শ্ৰীযুক্ত যোগীন্দ্রনাথ সমাদ্দার তাঁর প্রাচীন-ভারত’ গ্রন্থে বলেছেন–“অন্য এক জাতীয় ব্যক্তিগণ ভ্রমণশীল এবং ইহারা অসিদ্ধ মাংস ভোজন করে। ইহাদের মধ্যে যখন কোনো ব্যক্তি পীড়িত হয়, তখন পীড়িত ব্যক্তি পুরুষ হইলে তাহার আত্মীয়বর্গ তাহাকে হত্যা করে; কারণ, তাহারা মনে করে যে ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি অনেকদিন পীড়িত থাকিলে উহার মাংস নষ্ট হইয়া যায়। যদি পীড়িত ব্যক্তি নিজের ব্যাধির কথা অস্বীকার করে, তবে তাহার আত্মীয়গণ, তাহার সহিত অমত হইয়া শীঘ্র শীঘ্র তাহাকে শমন-সদনে প্রেরণ করে। স্ত্রীলোক পীড়িতা হইলে, তাহার আত্মীয়গণ, পূর্বোক্তপ্রকারে ঐ স্ত্রীলোককে মৃত্যুমুখে প্রেরণ করিয়া তাহার মাংস ভোজন করে। তাহারা বৃদ্ধগণকেও এই প্রকারে ভক্ষণ করে; কিন্তু এই জাতির মধ্যে কাহাকেও অধিক বয়স্ক হইতে দেখা যায় না। কারণ, সামান্য ব্যাধিগ্রস্ত হইলেই তাহার জ্ঞাতিবর্গ তাহাকে শমন-সদনে প্রেরণ করিয়া, মহানন্দে তাহার মাংস ভক্ষণ করে। এরাই কি তবে রামায়ণ-মহাভারতে বর্ণিত রাক্ষস? এরাই তবে ভারতের আদি ও আদিম বাসিন্দা, প্রাচীন অনার্য জাতি। কোনোকালেই আর্যদের মধ্যে মানুষের মাংস ভক্ষণের কথা শোনা যায় না। ভারতের সীমান্তপ্রদেশের বসবাসকারী বন্যজাতি তথা নর্মদা নদীতীরস্থ প্রদেশে পার্বত্য বনচরগণ মানুষের মাংস ভোজন করত বলে মনে হয়।
নিরঞ্জন সিংহ তাঁর “রামায়ণ-মহাভারতের দেব-গন্ধর্বরা কি ভিনগ্রহবাসী” প্রবন্ধে বলেছেন–আর্যদের চোখে মহেঞ্জোদড়োবাসীরা ছিলেন অনার্য। রামায়ণে এদেরকেই বলা হয়েছে গন্ধর্ব। গন্ধর্ব ও রাক্ষসরা ছিল দুটি গোষ্ঠী। একরম যক্ষরাও ছিল আর-একটি গোষ্ঠী। রামায়ণের প্রক্ষিপ্ত অংশ উত্তরকাণ্ডে বলা হয়েছে–“পুরাকালে ভূমির অপোভাগবর্তী জল সৃষ্টি করিরা তাহাতে সলিল সম্ভব প্রজাপতি জন্মগ্রহণ করেন। পদ্মযোনি–স্বসৃষ্ট প্রাণীপুঞ্জের রক্ষার জন্য কতকগুলি প্রাণীর সৃষ্টি করেন। সেই প্রাণীগণ, ক্ষুধা, পিপাসা এবং ভয়ে প্রপীড়িত হইয়া, আমরা কী করিব? এইরূপ কহিতে কহিতে বিনীতভাবে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার কাছে আসিল। ব্রহ্মা হাসি হাসি মুখে তাহাদিগকে বলিলেন, হে জীবগণ! তোমরা যত্ন সহকারে মানবগণকে রক্ষা করো। তাহাদের মধ্যে কতকগুলি ক্ষুধার্ত জীব রক্ষাম অর্থাৎ রক্ষা করিব এবং কতকগুলি অক্ষুধার্ত জীব রক্ষাম স্থলে যক্ষাম উচ্চারণ করিল। তখন ব্রহ্মা বলিলেন–রক্ষামেতি চ যৈরুক্তং রাক্ষসাস্তে ভবন্তু বঃ।/যক্ষাম ইতি যৈরুক্তং যক্ষা এব ভবন্তু বঃ৷৷ আসলে দেবতা, দানব, রাক্ষস, গন্ধর্ব, নাগ–এরা সবাই একই জায়গার উন্নত সভ্য বিভিন্ন গোষ্ঠী। ভুলে যাবেন না, যক্ষ কুবের ছিলেন রাক্ষস রাবণের বৈমাত্রেয় ভাই। রাক্ষসদের সঙ্গে যক্ষদের বহুবার যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছে।
সে যাই হোক, ভারতে আগমনকারী আর্যরাই ছিল সবথেকে অসভ্য। কারণ আর্যজাতীর অন্যান্য শাখাগুলি যেখানেই গিয়েছে সেখানেই সাম্রাজ্য বা সভ্যতা গড়ে তুললেও একমাত্র ভারতে আগমনকারী আর্যরাই কোনো সভ্যতা বা সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারেনি। পারস্যে আগমনকারী আর্যরা একামেনিড সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, ইতালিতে আগমনকারী আর্যরা গড়ে তোলে রোমান সাম্রাজ্য, গ্রিসে আগমনকারী আর্যরা গড়ে তোলে হেলেনিক সাম্রাজ্য এবং জার্মানিতে আগমনকারী আর্যরা গড়ে তোলে ফার্সট রাইখ (অটো দ্য গ্রেটের)।
ভারতের এই আর্যরা ছিল ধ্বংসকারী শক্তি, এরা ক্রমশ প্রায় সমগ্র উপমহাদেশে আধিপত্য বিস্তার করে। কিন্তু তাঁদের সবথেকে প্রবল বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ৫ টি জনপদ। আর্যরা এগুলি পদানত করতে ব্যর্থ হয়ে শ্লোক রচনা করে–“অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গেযু সৌরাষ্ট্র মগধে চতীর্থ যাত্ৰাং বিনা গচ্ছন পুনঃ সংস্কারঃ হতি শুদ্ধিতরং” (ঐতরেয় আরণ্যক) অর্থাৎ অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সৌরাষ্ট্র ও মগধে তীর্থযাত্রা ভিন্ন গমন করিলে প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে। এসব জনপদে কোনো আর্য ভুলেও পা রাখলে সে ভ্রষ্ট আর্য বা পতিত আর্য বলে গণ্য হতো, এবং এজন্যে তাঁকে ‘পুনোষ্ঠম’ নামে পুজো করে শুদ্ধ হতে হত। এই জনপদগুলির ভিতরের অঙ্গ, বঙ্গ ও মগধ আমাদের বৃহৎ বঙ্গদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর্যরা শ্লোকে উল্লেখিত এই পাঁচটি দেশের অধিবাসীদেরই ‘অসুর’ নামে আখ্যায়িত করত। আর্যরা প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির অধিকারী এসব দেশের অধিবাসীদের সঙ্গে লড়াইতে পেরে না উঠেই এদের অসুর’ বলে চিহ্নিত করে। এই পাঁচটি দেশের দুটি (সৌরাষ্ট্র ও কলিঙ্গ) দেশকে পরাভূত করতে পারলেও বঙ্গদেশের অধিবাসীদের পরাভূত করতে আর্যদের ২,১০০ বছর লেগে যায়! হ্যাঁ, এটাই সত্যি, এদেশের অধিবাসীরা আর্যদের সুদীর্ঘ ২,১০০ বছর ধরে বাঁধা দিয়ে আসছিল। আর আর্যরা ‘রাক্ষস’ বলতে এদেরকেই বোঝাত।
মেগাস্থিনিস তাঁর গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলেছেন–“যে সকল জাতি ককেসাস পর্বতে বাস করে, তারা প্রকাশ্যেই সঙ্গম করেন এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজনদের দেহ ভক্ষণ করেন। সর্বভূক আমিকটারিস জাতি কাঁচা মাংস ভক্ষণ করত। এঁরা স্বল্পজীবী, বৃদ্ধত্ব প্রাপ্ত হওয়ার আগেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এঁদের ওষ্ঠ অধরের নিম্নদেশ পর্যন্ত বিলম্বিত।” এ ইতিহাস, প্রায় ২০০০ বছর আগের। মহাকবি শেক্সপিয়রের সাহিত্যেও একপ্রকার রাক্ষস খোক্ষসদের বর্ণনা পাওয়া যায়।ওথেলোতে এরকম এক ধরনের বর্বর জাতি, নরখাদক (Cannibal) মানুষদের কথা জানা যায়, যাঁদের মাথা ঘাড়ের নীচে।ওথেলো সেইসব গল্প শোনাতেন তাঁর প্রেমিকা ডেসডিমোনাকে। হরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেছেন–“রামায়ণ প্রভৃতি গ্রন্থে যাদের রাক্ষস, বানর, পক্ষী, যক্ষ, কিন্নর, গন্ধর্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃত প্রস্তাবে তারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ। আর্যের সম্প্রদায়ের মানুষদের আর্যরা দাস, বানর, রাক্ষস, পক্ষী ইত্যাদি অবজ্ঞাসূচক নামে অভিহিত করতেন।”
