মহাভারত মহাকাব্যে আমরা অবশ্য হিড়িম্বা সহ কয়েকজন রাক্ষসের সন্ধান পাই। তিনি হিড়িম্বা, হিড়িম্বক বনের রাক্ষস অধিপতি হিড়িম্বর বোন হিড়িম্বা। হিড়িম্বার আরও একটি পরিচয় আছে–ইনি মধ্যম পাণ্ডব ভীমের স্ত্রী এবং ভীমের ঔরসজাত ঘটোৎকচের মা। কাম্যক বনে ভীমকে দেখে হিড়িম্বা নামে এক রাক্ষুসী মোহিত হয়ে গেলেন। মায়া করে সুন্দর এক যুবতী হয়ে ভীমের কাছে এলেন। আসলে এই রাক্ষসরাও মানুষ, বনবাসী। এঁরা বনে-জঙ্গলে থাকত, তাই সেজেগুজে থাকত না। কিন্তু ভীমকে হিড়িম্বা তাঁর প্রেমে ফেলার জন্য যখন সে সুন্দর করে সাজলেন তখন তো তাঁকে সত্যি সত্যি মানুষের মতোই সুন্দরী ছাড়া অন্য কিছু মনে হয়নি ভীমের। এই সেজে আসাটাকেই ব্যাসগণ একটু অলংকরণ করে বলেছেন মায়া করেছেন। আর আকাশে উড়ে যাওয়া বিষয়টিও অতিরঞ্জিত করা। ভীমকে বিয়ে করার পরে তাঁকে নিয়ে নির্জন জায়গার দিকে নিয়ে গেলেন যেখানে কোনো মনুষ্যবাস নেই। এই পথটি হিড়িম্বারই জানা ছিল–ভীমের নয়। রচনাকারী এই নির্জন জায়গার দিকে যাওয়াটাকেই আকাশে উড়ে যাওয়া বলে চালিয়ে দিয়েছেন।
ভারতের ধর্ম-সাহিত্যে একেবারে শুরুর কথা বলা যায়। বেদ সাহিত্যে দাস, অনার্যদের কথা জানতে পারি। রামায়ণ-মহাভারতে রাক্ষসদের কথা জানতে পাই। আবার পুরাণগুলোতে অসুর, দৈত্য-দানোদের কথা জানতে পাই। মনুসংহিতায় শূদ্রদের কথা জানতে পাই। এরা কেউ পৃথক নয়। সবাই একই জাতি। এরা সবাই ভারত উপমহাদেশের ভূমিপূত্র তথা আদি বাসিন্দা। বর্তমানে যে জাতি শূদ্র তথা দলিত তথা পিছড়ে বর্গ তথা মূলনিবাসী বলে পরিচিত। এরাই প্রাচীন যুগের রাক্ষস-খোক্ষস, দৈত্য-দানো-অসুর প্রমুখ। প্রাচীন যুগে এই বিশাল ভারত উপমহাদেশে এশিয়া মাইনর হয়ে বহিরাগত আর্যরা প্রবেশ করে। অন্য কোনো ভূখণ্ডের ভিনদেশি জাতি এসে বিনা রক্তপাতে অন্য কোনো ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে এবং দখল নেবে, সেটা কি সম্ভব? খুব স্বাভাবিকভাবেই ভারত উপমহাদেশের মূলনিবাসী তথা ভূমিপুত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছে বারবার। এই আর্যরা শক্তিতে, বুদ্ধিতে এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে অনেক বেশি এগিয়ে ছিল। ফলে তাঁদের সঙ্গে ভারতের ভূমিপুত্ররা সংঘর্ষে পরাস্ত হয়েছে। সেই সংঘর্ষের কাহিনি লিখেছেন আর্যরাই। আর্যদের সেই অতিরঞ্জিত ইতিহাসই সনাতন ধর্ম তথা হিন্দুধর্মগ্রন্থগুলির মূল বিষয়, যা আসলে আর্যবিজয়ের ইতিহাস। আর বিজয়ীরা বিজিতদের ঘৃণ্য ভাষায় সম্বোধন করবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিদেশি উপনিবেশিকরা যখনই অন্য ভূখণ্ড দখল ও শাসন করত, তখনই ভূমিপুত্র বা মূলনিবাসীদের ঘৃণ্য ভাষায় সম্বাধন করত, অসভ্য বর্বর বলত। ভূমিপুত্রদের অসুর, রাক্ষস, শূদ্র, নিগ্রো এসব বলে নিজেদেরকে কৃষ্টিবান, সংস্কৃতিবান, বুদ্ধিমান, সুশিক্ষিত, সুসভ্য বলে জাহির করত। যেমন আফ্রিকান ভূমিপুত্রদের উপনিবেশিক মাতব্বররা ‘নিগ্রো’ বলে সম্বোধন করত। নিগ্রো একটি অপমানজনক ঘৃণ্য পরিচিত। নিগ্রো আর অসভ্য যেন সমার্থক শব্দ। বর্তমানে কিছু লোকের দ্বারা আপত্তিজনক হিসাবে বিবেচিত’ থেকে ‘সাধারণভাবে অবমাননাকর’ রূপান্তরিত হয়েছে বলে মনে করা হয়। নিগ্রো শব্দ দ্বারা এখন আর আফ্রিকানদের চিহ্নিত করা যায় না। নিগ্রো শব্দে আফ্রিকানরাও প্রতিবাদ করেন। বহু দেশে এখনও সেই আদিম মানুষরা আছেন নিজেদের মতো করে। নারী-পুরুষ উভয়েরই ঊৰ্ধাঙ্গ অনাবৃত। নিন্মাঙ্গ আংশিক অনাবৃত।
এইসব যাঁরা সম্বোধন করত তাঁরা সকলেই সাদা চামড়ার মানুষ। এই সাদা চামড়ার মানুষগুলোই দেবতার মর্যাদা পেতে থাকল। সাদা রংয়ের কারণে কালো মানুষদের সমীহ আদায় করে নিল আর্যরা। এর সঙ্গে আরও একটা জিনিস হল, সাদা চামড়ার প্রতি কালো মানুষদের মোহ জন্মাতে শুরু করল। সাদা মানেই সুন্দর, কালো মানেই কদাকার–এমন ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল উপনিবেশিক ভূখণ্ডগুলিতে। কালো চামড়ার মানুষগুলোও কালো চামড়ার মানুষদের ঘৃণা করা শুরু করল। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলছে।
রাক্ষস বা নরখাদক বলা হয়েছে রাবণকেও। প্রিয় পাঠকবৃন্দের কাছে একটি প্রশ্ন না-রেখে পারছি না। রাবণের দাদা হচ্ছেন পুলস্ত্য, পিতা বিশ্রবা, ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ, বৈমাত্রেয় ভ্রাতা কুবের এবং পুত্র ইন্দ্রজিৎ–এরা সকলেই ছিলেন সভ্য, ভব্য, সুশিক্ষিত, গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তি। এঁরা কেউই রাক্ষস বা কাঁচামাংসভোজী মানুষ ছিলেন না। রাবণও তার শৈশবকালাবধি মাতা-পিতার রান্না করা খাবারই খেয়েছেন নিশ্চয়। অতঃপর যৌবনে হঠাৎ করে একদিন তিনি খেতে শুরু করলেন জীবের কাঁচামাংস। বিমান বিহার, শক্তিশেল নির্মাণ ও অশোক কানন তৈরি করতে জানলেও তিনি রান্নার পাকপাত্র গড়তে বা রান্না করতে জানেননি। বেশ ভালো। কিন্তু তিনি কোথায় বসে, কোনদিন, কাকে খেয়েছেন–তার একটিরও নামোল্লেখ নেই কেন? রাবণ নরমাংস খেতেন না। এটা বানোয়াট।
মহাকবিদ্বয় বীরদের দিয়ে যেসব রাক্ষসদের হত্যা করিয়েছেন তাঁদের কতিপয় রাক্ষসগণ আবার পূর্বজন্মে হয় দেবতা, নয় গন্ধর্ব বীরদের অস্ত্রে খুন হওয়া যে রাক্ষস, সেই রাক্ষসদের পূর্বজন্ম কী ছিল, আদৌ ছিল কি না তা জানাননি। লক্ষণীর, এইসব বীরেরা এমনকি তথাকথিত রাক্ষসরা পর্যন্ত একটি মানুষ হত্যা করেছেন এমন কাহিনি কিন্তু পাওয়া যায় না। মহাভারতের সময় মানুষের কিছু সন্ধান পাওয়া গেলেও রামায়ণের সময় কিন্তু দণ্ডকারণ্য থেকে লঙ্কা পর্যন্ত শুধুই রাক্ষসদের পাচ্ছি। সেই রাক্ষসদের হত্যা করার জন্য রাম-লক্ষ্মণদের আহারনিদ্রা ছুটে গিয়েছে। একটা মানুষের সঙ্গেও রামচন্দ্রের সাক্ষাৎ হয়নি। মানুষ বলতে শুধুই মুনিঋষি তথা ব্রাহ্মণেরা? এঁরাও তো এক-একজন দেবতা বলেই জেনেছি। আচ্ছা, সাধারণ মানুষরা তখন কী করত! ভগবানরা সব সারাজীবন ধরে রাক্ষস-খোক্ষস মেরে বেরালেন কেন! একটাও মানুষ মারেননি। আসলে ভূমিপুত্র মানুষগুলিই রাক্ষস, অসুর ইত্যাদি। রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণের বাইরে রাক্ষসরা সব কোথায় গেল। তবে পরবর্তীতে আমরা রাক্ষস-খোক্ষসদের পাই রূপকথার গল্পগুলিতে। লালকমল আর নীলকমলদের রূপকথায় রাক্ষস-খোক্ষসদের সেই ‘হাউমাউ খাউ মানুষের গন্ধ পাউ’ গোছের।
