তবু আছে অনেক কিছু–মহাভারতে রামায়ণ আছে ঠিকই, রামায়ণে মহাভারত নেই। রামায়ণ মহাভারতের চেয়ে জনপ্রিয় বোধহয় এই কারণেই। সেই কারণেই বোধহয় রামায়ণের শত শত ভার্সান, মহাভারতে নেই। শ্রীরামচন্দ্র আর শ্রীকৃষ্ণের জনপ্রিয়তা এবং দেবত্ব প্রায় সমান সমান হলেও রামকে নিয়ে হিন্দুবাদীদের যতটা উন্মাদনা, শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে ততটা নয়। রাম ও হিন্দুত্ব যতটা সমার্থক হয়ে গেছে, কৃষ্ণ ও হিন্দুত্ব ততটা সমার্থক নয়। কৃষ্ণ যেন কেবলমাত্র বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদেরই সম্পদ। রাম জন্মভূমি আর বাবরি মসজিদ যেন এক কলঙ্কিত ইতিহাসের স্রষ্টা, কৃষ্ণকে ঘিরে তেমন কোনো কলঙ্কময় ইতিহাস রচিত হয়নি। অথচ রাম অপেক্ষা কৃষ্ণের জনপ্রিয়তা অনেক গুণ বেশি, সারা বিশ্বেই। কৃষ্ণ সারা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়, রাম নয়।
.১৫. রামায়ণে অস্ত্র এবং শস্ত্র
বশিষ্ঠের ‘ধনুর্বেদসংহিতা’ গ্রন্থের ২০৭ টি শ্লোকে প্রাচীনকালের যুদ্ধ সংক্রান্ত নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে। ‘ধনুর্বেদ’ শব্দটি প্রাথমিকভাবে ধনুর্বিজ্ঞান বোঝালেও ব্যাপক অর্থে সমস্ত আয়ুধবিদ্যাকে বোঝায়। সেখানে বলা হয়েছে, ধনুর্বেদ শিক্ষার ব্যাপারে ব্রাহ্মণই হবেন শিক্ষাগুরু–“ধনুর্বেদগুরুবিঃ “। বশিষ্ঠ বলেছেন–ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যকে এই বিদ্যাকে শিখতে হবে এবং শূদ্র শিকারের জন্য এবং বিপদের সময় রাজ্যরক্ষার্থে শূদ্রও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন। প্রাচীন ভারতে অস্ত্রবিদ্যায়ে উন্নত ছিল তার প্রমাণ এই গ্রন্থ। আধুনিক বিচারে বশিষ্ঠের ‘ধনুর্বেদসংহিতা’ তেমন উন্নতমানের না-হলেও, প্রাচীন ভারতে সমরবিদ্যা জানার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থের গুরুত্বকে ছোটো করে দেখা যায় না। যাই হোক, সংস্কৃত ভাষায় রচিত এরকম বেশকিছু গ্রন্থে অস্ত্রশস্ত্র এবং অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। তবে অস্ত্রশস্ত্র যত-না রাজরাজড়ার কাছে ছিল, তার চেয়ে কয়েকশো গুণ বেশি অস্ত্রশস্ত্র ছিল মুনি-ঋষি-ব্রাহ্মণদের কাছে। এঁদের কাছেই ছিল বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার। রাজরাজড়াদের প্রয়োজন হলে এঁরাই ভয়ানক ভয়ানক সব অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করতেন।
রামায়ণে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড এবং যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নানাবিধ অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। এইসব আয়ুধের নাম যেমন অর্থবহ, কার্যক্ষমতাও তেমনই ভয়ংকর। আয়ুধ বা যুদ্ধাস্ত্রগুলি নিয়ে এবার একটু খোঁজখবর নেওয়া যেতে পারে। অস্ত্র এবং শস্ত্র এক জিনিস নয়, সম্পূর্ণ পৃথক। অস্ত্র হল ঐশ্বরিক ক্ষমতা, দৈবিক শক্তির বলে যা প্রাপ্ত হত, যা কোনও দেবদেবী কৃপায় বরপ্রাপ্ত হত। এইসব হাতিয়ারের ক্ষমতা ছিল অসীম, শুধু বিপক্ষের মানুষজন কেন, গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকেও গুঁড়িয়ে দেওয়া যেত বলে গল্পেসল্প পড়েছি। দেবতাদের কৃপায়’ রামও অনেক অস্ত্রলাভ করেছিলেন। কিন্তু সমস্ত অস্ত্রই যে রাম তপস্যাবলে পেয়েছেন, এমন তথ্য কোথাও পাই না। অস্ত্রের জন্য বা অমরত্বের জন্য রামকে তপস্যা-টপস্যা করতে হয়নি। এমনিই সবাই অস্ত্রশস্ত্র গুছিয়ে দিয়েছেন, যেহেতু রাম ক্ষত্রিয়। প্রভাব যাঁর বেশি, তাবেদারদের সংখ্যাও তাঁদের বেশি। অতএব নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র দান করেছেন মুনিঋষি, দেবদেবতারা। কিন্তু রাক্ষস-খোক্ষস, দৈত্যদানোদের দৈব অস্ত্রশস্ত্র কেউ এমনি এমনি দান করেননি, দিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই সেইসব অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী হয়েছিলেন তাঁরা। যদিও অস্ত্রের প্রয়োজন এবং ব্যবহার রামকেই বেশি করতে হয়েছিল। কারণ সেই বিরাধ রাক্ষস থেকে রাবণ হত্যা পর্যন্ত প্রচুর হত্যা তাঁকে করতে হয়েছে। তা ছাড়া রামের প্রতিপক্ষরা ছিলেন অসমসাহসী, প্রবল শক্তিমান এবং যথার্থ বীর। এই দুই বীরকে পরাস্ত করতে গিয়ে অনেক সময়ই রাম এবং লক্ষ্মণ উভয়ই পরাস্ত ও বিপর্যস্ত হয়েছেন একাধিকবার। রামের এত ভয়ানক অস্ত্রশস্ত্র থাকা সত্ত্বেও বীরত্ব দ্বারা নয়, অবশেষে চালাকির দ্বারা প্রতিপক্ষ পরাস্ত করা সম্ভব হয়েছে। তদুপরি যুদ্ধক্ষেত্রে বহিঃশক্তি তথা আর্যদেবতাদের কৃপা তো রয়েছেই। শক্তি এবং দৈব অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও রামচন্দ্র কিছুতেই রাবণকে কবজা করতে পারেনি, তিনদিন তুমূল যুদ্ধের পরেই রাবণকে হত্যা করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
অস্ত্র কেমন? রামের এরকমই একটা অস্ত্রের ব্যবহারের কথা বলি–একদিন রাম তপোবনে সীতার সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপে ব্যস্ত ছিলেন। কিছুক্ষণ পর রাম নিদ্রামগ্ন হলে সীতা রামের মাথা নিজের কোলে নিয়ে বসে থাকলেন। এক কাক, যা কিনা ছদ্মবেশী রাক্ষস! সীতার মাথা বারবার ঠুকরে দিচ্ছে। সীতার শরীরে আঘাত লাগলেও পাছে রামের ঘুম ভেঙে যায়, সেই কারণে তিনি আঘাত সহ্য করছেন। এরকম দাসী-বউই বোধহয় বেশিরভাগ পুরুষ পছন্দ করেন! যাই হোক, হঠাৎ সীতার মাথা থেকে রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং সেই রক্ত গড়িয়ে পড়ে রামের শরীরে। উষ্ণ রক্তের স্পর্শে রামের ঘুম ভেঙে গেল। রাম একমুঠো দূর্বা ঘাস ছিঁড়ে তাঁকে মন্ত্রপূত করে উপরের কাকটির দিকে ছুঁড়ে দিলেন। কাকটির মৃত্যু হল সেই দূর্বার প্রয়োগে, এটাও অস্ত্র বটে। এই অস্ত্র দেবতার কাছ থেকে বর হিসাবে পেয়েছিলেন, যা কিনা অ্যুৎ এবং অকিঞ্চিৎকর রাক্ষসকে হত্যার উদ্দেশ্যে এই অস্ত্রের প্রয়োগ করতে হল! অবশ্য এ ইতিহস বাল্মীকি লেখেননি।
