রামায়ণে বিভক্ত উত্তরকাণ্ডের ৯৪ সর্গে রামপুত্র লবকুশ রামায়ণগান মাঝপথে থামিয়ে অকস্মাৎ বললেন–“ভগবান বাল্মীকি এই কাব্যের রচয়িতা। ইহার শ্লোকসংখ্যা চতুর্বিংশৎ সহস্র এবং উপাখ্যান একশত। ইহাতে আদি হইতে পাঁচশত সর্গ ছয় কাণ্ড এবং উত্তরকাণ্ড নিবদ্ধ আছে।” এ তো দেখছি ঠাকুরঘরে কে, আমি কলা খাইনি। আগ বাড়িয়ে সাফাই।
কী আছে রামায়ণে? বাঙালি পাঠক-শ্রোতা-ভক্তরা যে রামায়ণ আর রামচন্দ্রকে জানেন, তার একটা রূপরেখা এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক–
(১) বালকাণ্ড বা আদিকাণ্ড : এই অধ্যায়ে ৭৭টি সর্গ আছে। আছে রামায়ণ রচনার সূচনা ইক্ষ্বাকু বংশের অযোধ্যারাজ দশরথ দেবতার বরে রাম, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন নামে চার জন্ম হয়। একদিন বিশ্বামিত্র ঋষি এসে যজ্ঞবিঘ্নকারী রাক্ষসদের বধ করার জন্য রাম-লক্ষ্মণকে নিয়ে গেলেন। তাড়কা বধের পর জনকের রাজসভায় হরধনু ভঙ্গ এবং রাম সহ লক্ষ্মণ, ভরত, শত্ৰুগ্ন সকল ভাইয়ের বিয়ে হয় ইত্যাদি।
(২) অযযাদ্ধাকাণ্ড বা অযোধ্যাকাণ্ড : এই অধ্যায়ে ১১৯টি সর্গ আছে। রামের অভিষেকের আয়োজন। দশরথের দ্বিতীয়া পত্নী কৈকেয়ী প্রার্থিত দুটি বরে রামের চোদ্দো বছর বনবাস ও ভরতের রাজ্যাভিষেক। পিতৃসত্য পালনের জন্য রামচন্দ্র স্ত্রী সীতা ও ভাই লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে বনে গেলেন। পুত্রবিরহে দশরথের মৃত্যু, চিত্রকূটে রামকে ফিরিয়ে আনার জন্য ভরতের অনুরোধ। অবশেষে রামচন্দ্রের পাদুকা নিয়ে ভরতের রাজ্যশাসন ইত্যাদি।
(৩) অরণ্যকাণ্ড : এই অধ্যায়েও ৭৫টি সর্গ। এই অংশে আছে দণ্ডকারণ্যে রামের হাজার হাজার রাক্ষস হত্যা, লক্ষ্মণ কর্তৃক রাবণের বোন শূর্পনখার নাক-কান কেটে দেওয়া এবং সেই প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে রাবণ কর্তৃক সীতাহরণ। সীতাকে কুটিরে না-পেরে রাম ও লক্ষ্মণের শোকবিহ্বলতা। এরপর সীতার খোঁজ করতে করতে গভীর অরণ্যে প্রবেশ এবং সেখানে দশরথের বন্ধু রাবণের সীতাহরণ বৃত্তান্ত শোনা ইত্যাদি।
(৪) কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড : এই অধ্যায়ে ৬৭টি সর্গ। এই অংশে বালীকে হত্যা করে সুগ্রীবের সঙ্গে রামের সঙ্গে শর্তসাপেক্ষে বন্ধুত্ব এবং সুগ্রীব রাজা হয়ে হনুমানকে সীতার খোঁজে আদেশ দেন। সেই আদেশ অনুযায়ী হনুমানও সীতার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন।
(৫) সুন্দরকাণ্ড : এই অধ্যায়ে ৬৮টি সর্গ। এই অংশে হনুমান সমুদ্র পার হয়ে লঙ্কায় অশোকবনে সীতার দেখা পান এবং স্মারকচিহ্নস্বরূপ রামের দেওয়া আংটি দেখালেন। হনুমান সীতাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য রাবণকে অনুরোধ করলেন এবং রামের বীরত্বকাহিনি শুনিয়ে উপদেশও দিলেন। রাবণ হনুমানের উপদেশ ও অনুরোধ সপাটে প্রত্যাখ্যান করেন। এই অংশে লঙ্কার সৌন্দর্যের বর্ণনাও আছে।
(৬) যুদ্ধকাণ্ড বা লঙ্কাকাণ্ড : ১৩০টি সর্গ। এই অংশে রাম সুগ্রীবের সেনাদের সাহায্যে সমুদ্রসেতু করে লঙ্কায় পৌঁছলেন। ত্রিকুট পর্বতে অবস্থিত লঙ্কায় পৌঁছোনোর পর রাবণের আপন ভাই বিভীষণের সঙ্গে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব হয়। বিভীষণের অকুণ্ঠ সহযোগিতায় রামের সঙ্গে যুদ্ধে রাবণ সবংশে মারা যান। এই কাণ্ডে রাম-সীতা। সুখেই বসবাস করতে থাকলেন। আর বলা হয়েছে, রামগান শ্রবণে কী ফল লাভ হবে তার বিস্তারিত বর্ণনা।
(৭) উত্তরকাণ্ড : ১২৫টি সর্গ। এই কাণ্ডটি পরবর্তী অন্য কোনো কবির সংযোজন বলে অনেক পণ্ডিতগণ মনে করেন। এই অংশের প্রথমদিকে প্রাচীন গল্পকাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। ষষ্ঠকাণ্ড পর্যন্ত তো রাম-সীতার দাম্পত্যজীবন সুখেই কাটছিল। উত্তরকাণ্ডে এসে অকস্মাৎ বিনামেঘে প্রায় বজ্রপাত। সীতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলল প্রজারা, অপবাদের গুঞ্জন উঠতে থাকল। এহেন অপবাদ থেকে রেহাই পেতে রামের আদেশে লক্ষ্মণ আশ্রম-দর্শনের ছলনায় সীতাকে বাল্মীকির আশ্রমে দিয়ে এলেন। আশ্রমে থাকাকালীন সীতা দুটি যমজ সন্তানের জন্ম দিলেন–লব ও কুশ। অপরদিকে রাম সোনার সীতা নির্মাণ করে অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু করেন। রক্তমাংসের মাকে বাদ দিয়ে সোনার তৈরি মাকে দিয়ে যজ্ঞের আয়োজন-বার্তা লব-কুশের কাছে পৌঁছে যায়। লব-কুশ যজ্ঞস্থলে এসে রামগান শুরু করে। পরে সীতা অযোধ্যায় ফিরলে তাঁকে আগুনে প্রবেশ করিয়ে তাঁর সতীত্বের প্রমাণ নেওয়া হয়। কিন্তু সীতা অপমানিত হন এবং তাঁর মা বসুন্ধরাকে স্মরণ করলে পাতালপ্রবেশ হয়। লব ও কুশ অযোধ্যার সিংহাসনে বসেন। রাম সরযূর জলে প্রাণত্যাগ করেন। সংকসেংক্ষেপে এই কাণ্ডে পাওয়া যাবে–রামজন্মের পূর্বকাহিনি, রাক্ষস ও বানরদের বিবরণ, বেদবতী ইত্যাদির কথা এবং পূর্বকালের কিছু দেবাসুর যুদ্ধের বিচ্ছিন্ন কাহিনি আছে। আছে রাম কর্তৃক ভাইদের বিভিন্ন রাজ্যজয়ে প্রেরণ এবং ভ্রাতুস্পুত্রদের মধ্যে সেইসব বিজিত রাজ্য ভাগ করে দেওয়া–ইত্যাকার ইতিহাস। এই হল সংক্ষিপ্ত রামায়ণ।
জয়ন্তানুজ বন্দোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে তাঁর মহাকাব্য ও মৌলবাদ’ বইয়ে বলেন : “আদি বাল্মীকি রামায়ণে বালকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ড ছিল না। আর পরবর্তীকালে সংযোজিত এই দুই কাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রক্ষিপ্ত কথা বাদ দিলে আদি বাল্মীকি রামায়ণে রামের অবতারত্বের বিশেষ চিহ্ন পাওয়া যায় না। মহাকাব্য হিসাবেও রামায়ণের সাহিত্যগুণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তুলসী রামায়ণে বিষ্ণুকে শ্রেষ্ঠ দেবতা রামকে বিষ্ণুর অবতার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। যা এমনকি বালকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ড সহ পল্লবিত বাল্মীকি রামায়ণেরও প্রধান বিষয়বস্তু নয়। “
