প্রাবন্ধিক বীরেন্দ্র মিত্রও প্রায় একই বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেছেন–“বাল্মীকি রামায়ণে চতুস্পদ এবং সহজাত লাঙ্গুলধারী বানর-বানরীর উল্লেখ নেই। বরং বানরজাতি কর্তৃক লাঙ্গুল শোভা ধারণের অর্থাৎ লাঙ্গুল সজ্জা গ্রহণের স্বীকৃতিই চোখে পড়ে। মানুষের বানরত্ব ঘটেছে মুনিদের বানানো প্রক্ষিপ্ত কল্পকাহিনির মধ্যে। মহাকাব্যে যদিও স্পষ্টতই বলা হয়েছে, ‘দেবগণ ভগবান স্বয়ম্ভর আদেশ শিরোধার্য করিরা বানররূপী পুত্র সকল উৎপাদন করিতে লাগিলেন’।–কথকঠাকুররা কায়দা করে সেই ‘বানররূপী’ বা ‘বানর রূপসজ্জাধারী’ দেবপুত্রদের ‘কিলকিলা’ রবকারী বৃক্ষশাখাবাসী বানরে সরাসরি রূপান্তরিত করে গেলেন। একটি সুশিক্ষিত মানবজাতিকে অবমাননা এমন নজির বিস্ময়কর।.. যাত্রাপালাগানে এবং নব নব রামায়ণকথায় বেদজ্ঞ, রাজনীতিপ্রাজ্ঞ, প্রখর বুদ্ধিবিদ্যাসম্পন্ন এক দক্ষিণী মহাবীর একটি অতিপ্রাকৃত হনুমার রূপেই চিত্রিত হয়ে আছেন।”
বাল্মীকির রামায়ণে বানর, হনুমান প্রজাতি ছাড়াও আর-একটি প্রজাতি কথাও জানা যায়, তাঁরা হলেন ভাল্লুক। আগের শ্লোকে আমরা ‘ঋক্ষ’ শব্দটা পেয়েছি। ঋক্ষ ও ভাল্লুক সম্প্রদায় সম্ভবত একই গোত্রীয়। রামায়ণে সুগ্রীবের বানরসেনাদের মধ্যে জ্ঞানবৃদ্ধ জাম্ববানকে পেয়েছি। ভাল্লুক সম্প্রদায়ের রাজা জাম্ববান ছিলেন ঋক্ষরাজ। মহাভারতের জাম্ববান-কন্যা জাম্ববতাঁকে বিয়ে করেন কৃষ্ণ। জাম্ববতীর প্রথম পুত্র শাম্ব। রামায়ণে জাম্ববান রাম-সহায়ক বানররাজ সুগ্রীবের মন্ত্রী ও সেনাপতি ছিলেন। এই জাম্ববান ভাল্লুক সম্প্রদায়গণের আদি নিবাস হিমালয়। পরে দেবমন্ত্রী ব্রহ্মার আদেশে দাক্ষিণাত্যে বসবাস শুরু করেন।
প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন টোটেমি জাতি ছিল। শুধু ভারতে কেন, সারা পৃথিবীতেই টোটেমী অস্তিত্ব ছিল। সাধারণত জন্তু-জানোয়ারের নামেই টোটেমী-পরিচিত হত। সেই টোটেম নামেই হত গোষ্ঠীর নাম, পরম্পরায়। ভারতে সর্প টোটেম (নাগ), ঋক্ষ টোটেম (ভাল্লুক), কপি টোটেম (বানর), সারমেয় টোটেম (কুকুর), মহিষ টোটেম, শৃগাল টোটেম ইত্যাদি। স্যার হারবার্ট রিসলের ‘এথনোগ্রাফিক সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে সাঁওতাল, হোম, মুণ্ডা, ভিল প্রভৃতি জাতির মধ্যেই টোটেমি প্রথার প্রাধান্য ছিল। ফ্রয়েড জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ায় টোটেম হচ্ছে ক্যাঙারু, এমু। মেলানেশিয়া, পলিনেশিয়া, আফ্রিকার নিগ্রোদের মধ্যেও অনুরূপ টোটেমী ছিল। স্কটল্যান্ডবাসী জে ফারগুসন ম্যাকলেন্নান মাউদের প্রাচীন ইতিহাসে টোটেম প্রথার বৈশিষ্ট্যকে স্বীকার করেছিলেন। অস্ট্রিলিয়ার বাইরে উত্তর আমেরিকার ইন্ডিয়ানদের মধ্যে, পলিনেশীয় দ্বীপের বিভিন্ন জাতির মধ্যে, পূর্ব ভারতে, আফ্রিকার নানা জায়গায় টোটেমীয় প্রথা ছিল। আদিম আর্যদের মধ্যেও এবং ইউেরোপের সেমিটিক জাতিদের মধ্যেও টোটেম ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ওল্ডেনবার্গ লক্ষ করেছেন মাছ ও কুকুর টোটেমও আর্যসম্প্রদায় বিশেষে মান্য ছিল ঋগ্বেদীয় আমলে। প্রাচীন ভারতে ‘ভালুকি’ নামে এক রসায়নশাস্ত্রবিদের কথা যায়। অষ্টম শতকের আর এক রসায়নবিদ ‘কাকচণ্ডেশ্বর’-এর পরিচয়ও আমরা জানতে পারি। জানতে পারি ‘শাদূল’ নামের এক নৃত্যচার্যের কথা। বহু গবেষক মনে করেন, টোটেম ব্যবস্থা মানবীয় বিকাশের একটি অবশ্য প্রয়োজনীয় স্তর, যা প্রত্যেক জাতিই তার ক্রমবিকাশের পথে অতিক্রম করেছে। আর্য পুরাণকাররা টোটেমী অনার্য জাতিগোষ্ঠীকে তাঁদের টোটেম দ্বারাই অভিহিত করে মানুষের উপর জান্তব প্রাণীর অবয়ব নির্মাণ করেছেন। আর্য বা আর্যদেবতারা তো বাঙালি প্রজাতিতে পাখি বলত, বাঙালিদের ভাষা পাখির ভাষায় মতো। আর্যরা ভারত উপমহাদেশের মানুষদের নিয়ে তাদের ঘৃণা ও নিন্দার কোনো শেষ ছিল না। তাঁরা এদের অভিহিত করেছে দাস, দস্যু, অসুর, রাক্ষস ইত্যাদি নামে। আবার কোথাও বলেছে মাছখেকো, বয়াংসি বলে। বাঙালি ‘বয়াংসি’ অর্থাৎ পাখির জাত, কারণ আর্যদের মতে এঁরা পাখির মতো কিচির-মিচির ভাষায় কথা বলে। মোদ্দা কথা, সীতা উদ্ধার তথা দাক্ষিণাত্যে আর্য-উপনিবেশের জন্য রামচন্দ্রকে এক ফোঁটাও আর্যরক্ত খরচ হয়নি সবই হয়েছে বানরদের উপর দিয়ে। হাজার হাজার বানর প্রাণ দিয়েছেন সুগ্রীবের স্বপ্নপূরণের মূল্য হিসাবে।
রাক্ষস-খোক্ষস : বাস্তবে এবং অবাস্তবে
দণ্ডকারণ্যে এসে সীতা রামকে সতর্ক করে বলছিলেন–“ঋষিরা বললেন, আর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করে বসলে ‘আমি দণ্ডকারণ্যের সমস্ত রাক্ষস বধ করব’, কেন? রাক্ষসেরা তোমার কী ক্ষতি করেছে? বিনা কারণে কেন তাঁদের মারবে?” এখন প্রশ্ন, মহাকবিরা এত রাক্ষস পেলেন কোথায় সে যুগে! মহাভারতে রাক্ষসদের উল্লেখ তেমন একটা পাওয়া যায় না। কিন্তু রামায়ণে রাক্ষস যেন কিলবিল করছে, দণ্ডকারণ্য থেকে লঙ্কা। সেই ধারা অক্ষুণ্ণ রেখেছে পুরাণকারেরাও। বেদের যুগে একটি রাক্ষসদের কথা পাই না। পাই অনার্য তথা দাস বা দস্যুদের। এরাই কি তবে রামায়ণ-মহাভারতের যুগে এসে রাক্ষসে প্রতিপন্ন হয়েছে! যত রাক্ষস সবই যে রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণগুলিতে। বনবাসকালীন রামচন্দ্র প্রায় ১৪,০০০ নিরীহ নিরস্ত্র রাক্ষসদের হত্যা করেছেন কখনো মুনিঋষি তথা ব্রাহ্মণদের রক্ষার্থে, কখনো-বা আত্মরক্ষার তাগিদে, কখনো-বা দাক্ষিণাত্যে আর্য উপনিবেশ ঘটাতে।
