরথ ও কৌশল্যার মধ্যে আমরা স্নেহকাতর পিতামাতাকে পাই। আদর্শ প্রভুভক্ত হনুমান তো সকলেরই নমস্য। সেও রাম-সীতার অপেক্ষা কম জনপ্রিয় নয়, তাঁরও ভক্তকুল বিশাল। ভারতের নরনারী পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে রাম, সীতা ও হনুমানের নাম জপ (হনুমান চাল্লিশা) করে। রামের একটি বিশেষ মূর্তিতে তাঁর পাশে তাঁর ভাই লক্ষ্মণ, স্ত্রী সীতা ও ভক্ত হনুমানকে দেখা যায়। এই মূর্তিকে বলা হয় রাম পরিবার। হিন্দু মন্দিরে এই ‘রাম পরিবার’ মূর্তির পুজোই বেশি হতে দেখা যায়। ভারতবাসী আজও ‘রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। তবে সবটাই বাইরে থেকে নয়, পুরো মাহাত্মটাই রামায়ণের ভিতরে ঢুকে দেখতে হবে। ভক্তের দৃষ্টিতে নয়, দেখতে হবে যুক্তির দৃষ্টিতে।
হিন্দুধর্মের রাম উপাসনাকেন্দ্রিক সম্প্রদায়গুলিতে যে রামকে বিষ্ণুর অবতার না-বলে সর্বোচ্চ ঈশ্বর’ হিসাবে মান্য করার প্রবণতা দেখা যায়, সেই রামের বিষয়ে শুরু থেকেই শুরু করা যাক। ব্যক্তিনাম হিসেবে ‘রাম’ শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্বেদে (১০৯৩১৪): “দুঃসীম প্রথবনের স্তব গাই, বেণ ও রামের স্তব গাই, বিশিষ্ট অসুরদের স্তব গাই, রাজন্যবর্গের স্তব গাই”। রাম শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ হল ‘রামী’, রাত্রির একটি বিশেষণ। বেদে দুই জন রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথম জন হলেন মার্গবেয়’ বা ‘ঔপশ্বিনী’ রাম এবং দ্বিতীয় জন হলেন ‘জামদগ্ন্য’ রাম। উত্তর-বৈদিক যুগে তিন জন রামের কথা জানা যায়–(১) বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম। ইনি দশরথের পুত্র এবং রঘুবংশে জাত।(২) বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম। ইনি ‘জামদগ্ন্য’ বা ‘ভার্গব’ রাম নামে পরিচিত। ইনি অমর।(৩) কৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও বিষ্ণুর অষ্টম অবতার বলরাম।
বিষ্ণু সহস্রনাম স্তোত্রে বিষ্ণুর ৩৯৪ তম নামটি হল রাম। আদি শঙ্করের টীকা অনুসারে রাম’ শব্দের দুটি অর্থ আছে–যোগীরা যাঁর সঙ্গে রমণ (ধ্যান) করে আনন্দ পান, সেই পরব্রহ্ম বা সেই বিষ্ণু যিনি দশরথের পুত্ররূপে অবতার গ্রহণ করেছিলেন। রামের অন্যান্য নামগুলি হল ‘রামবিজয়’ (জাভানিজ ভাষা), ফ্রেয়াহ রাম (খমের ভাষা), ফ্রা রাম (লাও ভাষা ও থাই ভাষা), মেগাত সেরি রাম (মালয় ভাষা), রাকা বানতুগান (মারানাও ভাষা) ও রামায় (তামিল ভাষা)।
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে ‘রামাসুর’-এর উল্লেখ আছে। পারসিকদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ আবেস্তায় উল্লেখিত ‘রামাহুর’ একজন শান্তির দেবতা। অনেকেই মনে করেন আবেস্তার ‘অহুর’-কেই বেদে ‘অসুর’ হিসাবে দেখানো হয়েছে। আরবি ভাষায় ‘রামা’ বলে একটি শব্দ আছে, যার অর্থ নিক্ষেপকারী’ মেঘের মানবিক সত্ত্বা কল্পনা করলে মনে হয় সে যেন বৃষ্টির শর নিক্ষেপ করছে। লৌকিক মেঘবন্দনা গানের দেবতা ‘রামা’ যখন আর্যসমাজে তথা সংস্কৃত ভাষায় স্বীকৃতি পেল, তখন ‘রাম’ শব্দে পরিবর্তিত হল। সংস্কৃত ভাষায় রামা’ শব্দের অর্থ রমণীয়া, শুভ্রা, সুন্দরী স্ত্রী, প্রিয়া। লক্ষ্মীর অন্য নামও রামা। সীতাও লক্ষ্মীর অংশজাতা। রামা’ শব্দের পুংলিঙ্গে রাম’ হতে পারে। যেমন মূলশব্দ ‘বামা’ স্ত্রীলিঙ্গে হলেও পুংলিঙ্গে কিন্তু ‘বাম’। রামা’ শব্দের পুংলিঙ্গে ‘রাম’ ধরে নেওয়া হয়। রাম শব্দের অর্থ অসিত, অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণ। অসিতের বিপরীত সিত, সিত শব্দের অর্থ শুভ্রবর্ণ। সিত শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গে সীতা, গৌরবর্ণা। অতএব রাম অসিত, সীতা সিত। অনেকে বলেন রাম হল মেঘদেবতা, সীতা কৃষিশ্রী। রামায়ণের মূল ভিত্তিই কৃষি৷ অতএব রামায়ণ হল রামের অর্থাৎ মেঘের বা মৌসুমী বায়ুর অয়ন, অর্থাৎ আবর্তন। অর্থাৎ, রাম (মেঘ) অথবা রামা (কৃষিশ্রী) হয়েছে অয়ন (আশ্রয়) যার। মেঘদেবতা রাম এবং কৃষিশ্রী সীতা আজ হিন্দুধর্মের দেবদেবী।
নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে রাম এবং রামায়ণ কোনো কাল্পনিক গাথা নয়, ঐতিহাসিক সত্য ঘটনাই এর মূল উপজীব্য–এক প্রদর্শনীতে এমনটাই দাবি করল দিল্লির ললিত কলা অ্যাকাডেমি। সেইসঙ্গে প্রকাশ্যে এনে ফেলল মিথোলজিক্যাল চরিত্রগুলি সম্পর্কে একাধিক তথ্যও। ইন্সটিটিউটের দাবি, রামচন্দ্রের জন্ম ৫,১১৪ খ্রিস্টপূর্বে। ১০ জানুয়ারি দুপুর ১২ টা ৫ মিনিটে জন্ম হয় তাঁর। সময় উল্লেখ করা রয়েছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধেরও। ৩১৩৯ খ্রিস্টপূর্বে ১৩ অক্টোবর শুরু হয়েছিল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। আর ৫০৭৬ খ্রিস্টপূর্বের ১২ সেপ্টেম্বর, অশোককাননে সীতার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল হনুমান। এক মার্কিন সফটওয়্যার এই গবেষণায় সাহায্য করেছে বলে জানা গিয়েছে। ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ললিত বালা জানান–আমাদের ইতিহাস ১০,০০০ বছরের পুরনো। রামায়ণ ও মহাভারতে উল্লিখিত সময়ের হিসাব ধরেই আমরা আসল সময় চিহ্নিত করতে পেরেছি।” সাধারণভাবে রামায়ণের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যের উপরে নির্ভর করে ঐতিহাসিকরা মনে করেন, রামায়ণের কাহিনি ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ঘটনা। এই গবেষণা সেই সময়কালকে এক ধাক্কায় আরও ৩০০০ বছর পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী। স্বাভাবিকভাবেই এক বাক্যে এই মতকে মেনে নিতে আপত্তি রয়েছে ঐতিহাসিক মহলের। আই-সার্ভের গবেষণা পদ্ধতি সবিস্তার না-জানা পর্যন্ত এই মতের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন তাঁরা। অন্য এক তথ্য বলছে–“রাম, যাঁর জন্ম হয়েছিল ৫০০০ বছর আগে এবং কৃষ্ণ, যাঁর জন্ম হয়েছিল ৩৫০০ বছর আগে।” এইসব গবেষণার সত্যাসত্য আমার পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কোনো নির্ভরযোগ্য সিলমোহর দিয়েছেন কি না তাও জানা সম্ভব হয়নি। অতএব এই গবেষণা আমার কাছে অর্থহীন। আমার আলোচনাতেও এ প্রসঙ্গ কোনোভাবেই আসবে না।
রামায়ণ কী ইতিহাস, নাকি রূপক?
যে অবস্থায় আমরা বাল্মীকির রামায়ণ গ্রন্থখানিকে পেয়েছি, সেই অবস্থায় এ গ্রন্থখানিকে ‘নির্জলা ইতিহাস’ শিরোপা দিলে আমার কিঞ্চিৎ আপত্তি আছে। কেননা রামায়ণ যে নিখাদ ইতিহাস এমন অথেনটিক ইতিহাস তো সমসাময়িক ইতিহাসবিদরা লিখে রেখে যাননি। তা ছাড়া বাল্মীকি বা অন্যান্য কবিরাও কিন্তু তাঁদের রচনাকে ইতিহাস বলে দাবি করেননি। রামায়ণের সত্যতা এবং ঐতিহাসিকতা নিয়ে এ পর্যন্ত বহু আলোচনা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। ভারতীয় সাহিত্যে রাম বিষয়ক নানা বিচিত্র কাহিনি পাওয়া যায়, কিন্তু সেগুলিতে একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্য না-থাকায় বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, সত্যতা বিচার কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকের মতে রামায়ণের কাহিনি সত্য নয়, নিছক রূপকমাত্র। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বাল্মীকি রামকথার ক্ষীণসূত্র ধরেই গোটা রামায়ণটি রচনা করেছেন।দ্বিতীয় মতটি বেশি গ্রহণযোগ্য। কারণ রামকথায় কোনো সত্য ঘটনার বীজ না-থাকলে এত রূপান্তর চোখে পড়ত না। বাল্মীকির রামায়ণের সূচনাতেও এর ইঙ্গিত আছে। রাম না হতে রামায়ণ’ প্রবাদটি নিছক প্রবাদরই, অতিরঞ্জিত। রাম না-জন্মাতেই রামায়ণ রচিত হয়নি। অযোধ্যার সিংহাসনে রামচন্দ্রের অভিষেকের পরেই রামায়ণ রচিত হয়েছে। বাল্মীকির রামায়ণে সেকথা উল্লেখ আছে–”প্রাপ্তরাজ্যস্য রামস্য বাল্মীকিৰ্ভগবান্ ঋষিঃ।/চকার চরিতং কৃতং বিচিত্রপদমর্থবৎ”। রামায়ণ, মহাভারত যথার্থভাবে জানা না-থাকলে ভারতের ইতিহাস জানা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
