মাইকেল মধুসূদনের পূর্বে বাংলা কাব্যচর্চা মধ্যযুগেই পড়ে ছিল। তিনিই একমাত্র একক প্রচেষ্টায় এক ধাক্কায় বাংলা কাব্যকে মধ্যযুগীয় কাব্যের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করেন এবং আধুনিকতার আঙ্গিনায় উপস্থাপিত করেন। এরকম উদ্ধত, দ্রোহী, আত্মম্ভর পুরুষ এরকম অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান কবি বাংলা সাহিত্যে আর জন্মায়নি। হয়তো কোনোদিন আর জন্মাবেও না। মেঘনাদবধকাব্য’ যখন তিনি লেখেন তখন বাংলা ভাষা ছিল একটি অবিকশিত ও অশক্তিশালী ভাষা। বস্তুত এটি ছিল ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠীর আঞ্চলিক ভাষা। মহত্তম ভাবপ্রকাশের জন্য অপর্যাপ্ত এবং অপরিশ্রুত এবং অনাদরণীয় ছিল এই ভাষা। সমাজের চাষাভূষা মানুষের অবহেলিত ভাষা এই বাংলা ভাষা। উঁচুমহলে তো এর কোনো ঠাঁই-ই ছিল না।
‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এ তিনি একটি অচিন্তনীয় এবং অভাবনীয় এক ব্যাপার ঘটিয়েছিলেন। যাঁরা গ্রন্থটি পাঠ করেছেন তাঁদের নিশ্চয় সেই রসাস্বাদন করেছেন যে, রাম এবং রাবণের চরিত্র আমরা যেরকম করে জানি, তিনি সেটিকে উলটে দিয়েছিলেন স্পন্দিত স্পর্ধায়। বাল্মিকীর রামায়ণে রাম সৎ, সাহসী, সত্যনিষ্ঠ এবং দয়াবান। অপরদিকে রাবণ পাপীতাপী, অন্যায়কারী এবং অত্যাচারী। কিন্তু মধুসূদনের রাম ভীরু, শঠ, প্রতারক এবং দুর্বল চরিত্রের মানুষ। অপরদিকে রাবণ দুর্জয় ও সাহসী শাসক, স্নেহময় পিতা, প্রজাহৈতিষী। দেবতাদের চক্রান্ত ও কোপানলে পড়ে তিনি একজন বিরহী ও দুঃখী মানুষ। তিনি রামায়ণ নির্দেশিত পথে না চলে রাক্ষস জাতির প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়েছেন। তাঁর রচনায় রাক্ষসেরা কল্পিত কোনো বীভৎস এবং ঘৃণ্য কোনো প্রাণী নয়, বরং আমাদের মতোই আবেগ-অনুভূতিতে পূর্ণ মানুষ। রাবণ চরিত্রের জন্যই ‘মেঘনাদবধকাব্য’ করুণ রসের আধার হয়ে উঠেছে। মেঘনাদবধ অমিত তেজী, বিদ্রোহী রাবণের পরাজয়ের বেদনাবিধুর কাহিনি। রাম কর্তৃক আক্রান্ত, পর্যদস্ত, রাবণ বংশগৌরব এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষার জন্য সর্বস্ব পণ করে বসে আছেন এবং প্রতিকূল দৈবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। রাবণের এই মর্মবিদারক ব্যথাই কাব্যটির বিষয়বস্তু। মেঘনাদবধের রাবণ যেন মধুসূদন নিজেই। তার জীবনেও এই একই দুর্বিনীত সংগ্রাম এবং করুণ পরাজয়ের শোকগাথা লেখা রয়েছে। এই শোকগাথার জন্য অবশ্য অন্যেরা যতটুকু না দায়ী, তিনি নিজেও তার চেয়ে বেশি দায়ী। আজকের এই অস্থির পরিবেশে দাঁড়িয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যদি ‘মেঘনাদবধ কাব্যটি রচনা করতেন, তাহলে হয়তো কাব্যটি ব্যান হয়ে যেত, কবিকে হয়তো জেলযাত্রা করতে হত কিংবা কবির মুখে কালিলেপন করা হত।
ভারতীয় হিন্দুসমাজে রামায়ণের রাম-সীতা দেবত্বে অধিষ্ঠিত হলেও রামকথার প্রকৃত জনপ্রিয়তা লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রেই। এই কারণেই রামকথা শিল্প, সাহিত্য, সংগীত এবং সাধারণ মানুষের সমাজচিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। স্থান-কালভেদে রামকথার বিন্যাস ও চরিত্র অনেকাংশেই সংযোজন-পরিমার্জন হয়েছে–একথা সত্য। কিন্ত কাহিনির মূল কাঠামোটি প্রায় অপরিবর্তনীয় আছে। রামায়ণের নিয়ে রচনাকাল নিয়ে যেমন মতান্তর আছে, তেমনই রাম ও অন্যান্য বিষয়টি ঐতিহাসিক কি না সে বিষয়েও যথেষ্ট সংশয় করেছেন পণ্ডিতগণ।
যদিও আমার আলোচ্য বিষয় রামায়ণ, কিন্তু মহাভারত গ্রন্থটিও এ আলোচনায় প্রাসঙ্গিক! রামায়ণের মতো মহাভারতও ভারতীয়দের কাছে পরম আদরণীয়, মহত্ত্বপূর্ণ–পরম পবিত্রও। রামায়ণ ও মহাভারত উভয় মহাগ্রন্থই ভারতের ইতিহাসের আকর রূপে মর্যাদা পায়। মহাভারতকে বাদ দিয়ে রামায়ণ আলোচনা করলে এই আলোচনা অসমাপ্ত থেকে যাবে। তাই মহাভারত প্রসঙ্গ টানতেই হচ্ছে। বাল্মীকি ও ব্যাস উভয়েই যথাক্রমে রামায়ণ ও মহাভারতের সংকলক। বস্তুত উভয়ই ‘ব্যাস’। কারণ বিষ্ণুপুরাণে রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকিকেও ‘ব্যাস’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ব্যাসের ধারণা যখন জন্মলাভ করে তখন বেদই ছিল। দেবমন্ত্রী স্বয়ং ব্রহ্মাই বেদের সংকলক বলে অভিহিত। তিনিই আদি ব্যাস। ব্যাস তিনিই, যিনি জাতীয় জীবনে যা কিছু শুভকর যা কিছু মঙ্গলদায়ক সেগুলিকে সংকলন করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। বিষ্ণুপুরাণে ২৯ জন সংকলক বা ব্যাসের কথা জানা যায়।
মহাভারতের বেশকিছু পর্বে রামায়ণের দশরথ, জনক, রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, রাবণ, হনুমান প্রভৃতি কথাপুরুষ উদাহরণ বারবার উল্লেখ আছে। কোনো স্থলে যজ্ঞের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদনের জন্য দশরথের নাম, কখনো-বা স্বামীভক্তির দৃষ্টান্ত দেখাতে সীতার পাতিব্ৰত্যের উল্লেখ আছে, কখনো-বা বিদুর কর্তৃক ধর্মপ্রাণ ভীষ্ম ও দ্রোণের প্রশংসা অথবা অর্জুনের বীরত্বের তুলনা প্রসঙ্গে রামচন্দ্রের কথা, কোনো প্রসঙ্গে রাবণের প্রসঙ্গও এসেছে। এমনকি রামায়ণের রামভক্ত হনুমানকেও পাওয়া গেছে মহাভারতের বনপর্বে। মহাভারতের বিভিন্ন পর্বে রামায়ণে বর্ণিত নানা যুদ্ধের বর্ণনা মেলে। দ্রৌপদী ও অন্যান্য ভাইদের সঙ্গে বনবাস জীবনে দুঃখিত যুধিষ্ঠিরকে সান্ত্বনাদানের জন্য মার্কণ্ডেয় মুনির মুখে রামকথা বর্ণিত আছে।
মহাভারতে রামায়ণের বিভিন্ন ঘটনা বিভিন্ন সময়ে মর্যাদার সঙ্গে উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু রামায়ণে মহাভারতের কোনো ঘটনাই উল্লেখ নেই। কেন এরকম? দুটি গ্রন্থ কি সমসাময়িক নয়? আগেই উল্লেখ করেছি রামায়ণ গ্রন্থটির রচনাকাল ৮০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। কিথ (Keith) বলেন, রামায়ণ খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে রচিত। ভিন্টারনিৎস (Winternitz) ও বুলকে (Bulcke) বলেছেন, রামায়ণের রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকেই। কিন্তু মহাভারতের রচনাকাল আনুমানিক ৭০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে শুরু করে ২০০ থেকে ৩৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। সৌত রচনা (জয়), ব্রাহ্মণ্য রচনা (ভারতসংহিতা) এবং শ্রমণগণের রচনা (মহাভারত)–এই তিনটি স্তরে রচনা হয়েছে। সাম্প্রতিককালের গবেষণায় জানা গেছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ খ্রিস্টপূর্ব ৩১৩৬ অব্দে ঘটেছিল। অতএব মহাভারতের রচনাকাল এই সময়ের কিছু পরে হতে পারে। সেই কারণেই কি মহাভারতের পেটের ভিতর রামায়ণের এত ঘটনা ঢুকে আছে? নাকি দুটি গ্রন্থই সমসাময়িক? ব্যাস কী পূর্বজ গুরু বাল্মীকির শিষ্য, তাই কি রামায়ণের প্রতি এত আনুগত্য, কৃতজ্ঞতা? তাই কি পটভূমি ও উপজীব্য প্রায়ই একই–অন্যায়ভাবে যুদ্ধ আর ভুরি ভুরি অলৌকিকতা? তাই নিপাট ইতিহাস হয়ে উঠতে পারেনি। কুহেলিকাময় ইতিহাস মানুষের কাছে প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরে, যুগে যুগে। অপ্রার্থিতা, অলৌকিকতা, কখনোই ইতিহাস হতে পারে না–তা কেবলই রূপকথা। তাই কি রচনাকাল রহস্যাবৃত? রামায়ণ যদি ইতিহাস হয়, তবে বলা যায়–ইতিহাসকে কখনো বিশ্বাস দিয়ে যাচাই করা ঠিক নয়! একটি বিষয়ের ইতিহাস পাঁচ জন লেখকের বর্ণনায় ভিন্ন পার্থক্যের তৈরি করতে পারে! তৈরি তো হয়ই। তাই ঘটনার নিরপেক্ষতা বোঝার স্বার্থে সকল বিশ্লেষক, গবেষক মায় ঐতিহাসিকের লেখা পড়াটাই যুক্তিযুক্ত!
