ধর্মপ্রাণ সকল মুসলমান পণ্ডিতদের লেখা থেকে আমরা জানি, ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে আরবের সমাজ ছিল ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা বর্বরতম যুগ! তখন জীবন্ত কন্যা সন্তানকে কবর দেওয়া হত! কবর দেওয়ার এই বিষয়টি এতই মর্মস্পর্শী যে, মানুষ সেই যুগকে ইতিহাসের সবথেকে নিকৃষ্টতম’ অধ্যায় বলে সহজেই বিশ্বাস করে নেয়! আসলে বিষয়টি অনেক প্রশ্নের দাবি রাখে! আমরা জানি, তখনকার পবিত্র কাবা ঘরের ভিতরে ৩৬০ টি দেবতার মূর্তি ছিল। প্রতিটি দেবতা একেকটি গোত্রের প্রধান ‘দেবমূর্তি’ হিসাবেই সহাবস্থান করত এবং সবাই একই উপাসনালয় ‘কাবাগৃহে’ তাদের পূজা অর্চনার কাজ মিলেমিশে করত৷ এই বিষয়টি থেকে পরিষ্কার হয় যে, তৎকালীন আরবে চমৎকার একটা ধর্মীয় সম্প্রীতি বিরাজমান ছিল। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় আরব ছিল তখন পৃথিবী বিখ্যাত। কবিদের মধ্যে কাব্য রচনার ‘কবি যুদ্ধ’ হত। ইমরুল কায়েসের মতো প্রাচীন। বিখ্যাত অনেক মানবতাবাদী কবি জন্মেছিলেন তখনকার আরবে! সুতরাং বলা যায়, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে আরব সমাজ ছিল তখন একটি প্রকৃষ্ট সম্প্রীতির উদাহরণ।
প্রফেসর পি কে হিট্টির মতে–“শিশু কন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার বিষয়টি হিন্দুদের সতীদাহ প্রথার মতোই খুব অনভিপ্রেত এবং গুটিকয়েক ঘটনা ছিল আরবে!” অতি দরিদ্র এবং অতি মূর্খ কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিছু আরব এই জঘন্য কাজটি করত। যেটির সংখ্যাগত দিক বিবেচনায় তৎকালীন গোটা আরবকে ‘জাহেলিয়াত’ জাতি বলে বিবেচনা করা অনুচিত হবে। এছাড়াও মহানবির বেশির ভাগ সাহাবিদের গণ্ডায় গণ্ডায় স্ত্রী ছিলেন। সঙ্গে দাসী, যৌনদাসী তো ছিলই–এইসব ছিল আরব সমাজের একটা সাধারণ প্রচলিত প্রথা। নবিজির নিজের বিবাহ সংখ্যা ছিল কমপক্ষে এগারোটি। প্রশ্ন হল, সবাই যদি কন্যাদের মাটিতে পুঁতে ফেলত, তাহলে আরবের লোক এত ‘আওরত’ তখন পেত কোথায়? পুরুষের থেকে নারীদের সংখ্যার অনুপাত আরবে এখনও পর্যন্ত বেশি, যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ বেশিরভাগ আরবের ঘরে কমপক্ষে তিনটি চারটি করে বউ থাকে।
তাই দৃষ্টি নির্মোহ না-হলে সত্য-মিথ্যা সব গুলিয়ে যাবে। যুক্তি না-থাকলে ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। এখনও পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, তা হল–রচনাকালের দিক থেকে দেখলে রামায়ণ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা দ্বিতীয় থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতকের মধ্যেই রচিত। মহাভারত রচনা সম্ভবত শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম বা চতুর্থ শতক থেকে এবং শেষ হয় খ্রিস্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে। অর্থাৎ বুদ্ধের পরের ৮০০ বা ৯০০ বছরের মধ্যে এই দুটি মহাসাহিত্য রচিত হয়। এদের মধ্যে মহাভারত আগে শুরু হয়ে পরে শেষ হয়। রামায়ণ পরে শুরু হয়ে আগে শেষ হয়। এরপর রামায়ণ শেষ হওয়ার কাছাকাছি সময়ে কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’, বাৎস্যায়নের কামসূত্র’, ‘শ্রীমদ্ভাগবদগীতা’, ‘মনুসংহিতা’ও রচিত হয়ে যায়।পরপরই পুরাণগুলি রচিত হয়েছে।
ল্যাসেন, ওয়েবার, ইয়াকোবিদের মতো পণ্ডিতগণ মহাভারতকে রামায়ণের আগে বলে যে যে যুক্তি দেখিয়েছেন, সেগুলিও জেনে নিতে পারি। তবে লোকপ্রসিদ্ধি ও অধিকাংশ মতানুসারে রামায়ণকে মহাভারতের পূর্ববর্তী বলেই স্বীকার করা যায়। যুক্তিগুলি দেখা যাক–(১) বাল্মীকি আদিকবি রূপেই প্রসিদ্ধ। তাই তাঁর লেখা রামায়ণ আগে রচিত হয়েছিল বলা যায়। (২) চার যুগের মধ্যে ত্রেতাযুগে রামাবতার এবং তারপরের দ্বাপরে কৃষ্ণাবতার হওয়ার আগে রচিত মনে হয়।(৩) রামায়ণে সহমরণের ঘটনা নেই, মহাভারতে মাদ্রীর সহমরণের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।(৪) রামায়ণের যুদ্ধকাণ্ডের একটি শ্লোক (৮১/২৮) মহাভারতে দ্রোণপর্বে অবিকল উল্লেখ আছে।(৫) মহাভারতে বাল্মীকির নাম পাওয়া যায়, রামায়ণে কিন্তু ব্যাসদেবের উল্লেখ নেই। (৬) সূর্যবংশের উল্লেখ রামায়ণে আছে, যা আগে। পরে চন্দ্রবংশের কথা উল্লেখ আছে, যা মহাভারতে আছে।(৭) মহাভারতে রামায়ণের উল্লেখ আছে। কিন্তু রামায়ণে মহাভারতের কোনো চরিত্র বা ঘটনার কথা কোনোভাবেই নেই।(৮) রামায়ণের সভ্যতা অনাড়ম্বর, সরল ও অরণ্য প্রভাবিত। অপরদিকে মহাভারতের সভ্যতা নগরকেন্দ্রিক, জটিল ও কুটিল। (৯) রামায়ণে আর্যসভ্যতার সঙ্গে বানর ও রাক্ষস সভ্যতা পাই। মহাভারতে এরা অনুপস্থিত।(১০) বৈয়াকরণ পাণিনির কাল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক। মহাভারতে পাণিনীয় অনুশাসন মান্য হলেও রামায়ণে অনুপস্থিত। (১১) আর্যদের অধিকৃত এলাকা রামায়ণে মহাভারত অপেক্ষা কম থাকায় রামায়ণ মহাভারতের রচিত বলে মনে করা হয়। (১২) কলেবর অর্থাৎ আকারের দিক থেকে মহাভারত আগে বৃহৎ হওয়ায় রামায়ণকে রচনার দিক থেকে আগে রাখা যায়। (১৩) রামায়ণ অপেক্ষা মহাভারতের যুগে স্ত্রীশিক্ষার প্রসার বেশি ঘটেছিল। তাই রামায়ণ আগে রচিত হয়েছিল বলে মনে করা যয়া(১৪) রামায়ণে আর্যরাজের (রাজপুত্র) সঙ্গে অনার্যরাজের (রাক্ষস) যুদ্ধ বর্ণিত হয়েছে। অপরদিকে মহাভারতে প্রায় সব রাজাই আর্য। (১৫) রামায়ণের যুগে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। সে যুগে সম্পূর্ণ দাক্ষিণাত্য ছিল রাক্ষস’ অধ্যুষিত এবং অরণ্যাবৃত। কিন্তু মহাভারতের যুগে জরাসন্ধাদি শাসিত সুবিশাল ও সুসংহত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মেলে। অতএব মহাভারত তার সমাপ্তি পর্বে পৌঁছোনোর আগে রামায়ণ তার পূর্ণতা পেয়েছিল।
