আঘোরি নামে উত্তর ভারতের একটি ক্ষুদ্র উপজাতিরা মানুষের মাংস খায়। মাংস খায় তাঁদের ধর্মীয় উপাসনার অংশ হিসাবে ও অমরত্ব অর্জনের জন্য। তাঁরা মনে করে এভাবে অতিপ্রাকৃতিক শক্তিও লাভ করবে। তারপর তাঁরা সেই মানুষের মাথার খুলিতে রেখে অন্য খাবার খায়। বয়স বেড়ে যাওয়া রোধ করতে ও ধর্মীয় পূণ্য অর্জন করতেই মানুষের মাথার খুলিতে খাবার রেখে খায়। ভারতের বারাণসীতে এখনও একটি সম্প্রদায়ের। মধ্যে মানুষ খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। আঘোরি সাধু নামে বিশেষ এক সন্ন্যাসী সম্প্রদায় আছে, যাঁরা মৃত মানুষের মাংস খেয়ে থাকে। যদিও প্রচলিত আছে এই সম্প্রদায় বিশেষ মার্গ সাধনার পদ্ধতি হিসাবে মানুষের মাংস খেয়ে থাকে।
২০১১ সালে পাপুয়া নিউগিনি পুলিশ ২৯ জন মানুষ খেকো আটক করে, যাঁরা ৭ জন ডাক্তার হত্যা ও ভক্ষণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল। তাঁরা আদালতে স্বীকার করে যে, এই হত্যার জন্য তাঁরা কোনোভাবে অনুতপ্ত নয়। কারণ এই ডাক্তাররা কালোজাদু করত। গ্রামবাসীদের কাছ থেকে খাবার ও মেয়েদের ছিনিয়ে নিয়ে যেত। আর তাঁরা বিশ্বাস করত কুমারী মেয়েদের কালোবিদ্যা উপাসনায় কাজে লাগালে ভয়ংকর বিপদ নেমে আসে। তাই তাঁরা সেই ডাক্তারদের হত্যা করে তাঁদের মগজ ভক্ষণ করেছে ও পুরুষদের লিঙ্গের স্যুপ করে খেয়েছে। তাঁরা বিশ্বাস করে এই কারণেই ডাক্তারদের সেই কালোবিদ্যা তাঁদের মাঝেও চলে এসেছে এবং এমন এক আধ্যাত্মিক ক্ষমতার লাভ করেছে যে, তাঁদেরকে আর কোনো রোগ স্পর্শ করতে পারবে না। এমনকি এদের মধ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিজ সন্তান হত্যা করে খাওয়ার ঘটনাও আছে।
ফিজির সিগাটোকা অঞ্চলে একসময় মানুষখেকোরা থাকলেও এখন তাঁদের দেখা পাওয়া যায় না। সিগাটোকার নাইহেহে গুহায় যেসব নিদর্শন মিলেছে, তাতে স্পষ্টই বোঝা যায় যে মানুষখেকোরা আসলে মিলিয়ে যায়নি। আফ্রিকার মধ্যাঞ্চলীয় দেশটির আদিবাসীদের মাঝে এখনও মানুষ খাওয়ার প্রবণতা কমেনি। প্রকাশ্যে না-হলেও গোপনে মানুষের মাংস খাওয়ার অভ্যাস আছে তাঁদের। ২০০৩ সালের গোড়ার দিকে কঙ্গোর বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মানুষ খাওয়ার অভিযোগ তোলে খোদ জাতিসংঘ। দ্বিতীয় কঙ্গো যুদ্ধের পর সরকারের এক প্রতিনিধি তাদের কর্মীদের জীবন্ত ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পর্যন্ত তোলেন। জার্মানিতে মানুষের মাংস খাওয়া কোনো অপরাধ নয়। আর সেজন্যই ২০০১ সালের মার্চে আৰ্মিন মাইভাস নামের এক জার্মান নাগরিক রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষ খেলেও তাঁর বিরুদ্ধে খুনের মামলা ছাড়া কোনো অভিযোগ আনেনি পুলিশ। মানুষ খাওয়ার উদ্দেশে “The Cannibal Cafe’ নামের একটি ওয়েবসাইটে সুঠামদেহী, জবাইযোগ্য এবং আহার হতে চাওয়া মানুষের সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞাপন দেন আর্মিন। অনেকে আগ্রহী হলেও বার্ল্ড জুর্গেন ব্রান্ডিসকে পছন্দ করেন আর্মিন। এরপর জার্মানির ছোট্ট গ্রাম রটেনবার্গে দুজনে মিলিত হন। এক পর্যায়ে ব্রান্ডিসকে হত্যা করে প্রায় ১০ মাস টানা তাঁর মাংস খান আর্মিন মাইভাস। ২০০২ সালে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বিচারে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমের ক্রাসনোদার শহরে এক মানুষখেকো। দম্পতি প্রায় ৩০ জনকে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করেছে। ৩৫ বছর বয়সি দিমিত্রি বাকশেভ এবং তাঁর স্ত্রী নাতালিয়া যে জায়গায় বসবাস করেন, সেই সামরিক ঘাঁটিতে কাঁটা-ছেঁড়া ও অঙ্গহীন একটি লাশ পাওয়া গেলে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। রাশিয়ার গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁদের বাড়ির ভিতরে ও মোবাইল ফোনে পাওয়া ছবিগুলো দেখে মনে হচ্ছে এসব হত্যাকাণ্ড প্রায় বিশ বছর আগের। এঁদের মধ্যে একটি ছবি ১৯৯৯ সালের ২৮ শে ডিসেম্বর মাসে তোলা। যেখানে দেখা যাচ্ছে, একটি বড়ো থালায় বিভিন্ন রকমের ফলের সঙ্গে মানুষের একটি রক্তাক্ত কাটা মাথা পরিবেশন করা হয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিল দৈনিক বাংলার একটি বক্স নিউজের ছবিতে দেখা যায় এক যুবক মরা একটি লাশের চেরা বুক থেকে কলিজা খাচ্ছে। সে মরা মানুষের কলজে মাংস খায়!’ জানা যায়, প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর সে মানুষের কলিজা খেত। উত্তর ২৪ পরগনার নিউ ব্যারাকপুরে কেদার নামে এক খুনির কথা জানা যায় তাঁর অনুগামীদের কাছ থেকে। এই কেদার ছিল খুবই নৃশংস ব্যক্তি। বিনা প্ররোচনাতেই যখন-তখন যে কারোকেই খুন করে দিত। খুন করার পর সেই মৃতদেহের বুক চিরে পাকস্থলি, যকৃত, ফুসফুস, হৃদপিণ্ড বাইরে বের করে এনে কাঁচাই খেতে নিত। পরে এক এনকাউন্টারে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়।
উগান্ডার স্বৈরাচারী রাষ্ট্রনায়ক ইদি আমিনও নাকি নরখাদক ছিলেন। তবে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর নরখাদকের খেতাবটি ফিজির সর্দার রাতু উদ্রের দখলে। প্রত্যেকটি মানুষকে খাওয়ার পর সর্দার রাতু উদ্রে তাঁর শিকারের স্মৃতিতে একটি করে পাথর সাজিয়ে রাখত। তারপর খেয়ালখুশি মতো গুনতে বসত। গুনতে বসত কারণ এ পর্যন্ত তিনি কটা মানুষ খেল সেই হিসাব রাখতে। সে চাইত তাত্র মৃত্যুর পর তাঁকে যেন এই পাথরগুলির পাশে কবর দেওয়া হয়। হয়েছিলও তাই। মৃত্যুর পর উদ্রেকে উত্তর ভিটিলেসুর রাকিরাকি এলাকায় সেই পাথরের স্কুপের মধ্যে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। ১৮৪০ সালে মিশনারি রিচার্ড লিথ আসেন ফিজিতে। উদ্রের ছেলে ছিল রাভাতু। সে তাঁর বাবার মতো নরখাদক ছিল না। লিথ সাহেবের কাছে স্বীকার করেছিল তাঁর বাবা সর্দার রাতু উদ্রে সত্যিই নরখাদক ছিল। উদ্রের পেটে যাওয়া সমস্ত হতভাগ্যই ছিল, ফিজির আদিবাসী গোষ্ঠী সংঘর্ষে হেরে যাওয়া যুদ্ধবন্দি। এছাড়া উদ্রের দলে থাকা রাকিরাকির অনান্য আদিবাসী সর্দাররা তাঁদের জীবিত বন্দি ও মৃত শত্রুর দেহ উদ্রের হাতে তুলে দিত। মৃতদেহগুলির সত্যকারের জন্য নয়, স্রেফ খাওয়ার জন্য। লিথকে উদ্রের ছেলে রাভাতু বলেছিল, তাঁর বাবা মানুষের মাংস ছাড়া আর কিছু খেত না এবং তাঁর নরখাদক বাবা হতভাগ্য মানুষদের পুরো শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গই আগুনে ঝলসে খেত। একেবারে একটা দেহের সব মাংস খেতে না পারলে অর্ধভুক্ত দেহটি একটা বাক্সে তুলে রাখত। কিন্তু পরে পুরোটা খেয়ে নিত। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর লরেন্স গোল্ডম্যান নরখাদক মানুষদের নিয়ে লিখেছিলেন একটি বই। সেই বইটিতে উদ্রে সম্পর্কে বিশদে লিখেছিলেন গোল্ডম্যান। “The Anthropology of Cannibalism’ নামক বইটির শেষ লাইনে লিখেছেন একটি গা শিউরে ওঠা ভয়ংকর মন্তব্য–“নরখাদক মানুষগুলোকে আমরা সবাই ভয় পাই। কিন্তু আমি একই সঙ্গে তাঁদের প্রশংসা করব। কারণ ওঁরা শক্তির প্রতীক। নিজেদের বীরত্ব ওঁরা এভাবেই প্রমাণ করতে চেয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে।” নরখাদকদের প্রশংসা করা নিয়ে ঝড় উঠেছিল পৃথিবীতে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড’ পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংসতম নরখাদক মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে উদ্রেকে। পিটার ব্রায়ান নামের একজন ব্রিটিশকে ইস্ট লন্ডনে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার করা হয়, যিনি তাঁর বন্ধুকে খুন করেন ও খেয়ে ফেলেন।
যাঁরা রামায়ণেও আছেন, মহাভারতেও আছেন
বেশকিছু চরিত্রকে আমরা রামায়ণ ও মহাভারত উভয় মহাকাব্যেই পাই। যেমন–(১) রামায়ণে জাম্ববান ভাল্লুক সেনা। রামের সেনার এক অন্যতম সদস্য। সীতার খোঁজ নিতে যখন হনুমানকে পাঠানোর কথা হয় তখন কোনও এক অভিশাপের জেরে নিজের শক্তি সম্পর্কে ভুলে গিয়েছিলেন হনুমান। তখন জাম্ববানই হনুমানকে তাঁর পরিচয় ও শক্তি সম্পর্কে অবহিত করেন। মহাভারতে কৃষ্ণর আসল পরিচয় না-জেনেই তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করেন জাম্ববান। যখন কৃষ্ণ নিজের পরিচয় প্রকাশ করে বলেন রাম ও তিনি একই, তখন লজ্জায় মাথা নিচু করে ক্ষমা চান জাম্ববান এবং নিজের মেয়ে জামবতীর সঙ্গে কৃষ্ণর বিবাহ দেন। (২) রামায়ণে হনুমানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ভগবান রামের একনিষ্ঠ ভক্ত হনুমান। রাবণের স্বর্ণলঙ্কা জ্বালিয়ে দেওয়া থেকে সীতা উদ্ধারে হনুমান ছিলেন খুবই প্রাসঙ্গিক। মহাভারতে সুগন্ধিকা পুষ্প আনার সময় পথে এক বৃদ্ধ হনুমানকে দেখেন ভীম। ভীম দেখে ওই বৃদ্ধ হনুমানের লেজে রাস্তা আটকে রয়েছে। ভীম ওই বৃদ্ধ হনুমানকে লেজ সরানোর অনুরোধ করেন। হনুমান বলেন, তিনি বৃদ্ধ, নিজের লেজ নাড়ানোর ক্ষমতাও তাঁর নেই। তাই ভীমকেই সেই লেজ সরিয়ে দিতে হবে। ভীমের নিজের শক্তির উপর অগাধ বিশ্বাস ও অহংকার ছিল। সেই অহংকার চূর্ণ হয় যখন সে বৃদ্ধ হনুমানের লেজ নড়াতে অপারগ হয়। ভীম বৃদ্ধ হনুমানের আসল পরিচয় জানতে চান। তখন নিজের পরিচয় দেন ভগবান হনুমান। (৩) রামায়ণে সীতার স্বয়ম্বর সভায় রাম মহাদেব শিবের ধনুক ভেঙেছেন এই খবর জানতে পেরে উদ্বিগ্ন পরশুরাম রামকে প্রতিযোগিতার জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু পরে যখন তিনি জানতে পারেন রাম আসলে শিবেরই অবতার, তখন তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করেন, পাশাপাশি রামকে আশীর্বাদও দেন। মহাভারতেও পিতামহ ভীষ্ম ও কর্ণের গুরু হিসাবে পরশুরামের উল্লেখ আছে। (৪) রামায়ণের রাবণের ছোটো ভাই বিভীষণ, যিনি রামের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লঙ্কার পরবর্তী রাজাও হন বিভীষণ। মহাভারতে পাণ্ডবরা যখন রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন, তখন বিভীষণ তাঁদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এবং তাঁদের বহুমূল্য সমস্ত সামগ্রী ও উপহার প্রদান করেন। সভাপর্বে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সময় সহদেব কর গ্রহণের জন্য বিভিন্ন রাজ্যে যান। এই দিগবিজয়কালে তিনি কচ্ছদেশে অবস্থান করে বিভীষণের কাছ থেকে কর আদায়ের জন্য ঘটোৎকচকে দূতরূপে পাঠান। বিভীষণ সহদেবের শাসন মেনে নেন। এবং বহু মূল্যবান সামগ্রী পাঠান। দাক্ষিণাত্য পাঠে আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় বিভীষণকে পাওয়া যায়। (৫) রামায়ণে মায়াসুর রাবণের শ্বশুর। রাবণের স্ত্রী মন্দোদরী আসলে মায়াসুরের কন্যা। মহাভারতে পাণ্ডবরা যখন দণ্ডকারণ্য জ্বালিয়ে দিয়েছিল তখন একমাত্র মায়াসুরই বেঁচে গিয়েছিল। কৃষ্ণ তাঁকে মারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে অর্জুনের কাছে প্রাণভিক্ষা চায়। পরে এই মায়াসুরই ইন্দ্রপ্রস্থ তৈরি করেন। (৬) রামায়ণে মহর্ষি দুর্বাসাই সেই ব্যক্তি যিনি রাম ও সীতার বিচ্ছেদের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। মহাভারতে মহর্ষি দুর্বাসার মন্ত্রেই কুন্তী পাঁচ সন্তানের (পাণ্ডব) মা হয়েছিলেন।
