এক ভারত, কিন্তু বহু সংস্কৃতি। বহু সংস্কৃতি, বিচিত্র তার কল্পনা শাখাপ্রশাখায়। ৩০০টি ভিন্ন রামায়ণের সন্ধান পাওয়া যায়–চরিত্রগুলি যথাযথ–রাম, সীতা, রাবণ সবই আছে–বদলে গেছে ঘটনাপঞ্জি, বদলে গেছে সম্পর্ক, বদলে গেছে কার্য-কারণ, বদলে গেছে পরিণতিও। একই রামের গল্প বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ ফিরে ফিরে লিখেছে–ভিন্ন ভিন্ন অর্থে, ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্যে। মূল রামায়ণ লিখিত হয়েছিল ২৪,০০০ শ্লোকে। ছিল ৫০০ সর্গ এবং ছয়টি কাণ্ড–“চতুর্বিংশৎ সহস্রাণি শ্লোকানামুক্তবান্ ঋষিঃ।/তথা সৰ্গৰ্শতা পঞ্চ ষটকাণ্ডানি তথোত্তর”। পরে উত্তরকাণ্ড যুক্ত হয়েছে। বাল্মীকির আগেও রামকথা ছিল, বাল্মীকির পরেও রামকথা আছে এবং থাকবে–ভিন্ন রূপে, ভিন্ন বোধে৷ এইভাবেই রামায়ণ বিপুলায়তন এক মহাসাহিত্যের পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে অজস্র গল্প-উপগল্প, কথা-উপকথা, ইতিহাস-অনৈতিহাস। তাই রামায়ণে রাম নিশ্চয়ই আছেন, কিন্তু রামায়ণের রাম সর্বত্র একইভাবে চিত্রিত হয়নি। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদরা একমত যে, বাল্মীকি রচিত রামায়ণের রাম আসলে এক আদর্শ ক্ষত্রিয় রাজার বা একজন আদর্শ মানুষের চরিত্রায়ণ। রামায়ণের জনপ্রিয়তা কোনো ধর্মগ্রন্থ হিসাবে নয়, বরং এক সুকথিত কাহিনি হিসাবে দেখা যায়। অবশ্য একথা অস্বীকার করা যায় না যে, পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ লেখকদের দ্বারা তা কিছুটা ধর্মগ্রন্থের রূপ নেয়। এখন হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতায়নের অলিন্দ ঢুকে পড়তে রামকেই ঢাল বানিয়েছে। বাংলা, তামিল, তেলেগু, মালয়ালম ভাষায় রামায়ণকে ভুলে গেলে চলবে না–কারণ এখানেই রামকে একজন আদর্শ মানুষমাত্র। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে কোথাও রামের উপাসনা করতে হবে এমন আদেশ নেই। তবে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে রামনন্দিনের কথা জানা যায়, যাঁরা রামভজনাকে মুক্তির পথ হিসাবে বর্ণনা করেছে।
বস্তুত ইতিহাসের দৃষ্টির দিক থেকে দেখলে রামায়ণের যুগ বলে কিছু হয় না। এমনকি কোনো সময়কেও চিহ্নিত করা যায় না। কারণ এই সাহিত্য বিশেষ কোনো সময়ে লিখিত হয়নি। দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছর ব্যাপী এই মহাসাহিত্য গড়ে উঠেছে। নির্মাণ যখনই শুরু হোক, যখনই শেষ হোক না-কেন বেশ কয়েক শতাব্দী জুড়ে বিবর্তন চলেছিল, একই সময়কালে। সংস্কৃত ভাষায় রামায়ণ কেবল বাল্মীকিই লেখেননি, আছে আরও কিছু সংস্কৃতে লিখিত রামায়ণ। যেমন–আধ্যাত্ম রামায়ণ, আনন্দ রামায়ণ, যোগবাশিষ্ট রামায়ণ, ভুশণ্ডি রামায়ণ ইত্যাদি। আছে একে অপরের সঙ্গে বিস্তর পাঠভেদ। কথকও এক নয়। যেমন–বাল্মীকির রামায়ণের মূল কথক নারদ, অপরদিকে ‘আধ্যাত্ম রামায়ণ’-এর মূল কথক শিব। ভুশণ্ডি রামায়ণ’-এর কথকও নারদ। আনন্দ রামায়ণ’ কিন্তু সাতকাণ্ডে নয়, নয় কাণ্ডে। মিল-অমিল যাই হোক–সব রামায়ণেই কাহিনিবিন্যাস, পরিকাঠামো মায় লোকগাথা একদম ভিন্ন। বাঙালিদের কৃত্তিবাসের শ্রীরাম পাঁচালী’-র রামচন্দ্র নয়নাভিরাম, অসামান্য রূপবান, অলৌকিক শক্তিতে ভরপুর, অপরিসীম করুণা আর ভক্তকুলের মনোবাঞ্ছাপূরণে উদার। বাল্মীকির রামায়ণের রামচন্দ্র মহাশক্তিধর, তাঁর বজ্রকঠিন দু-হাত এবং শত্ৰুসংহারে নির্মম। থাইল্যান্ডের রামায়ণ আর কৃত্তিবাসী রামায়ণ এক নয়, ইন্দোনেশিয়ার রামায়ণী নাচগানের সঙ্গে তুলসীদাসের রামায়ণে বিস্তর ফারাক। আমরা ‘চন্দ্রাবতী রামায়ণ’ নামেও একটি রামায়ণ পাই। বেশ কিছুদিন আগে বইটির পিডিএফ কপি আমার হাতে এল। এই রামায়ণ নারীদের জন্য রচনা করেছেন এক নারী। সেই নারী চন্দ্রাবতী একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর রামায়ণে পুরুষকারকে দমন করেছেন কঠোর লেখনীতে। বর্ণিত হয়েছে সীতার কথা, সীতার জীবনকথা। বড়োই দরদে লিখিত হয়েছে নারী ও নারীত্বের অবমাননার কথা।
সুকুমার সেনের ‘রামায়ণী কথা’ গ্রন্থে অনেক রামায়ণের উল্লেখ পাওয়া যায়। গবেষক ক্যামিল বাল্ক ১৯৫০ সালে ৩০০টি রামায়ণ খুঁজে পেয়েছিলেন। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ও প্রাবন্ধিক এ কে রামানুজম তাঁর লেখা ‘Three Hundred Ramayanas : Five Examples and Three Thoughts on Translation’ 21203 vooft রামায়ণের কথা বলেছেন। অসমিয়া ভাষায় মাধব-কণ্ডলীর রামায়ণ’, কম্বন লিখিত তামিল রামায়ণ ‘ইরামবাতায়ম’, তুলসীদাস লিখিত হিন্দি ভাষায় ‘রামচরিতমানস’, ভানুভক্ত লিখিত নেপালি ভাষায় ‘নেপালি রামায়ণ’, কন্নড় ভাষায় তোরবেয় রামায়ণ ইত্যাদি রামায়ণ বহুল প্রচলিত। কৃত্তিবাস ওঝা ছাড়াও বাংলা ভাষায় আর-একজন বিস্মৃতপ্রায় কবি রামায়ণ লিখেছিলেন। তাঁর নাম শঙ্কর কবিচন্দ্র। ছয়টি কাণ্ডে রচিত তাঁর রামায়ণের নাম “বিষ্ণুপুরী রামায়ণ”, এই রামায়ণে উত্তরকাণ্ড অনুপস্থিত।
এছাড়াও প্রচুর ভিন্ন ভিন্ন গল্প পাওয়া যায় বিভিন্ন রামায়ণে। আবার বৌদ্ধদের রামের কাহিনি দশরথ-জাতক এ রাম ও সীতা একে-অপরের ভাইবোন (এই রামকথায় কোনো মুনিঋষি নেই, দণ্ডকারণ্য নেই, বানরগোষ্ঠী নেই, রাবণ নেই, সীতাহরণও নেই)। দশরথ রাজার প্রথমার স্ত্রী কৌশল্যার দুটি পুত্র ও একটি কন্যার জন্ম দিয়ে মারা যান। এঁরাই হলেন যথাক্রমে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা। কৃষিনির্ভর মাতৃতান্ত্রিক সমাজে ভাইবোনের বিয়ে স্বাভাবিকই ছিল। বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। দশরথ-জাতকে রাম রামপণ্ডিত’ বলে পরিচিত। দশরথ-জাতকে রামের পিতৃসত্য পালনের কোনো ব্যাপার নেই। এখানে রাজা দশরথ বলেছেন, মৃত্যু হলেই তোমরা এসে সিংহাসন দখল করবে। বাল্মীকির রামায়ণে ভরত রামের পাদুকা চেয়ে নিয়েছিলেন সিংহাসনে রেখে অযোধ্যা শাসন করার জন্যে। দশরথ জাতকে ভরত কোনোরূপ পাদুকাই চাননি। বাল্মীকির রামকাহিনি অযোধ্যা হলেও, দশরথ-জাতকের রামকাহিনি বারাণসীর। দশরথ-জাতকের শেষ অংশে বুদ্ধ বলছেন–“সেই সময়ে মহারাজ শুদ্ধোদন ছিলেন দশরথ, কৌশল্যা ছিলেন মহামায়া, রাহুলজননী ছিলেন সীতা, ভরত ছিলেন আনন্দ, সারিপুত্ত ছিলেন লক্ষ্মণ এবং রামপণ্ডিত ছিলাম আমি।” এখানে বোঝাই যাচ্ছে এসব কাহিনি অবতারবাদের প্রভাব। দশাবতার বিষ্ণুর নবম অবতার সিদ্ধার্থ গৌতম বা বুদ্ধদেব। কৃত্তিবাস, রঙ্গনাথন, তুলসীদাসদের মতো দশরথজাতকের রচয়িতাও বাল্মীকির রামায়ণের চরম বিকৃতি ঘটিয়েছেন। নাকি বাল্মীকি দশরথ-জাতকের চরম বিকৃতি ঘটিয়েছেন। কারণ অনেক পণ্ডিত মনে করেন বাল্মীকির রামায়ণের অনেক আগেই দশরথ-জাতক রচিত হয়েছে।
