গোড়াতে রামায়ণ যে রূপে ছিল, যত দিন গেছে তত বিচিত্র সব নতুন নতুন কাহিনি সংযোজিত হয়েছে। যেটাকে বলা হয় প্রক্ষিপ্ত প্রক্ষিপ্ত হল সেটাই, মূল কবি যা লেখেননি–লিখেছেন অস্বীকৃত অন্য কেউ। এই প্রক্ষিপ্ত অংশগুলির বেশিরভাগ অলৌকিক, অপার্থিব। উদ্দেশ্য প্রণিধানযোগ্য। রামায়ণে পরবর্তী সংযোজিত অংশগুলি অভিপৌরাণিক, অর্থাৎ পুরাণে প্রতিফলিত যে সামাজিক মূল্যবোধ ও শাস্ত্রীয় অনুশাসনের সমাবেশে ভারতীয় ধর্মচিন্তা তার বিবর্তিতরূপে ক্রমে হিন্দুধর্ম’ বলে চিহ্নিত হল। যে মূল্যবোধ জনমানসে প্রোথিত হয়ে আছে, তা হল–একটি মূল কাহিনির, অপরটি সংযোজিত বা প্রক্ষিপ্ত অভিপৌরাণিকেরা।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন–“কিংবদন্তী আছে যে, ইহা বাল্মীকি প্রণীত। বাল্মীকি নামে কোনো গ্রন্থকার ছিল কি না, তদ্বিষয়ে সংশয়। বল্মীকি হইতে বাল্মীকি শব্দের উৎপত্তি দেখা যাইতেছে, অতএব আমার বিবেচনায় কোন বল্মীকমধ্যে এই গ্রন্থখানি পাওয়া গিয়াছিল। ইহাতে কি সিদ্ধান্ত স্থির করা যায় দেখা যাউক। রামায়ণ নামে একখানি বাঙ্গালা গ্রন্থ আমি দেখিয়াছি। ইহা কৃত্তিবাস প্রণীত। উভয় গ্রন্থে অনেক সাদৃশ্য আছে। অতএব ইহাও অসম্ভব নহে যে, বাল্মীকি রামায়ণ কৃত্তিবাসের গ্রন্থ হইতে সংকলিত। বাল্মীকি রামায়ণ কৃত্তিবাস হইতে সংকলিত, কি কৃত্তিবাস বাল্মীকি রামায়ণ হইতে সংকলন করিয়াছেন, তাহা মীমাংসা করা সহজ নহে; ইহা স্বীকার করি। কিন্তু রামায়ণ নামটিই এ বিষয়ের এক প্রমাণ।
বস্তুত সাতটি কাণ্ডে বিভক্ত রামায়ণকে আমরা যে আকারে পাই, সেটাই রামায়ণের মূল রূপ কি না এবং মূল কবির রচনা কি না–এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। আধুনিক পণ্ডিতদের মতে রামায়ণের আদি ও সপ্তম কাণ্ড পুরোপুরি প্রক্ষিপ্ত বা সংযোজিত। যুক্তিগুলি কী, সেগুলি একটু দেখে নেওয়া যাক–(১) আদি ও সপ্তম কাণ্ডে রামচন্দ্র হলেন বিষ্ণুর অবতার। কিন্তু বাকি পাঁচটি কাণ্ডেই দেখা যায়–তিনি একজন আদর্শ, অমিতবিক্রমী মানুষ। (২) আদি ও সপ্তম কাণ্ডের রচনাশৈলী ও ভাষা অপর পাঁচটি কাণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত নিম্নমানের।(৩) বালিদ্বীপে প্রাপ্ত রামায়ণে উত্তরকাণ্ড অনুপস্থিত। (৪) প্রথম কাণ্ডে যেসব কথা বলা হয়েছে, অন্য পাঁচটি কাণ্ডের মধ্যে কোথাও তার উল্লেখ বা সমর্থন তো নেই-ই, উপরন্তু তার বিরোধিতা বা বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়।(৫) প্রথম সূচি অনুসারে উত্তরকাণ্ডে সীতা নির্বাসনরূপ কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই। কিন্তু দ্বিতীয় সূচিতে এই ঘটনার উল্লেখ থাকার মনে হয় উত্তরকাণ্ডের যোজনা পরবর্তীকালে হয় এবং তারপরেই দ্বিতীয় বিষয়সূচিতে সন্নিবেশ ঘটে। (৬) আদি ও উত্তরকাণ্ডে নানা প্রকার অলৌকিক ও অপার্থিব আখ্যান ও উপাখ্যান সংযোজিত হওয়ায় মূল ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় স্খলন হয়েছে। (৭) যুদ্ধকাণ্ডের শেষে রামায়ণ পাঠের ফলের উল্লেখ আছে। এটাই প্রাচীন মূল গ্রন্থের সমাপ্তি বাক্য বলেই মনে হয়। (৮) উত্তরকাণ্ডের বিস্তৃত পরিসরে রাম-সীতার কাহিনি মাত্র এক-তৃতীয়াংশ, অবশিষ্ট অংশ বিভিন্ন বিচিত্র সব আখ্যানে ভরপুর।(৯) আদিকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ডে বাল্মীকিকে রামচন্দ্রের সমকালীন কবিরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু মূল রামায়ণের বাল্মীকি এক পৌরাণিক ব্যক্তিত্ব। (১০) রামায়ণের দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ কাণ্ডগুলির নামকরণ করা হয়েছে বিষয়বস্তু অনুসারে। যেমন–অযোধ্যা কাণ্ড, অরণ্য কাণ্ড ইত্যাদি। কিন্তু প্রথম ও শেষ কাণ্ডের নাম ‘আদি’ ও ‘উত্তর’ কাণ্ড বিষয়বস্তু অনুসারে হয়নি।(১১) প্রথম এবং সপ্তম কাণ্ডে বাল্মীকি নিজেই গ্রন্থটির একটি চরিত্র। কিন্তু পরবর্তী পাঁচটি কাণ্ডে চরিত্র তো ননই, এমনকি কোথাও তাঁর নাম পর্যন্ত উল্লেখ নেই। (১২) বালকাণ্ডের চতুর্থ সর্গের দ্বিতীয় শ্লোকের উক্তি থেকে জানা যায়, ২৪০০০ শ্লোকে রামায়ণ সমাপ্ত হয়েছে। (“সন্নিবদ্ধৎ হি শ্লোকানাং চতুর্বিংশৎ সহস্রক/উপ্যাখ্যানশতঞ্চৈব ভার্গবেন তপস্বিনা।আদিপ্রভৃতি বৈ রাজন্ পঞ্চসৰ্গশতানি চা/কাণ্ডানি ষটকৃতানী সোত্তরাণি মহাত্মনা।) কিন্তু বর্তমানে পাওয়া বিভিন্ন সংস্করণে শ্লোকসংখ্যা অনেক বেশি। (১৩) রামায়ণের ষষ্ঠ কাণ্ডের অন্তর্গত সীতার অগ্নিপরীক্ষা বৃত্তান্তটিও পরবর্তীকালের সংযোজন। মূল গ্রন্থে সীতার অগ্নিপরীক্ষার দৃশ্যটি ছিল না। (১৪) বালকাণ্ডে দেখা যায়, রামচন্দ্রের বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ভাইদের (লক্ষ্মণ, ভরত, শত্ৰুগ্ন) বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু অরণ্যকাণ্ডে দেখা যায়, শূর্পণখা যখন রামকে বিয়ে করতে চাইছিল, সেসময় রাম শূর্পণখাকে অবিবাহিত লক্ষ্মণের কাছে যেতে বলেন। মনে হয় তখনও লক্ষ্মণের বিয়ে হয়নি। (১৫) বাল্মীকির রামায়ণ ষষ্ঠ কাণ্ডেই পরিসমাপ্ত হয়েছে। রাবণ বধ করে সীতা ও লক্ষ্মণের সঙ্গে রাম অযোধ্যায় ফিরে রাজসিংহাসনে বসেন। তারপর সুখসমৃদ্ধিতে বসবাস করিতে লাগিল। মিলনান্তক যবনিকা। রাজ্যে সর্বত্র শান্তি বিরাজ করছে। তারপর আবার সপ্তম কাণ্ডের প্রয়োজন কী? কৃত্তিবাস ওঝার শ্রীরাম পাঁচালী’-র শুরুতেই রত্নাকর দস্যু থেকে বাল্মীকি হয়ে ওঠার একটা রোমাঞ্চক গল্প আছে। সেই ‘পাপের ভাগ না-নেওয়ার’ গল্প আর ‘মরা মরা’ থেকে ‘রাম রাম’-এর গল্পটি বাঙালি সমাজে বেশ জনপ্রিয়। অন্যদিকে বাল্মীকির কবি হওয়ার রামকথা শুরুর গল্পটি বিখ্যাত। তমসার তীরে এক ব্যাধের শরাঘাতে মৃত ক্রৌঞ্চপতির বিরহে ক্রৌঞ্চপত্নীর করুণ ক্রন্দন ঋষি বাল্মীকির হৃদয়কে বিদীর্ণ করে এবং তার কণ্ঠ থেকে আসে তীব্র অভিশাপবাণী–“মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতী সমাঃ/যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেমবধীঃ কামমমাহিত৷৷”
