রাক্ষস বলতে যদি আমরা নরখাদকদের বুঝি, তাহলে বলাই যায় সেই নরখাদক রাক্ষস আজও আছে পৃথিবীতে। ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আন্দামানের রহস্যঘেরা আদিম দ্বীপ নর্থ সেন্টিনেল। ২৮ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপটিতে বাস করেন নরখাদক আদিম জাতি সেন্টিনেল। সেখানে কেউ গেলে তাঁকে হত্যা করে খেয়ে ফেলে এই সেন্টিনেলরা। কয়েক বছর আগে এক আমেরিকান নাগরিক সেখানে গেলে তাঁকে হত্যা করে সেন্টিনেলরা। এরপর পুলিশ এ ঘঠনায় খুনের মামলা দায়ের করেছে। ওই আমেরিকান নাগরিককে দ্বীপে পৌঁছে দেওয়ার দায়ে সাত জেলেকে গেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে সেই দ্বীপে গিয়ে ঘটনার তদন্ত করার দুঃসাহস দেখায়নি কেউ।
এই অঞ্চলে যাঁরাই গিয়েছেন, হয় সেন্টিনেলদের দেখা পাননি, নয়তো তিরের মুখে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বেঁচেছেন অথবা প্রাণ দিয়ে খাদ্য হয়েছে। ভাগ্যক্রমে যাঁরা তাঁদের দু-একজনকে দেখেছেন তাঁরা বলেছেন, ওদের গলায়-বুকে-পিঠে হাড় আর খুলির গয়না। কঙ্গোর জঙ্গলের কিগ্যানি বা অস্ট্রেলিয়ার বুশম্যানদের মতো সেন্টিনেলরা বিশ্বের বিরলতম উপজাতিগুলোর একটি। এঁরা গত ৬৫ হাজার বছর ধরে এই দ্বীপের বাসিন্দা। আমেরিকান মিশনারি জন অ্যালেন চাও প্রাণ হারানোর পর বিশ্বের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম ওই দ্বীপকেই বলছে ‘বিশ্বের ভয়ংকরতম’। ভয়ংকরতম এই দ্বীপের কুখ্যাতি বহুদিনের। দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত রোমান জ্যোতির্বিদ টলেমি লিখেছিলেন বঙ্গোপসাগরের এই নরখাদকদের দ্বীপ নিয়ে। ১২৯০ সালে মার্কো পোলোও বর্ণনা দেন এমন এক দ্বীপের, যেখানে হিংস্র ও বর্বর আদিবাসীরা বসবাস করেন, যাঁরা তথাকথিত সভ্য মানুষ পেলেই খেয়ে ফেলে।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী তাঁদের জনসংখ্যা ৫০-এর মধ্যে। তবে বহির্বিশ্ব থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। নিজেদের এলাকায় বাইরে কারও প্রবেশ একেবারেই পছন্দ নয় তাঁদের। কোনো মুদ্রা ব্যবহার করে না সেন্টিনেলরা। তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে না সরকারও। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন বা তাদের এলাকায় প্রবেশ বে-আইনি। এমনকি ভিডিও ক্যামেরায় তাদের গতিবিধি রেকর্ড করাও নিষিদ্ধ। গোটা বিশ্ব যখন এঁদের দমন করতে চরমভাবে ব্যর্থ, তখন রামচন্দ্র এঁদের সফলতার সঙ্গে দমন করে ফেলেছিলেন, এটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে, তা নিয়ে ভাবার অবকাশ থেকে যাবে
নরমাংস ভক্ষণ মানে হল মানুষের এমন এক ধরনের আচরণ যেখানে একজন মানুষ আর-একজনের মানুষের মাংস ভক্ষণ করে। তবে এর অর্থ আরও বাড়িয়ে প্রাণীতত্ত্বে বলা হয়েছে, এমন কোনো প্রাণীর এমন কোনো আচরণ, যেখানে সে তাঁর নিজের প্রজাতির মাংস ভক্ষণ করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি তার সহযোগীও হতে পারে। ক্যানিব্যালাইজ শব্দটি ক্যানিবালিজম থেকে এসেছে এর মানে হল সামরিক অংশের পুনোৎপাদন।
ক্যানিবালিজিমের চর্চা হয়েছে লিবিয়া ও কঙ্গোতে বেশ কিছু যুদ্ধে। করোওয়াই হল এমন একটি উপজাতি, যাঁরা এখনও বিশ্বাস করে যে নরমাংস ভক্ষণ সংস্কৃতিরই একটি অংশ। কিছু মিলেনেশিয়ান উপজাতিরা এখনও তাঁদের ধর্মচর্চায় ও যুদ্ধে এই চর্চা করে। এছাড়াও এর একটি বড়ো কারণ হল মানসিক সমস্যা বা সামাজিক আচরণের বিচ্যুতি। নরমাংস ভোজের সামাজিক আচরণে দুই ধরনের নৈতিক পার্থক্য আছে। একটা হচ্ছে একজনকে হত্যা করা ও তাঁর মাংস খাওয়ার জন্য ও আর-একটি হচ্ছে স্বাভাবিকভাবে মৃত মানুষের মাংস খাওয়া।
সপ্তম শতকে আরবে কোরাইশদের যুদ্ধের সময় এ ধরনের ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। ৬২৫ সালে উঁহুদের যুদ্ধের সময় হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব হত্যা হলে তাঁর কলিজা ভক্ষণের চেষ্টা করেন কোরাইশ নেতা আবু। সুফিয়ান ইবনে হার্বের স্ত্রী হিন্দু বিনতে উতবাহ। হাঙ্গেরির মানুষরাও মানুষের মাংস খেত মূর্তিপুজো করার জন্য। পরিব্রাজক ইবনে বতুতা বলেন যে, তাঁকে এক আফ্রিকান রাজা সতর্ক করে বলেছিলেন সেখানে নরখাদক আছে। জেমস ডব্লিউ ডেভিডসন ১৯০৩ সালে তাঁর লেখা বই ‘The Island of Formosa’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, কীভাবে তাইওয়ানের চিনা অভিবাসীরা তাইওয়ানের আদিবাসীদের মাংস খেয়েছিল ও বিক্রি করেছিল। ১৮০৯ সালে নিউজিল্যান্ডের মাওরি উপজাতিরা নর্থল্যান্ডে ‘The Boyd’ নামের একটি জাহাজের প্রায় ৬৬ জন যাত্রী ও ক্রুকে হত্যা করে এবং তাঁদের মাংস খেয়ে নেয়। মাওরিরা যুদ্ধের সময় তাঁদের প্রতিপক্ষের মাংসও খেয়ে ফেলে। অনেক সময়ে সাগরযাত্রীরা ও দুর্যোগে আক্রান্ত অভিযাত্রীরাও টিকে থাকার জন্য অন্য সহযাত্রীদের মাংস খেয়েছে এমন ঘটনা জানা যায়। ১৮১৬ সালে ডুবে যাওয়া ফেঞ্চ জাহাজ মেডুসার বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা টানা চার দিন সাগরে ভেলায় ভেসে থাকার পর মৃত যাত্রীদের মাংস খেয়ে বেঁচে থাকেন। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির প্রায় ১,০০,০০০ যুদ্ধবন্দি সেনাকে রাশিয়ার সাইবেরিয়াতে পাঠানোর সময় তাঁরা ক্যানিবালিজমের আশ্রয় নেন। কারণ একদিকে তাঁদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারের পরিমাণ ছিল খুবই কম, অপরদিকে নানা ধরনের অসুখে আক্রান্ত হয়ে সৈন্যরা মারা পড়ছিল। এঁদের মধ্যে মাত্র ৫,০০০ জন বন্দি স্ট্যালিনগ্রাডে পৌঁছতে সক্ষম হয়। ল্যান্স নায়েক হাতেম আলি নামে একজন ভারতীয় যুদ্ধবন্দি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিউ গিনিতে জাপানি সেনাদের মানুষের মাংস খাওয়ার কথা বলেন। তাঁরা জীবন্ত মানুষের শরীর থেকে মাংস কেটে নিত ও এরপর ওই ব্যক্তিকে খালেবিলে ফেলে মেরে ফেলত। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাপানি সেনারা চিচিজিমাতে পাঁচজন আমেরিকান বিমানসেনাকে হত্যা করে তাঁদের মাংস খেয়ে ফেলেন।
