রামায়ণের বৌদ্ধ বা জৈন সংস্করণে রাবণকে একজন ভক্ত জৈন হিসাবে উল্লেখ হয়েছে। আবার থাইল্যান্ডের রামায়ণের সঙ্গে কৃত্তিবাসী রামায়ণের মিল নেই। ইন্দোনেশিয়ার রামায়ণের সঙ্গে তুলসীদাসের রামায়ণে প্রচুর গরমিল। তামিল ভাষায় রচিত কম্বন রামায়ণের সঙ্গে খোটানের রামায়ণেও অনেক অমিল। কন্নড় ভাষায় রচিত রামায়ণে যোগীর তুক করা আমের শাঁস খেয়ে রাবণ গর্ভবান হন। কী আর করা! রাবণ তো আর মহিলা নন যে, নির্দিষ্ট পথে সন্তান প্রসব করবে! অতএব হাঁচির সঙ্গে সন্তান বেরিয়ে আসে বাইরে! এই সন্তানই হলেন সীতা। আদিবাসী সমাজের কোনো-কোন অঞ্চলে রাবণ নায়ক–তাঁকে প্রধান চরিত্র করে রচিত হয়েছে রাবণগাথাও।
থাইল্যান্ডে রাম নামে একাধিক রাজা ছিলেন, এঁরা সকলে বিষ্ণুর অবতারও ছিলেন। আর আয়োধিয়া (অযোধ্যা) নামে রাজ্য ছিল। ১৩৫০ সালে নতুন এক রাজবংশের পরাক্রান্তা রাজা রামাধিপতি নতুন অযোধ্যা (Ayuthia > আইযুথিয়া) নগরী স্থাপন করে সেখানেই নিজের রাজধানী পত্তন করেন। শ্যামদেশের (বর্তমানের থাইল্যান্ড) এখনকার রাজবংশের নাম মহাচক্রীবংশ। এই বংশের প্রত্যেক রাজা রাম’ নামে অভিহিত। ১৭৮২ সালে এই রাজবংশের পত্তন হয়। প্রথম রাজার নাম ছিল ‘রাম ফা বুদ্ধয়োদ ফা চূড়ালোক। এই রাজার শাসনকাল ছিল ১৭৮২ সাল থেকে ১৮০৯ পর্যন্ত। দ্বিতীয় রাম ‘ফ্রা বুদ্ধ সোএস লা নাভালৈ’, তৃতীয় রাম ‘ফ্রা নাঙ ক্লাও’, চতুর্থ রাম ‘ফ্রা চোম ক্লাও মহামংকুৎ’, পঞ্চম রাম চূড়ালংকার’, ষষ্ঠ রাম বজ্ৰায়ুধ’, সপ্তম রাম ‘প্রজাধিপক’, অষ্টম রাম অজ্ঞাত, নবম রাম ‘অদুলদেৎ’। থাইল্যান্ডে ১৭০ বছর ধরে সাতপুরুষ জুড়ে রাম-রাজত্ব চলে আসছে। তাহলে থাইল্যান্ডের অযোধ্যার রাম আর ভারতের অযোধ্যার রাম কি একই ব্যক্তি? নিশ্চয় এক নয়। কারণ ভারতের কোনো পুরাণসাহিত্যে এর সমর্থনে কিস্যু জানা যায় না। থাইল্যান্ডে একটি রামায়ণের সন্ধান মেলে, নাম ‘রামাকিয়েন’। থাই ভাষায় ‘রামাকিয়েন’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘রামের পুণ্য হউক’। এটি থাইল্যান্ডের জাতীয় গ্রন্থ। এই রামায়ণে বাল্মীকির রামায়ণের সঙ্গে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। সুখখাতা সরকারের মৃত্যুর পর, অযোধ্যা বা আয়োধিয়া রাজ্যে অষ্টাদশ শতাব্দীতে কিংবদন্তিতে থাই সংস্করণটি প্রথম লিখিত হয়েছিল। তবে ১৭৬৭ সালে বার্মা (আধুনিক মায়ানমার) থেকে সৈন্যবাহিনী দ্বারা আয়োয় শহরটি ধ্বংস হয়ে গেলে অধিকাংশ সংস্করণই হারিয়ে যায়। আজকে স্বীকৃত সংস্করণটি সিয়ামের রাজত্বকালে রাজা রাম আমি (১৭২৬ ১৮০৯) চকরি বংশের প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর তত্ত্বাবধানে রচিত হয়েছিল। রামাকিনের রামের নাম ‘ফারারাম’ এবং রাবণের নাম ‘থোত্তকান’। বলা হয়েছে শ্রীলঙ্কার দুষ্টদের রাজা খোকন এবং ফারারামের প্রতিপক্ষের শক্তিশালী। থোকানের দশটি মুখ এবং কুড়িটি হাত এবং একটি অরাজক অস্ত্র আছে।
রামকিয়েনের রামকথা বিভিন্ন বিষয়ে স্বতন্ত্র। বাল্মীকি রামায়ণের কাহিনি মোটামুটি ঠিক থাকলেও ছোটো-বড়ো ঘটনাগুলির বিস্তর পার্থক্য আছে। এছাড়া বাল্মীকির রামায়ণের সুপরিচিত নামগুলোও যথেচ্ছ বিকৃতি হয়েছে। যেমন কৌশল্যা, সুমিত্রা, কৈকেয়ীর নাম যথাক্রমে কৌসুরিয়া, সমুদ্রজা, কৈয়কেশী। বশিষ্ঠের নাম ঠিক থাকলেও বিশ্বামিত্রের নাম বদলে স্বমিত্র হয়ে গেছে। রাবণের স্ত্রী মন্দোদরীর নাম হয়েছে মণ্ডো। চার ভাইয়ের গায়ের রং চার ধরনের। যেমন–রামের গায়ের রং হরিৎ বা সবুজ, ভরতের (থাইভাষায় ‘বরত’) গায়ের রং রক্ত বা লাল, লক্ষ্মণের (থাইভাষায় ‘লক্ষ্মণেব’) গায়ের রং পীত বা হলুদ এবং শত্রুঘ্নের (থাইভাষায় ‘শত্রুদ) গায়ের রং রক্তনীল।
মূল রামায়ণকে কেন্দ্র করে যেমন অনেক ভাষায় রামায়ণ লেখা হয়েছে, ঠিক তেমনই রামায়ণের অংশ নিয়ে প্রচুর গ্রন্থ লেখা হয়েছে। মনের রঙে মাধুরী মিশিয়ে রচিত হয়েছে নতুন নতুন কাহিনি। রঘুনন্দন গোস্বামী, রামানন্দ ঘোষ, জগত্রাম, রামপ্রসাদ প্রমুখ এরকম অনেকেই রামায়ণ অবলম্বনে কাব্য রচনা করে প্রভূত খ্যাতি লাভ করেছেন। কালিদসের ‘রঘুবংশম্’, ভাসের প্রতিমা’ ও ‘অভিষেক’, ভবভূতির মহাবীরচরিত’ ও ‘উত্তররামচরিত’, ভট্টির ‘রাবণবধ’, কুমারদাসের ‘জানকীহরণ’, মুরারির ‘অনর্ঘরাঘব’, ক্ষেমেন্দ্রর ‘রামায়ণমঞ্জরী, রাজশেখরের বালরামায়ণ’, জয়দেবের ‘প্রসন্নরাঘব’, ভোজের ‘চম্পূরামায়ণ’, ঈশ্বরচন্দ্রের ‘সীতার বনবাস’, রবীন্দ্রনাথের বাল্মীকির প্রতিভা’, রামশঙ্করের রামায়ণ’, দ্বিজলক্ষ্মণের ‘শিবরামের যুদ্ধ’, মাইকেল মধূসূদনের ‘মেঘনাদবধকাব্য’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলি রামায়ণের অংশ নিয়েই রচিত হয়েছে এবং ভারতীয় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। উল্লেখ্য, এঁরা কেউই বাল্মীকির রামায়ণকে অবিকৃত রাখেননি। বাংলায় কৃত্তিবাস বেশ জনপ্রিয়। কৃত্তিবাসের রামায়ণের সমাদর আকাশছোঁয়া। কৃত্তিবাসের পরবর্তীকালে আরও কয়েকজন স্বল্পখ্যাত কবি রামায়ণ রচনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই চিরতরে হারিয়ে গেছেন সংরক্ষণের অভাবে। কেউ-বা পড়ে আছেন আমাদের অন্যমনস্কতা ও উদাসীনতার আড়ালে। কেউ আবার খ্যাতিমান কবির সঙ্গে মিশে গেছে; ফলে আমরা যে কবির নাম কখনোই শুনিনি, হয়তো তাঁর পদগুলি পড়ে চলেছি। যেমন কৃত্তিবাসের নামে এমন অনেক পদ চলে আসছে, সেগুলি তিনি কোনোদিনই রচনা করেননি। ক-জন চেনেন শঙ্কর কবিচন্দ্রকে? ক জন পড়েছেন ‘বিষ্ণুপুরী রামায়ণ’? ‘বিষ্ণুপুরী রামায়ণ’ শঙ্কর কবিচন্দ্রের রচিত শেষতম বাংলা ভাষায় মহাকাব্য। তাঁর যা কিছু কৃতিত্ব, যা কিছু গৌরব–সবই অধুনা প্রচলিত কৃত্তিবাসী রামায়ণের সঙ্গে মিশে গেছে।
