“The Aryans did not know who were the inhabitants of these wild forests. In those days the foresttribes they called ‘Monkey’ and some of the so called “Monkey’, if unusually strong and powerful were called ‘demons’.”
হনুমান প্রসঙ্গে যা উল্লেখ না করলে নয়, তা হল–মুণ্ডা উপজাতিরা দুটি দাবি করে। (১) তাঁরা হনুমানের বংশধর। রামায়ণে উল্লেখিত বানর বা হনুমানের যে লেজ সেটা বায়োলজিক্যাল লেজ নয়, এটা ধুতি বা নেংটির বাড়তি খুঁট (লক্ষ করে দেখবেন মুণ্ডারা ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে আজও তাঁদের উৎসব-অনুষ্ঠানে লেজ বের করে ধুতি পরেন)।(২) তাঁরা হলেন রাবণের বংশধর। তাঁদের এ দাবি মেনে নিলে রাবণ ও হনুমান একই গোত্রের জাতি। অতএব রোমিলা থাপার, অতুল সুর প্রমুখের হিসাবমতে এঁরা সেই বিন্ধ্যপর্বত অঞ্চলেরই মানুষ। যাঁদের একদল বাস করত বলে বন-নর (বানর), আর-এক দল গর্জনশীল ঝর্ণা বা সরব নদী মোহনার কাছে বা কিংবা দ্বীপে বাস করত বলে রাবণ। তবে শুধুমাত্র দাক্ষিণাত্যের বানর প্রজাতিদের মধ্যেই লেজপ্রীতি ছিল, তা নয়। শিক্ষিত মিশরীয়গণ ছাড়াও লেজ সজ্জা’ হিসাবে আকৃষ্ট ছিল প্রাচীনকালের বেশকিছু আদিম জনগোষ্ঠী। বিশাখাপত্তনমের বাসিন্দাদের মধ্যে সবরজাতি পোশাকের সঙ্গে লেজও ব্যবহার করত। প্রাচীনযুগে বেশকিছু অরণ্যবাসী আদিমজাতিদের মধ্যেও লেজপ্রীতি ছিল। অরণ্যবাসীদের এই লেজপ্রীতির কারণ বোধহয় অরণ্যে বসবাসকারী অন্যান্য প্রাণীদের লেজ দেখেই তাঁরাও আসল না-থাকায় নকল লেজ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কোনো কোনো গবেষক বলেন, অভিষেককালে কোনো কোনো ভারতীয় রাজপরিবারে লেজকে ভূষণধারণের প্রথা হিসাবে অবশ্যপালনীয় ছিল। আন্দামানের একটি আদিমগোষ্ঠীদের মধ্যেও পিছনে লেজ লাগানোর অভ্যেস ছিল।
তবে রামায়ণ যে সময় রচিত হয়েছে, সে সময় বা তার আশেপাশে সময়ে কোনো বানর-মানুষ থাকার সম্ভাবনা নেই। দেখে নেওয়া যেতে পারে নৃতাত্ত্বিক রিপোর্ট–জিঞ্জিই হল বানর-মানুষ। জিঞ্জি, মানে জিঞ্জানথ্রোপাস (পূর্ব আফ্রিকার মানুষ)। ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ পুরাতত্ত্ববিদ Dr. Louis Leakey ও তাঁর স্ত্রী Mary পূর্ব আফ্রিকার একটি হ্রদের বুক থেকে একটি খুলির জীবাশ্ম আবিষ্কার করলেন। নাম দিলেন জিঞ্জানথ্রোপাস। এই প্রজাতি ২০,০০,০০০ বছর আগে পৃথিবীতে বাস করত। জিঞ্জানথ্রোপাসের সমসাময়িক অস্ট্রেলোপিথিকাস, এ প্রজাতি দক্ষিণ আফ্রিকার বানর-মানুষ। এরপর কেটে যায় কুয়াশাচ্ছন্ন ১০,০০,০০০ বছর। এই লক্ষ বছরের মধ্যে আমরা আর কোনো বানর-মানুষ পাচ্ছি না। এরপর যাদের সন্ধান পাওয়া গেল, তাঁরা সিনানথ্রোপাস বা পিকিং মানুষ। এরপর পাই হোমোনিয়ানডার্থাল মানবগোষ্ঠী। প্রায় ৫,০০,০০০ বছর আগে এঁদের ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকায় আবির্ভূত হয়েছিল। এরা কিন্তু বানর-মানুষ নয়। অর্থাৎ অনেককাল আগেই বানর-মানুষের ইতি হয়ে গিয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫,০০০ বছর আগেই এই নিয়ানডারথাল মানুষরা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এর পরবর্তীকালের নিয়ানডারথাল মানুষদের কোনো কঙ্কাল আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অপরদিকে ১০,০০,০০০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর বুকে কেটে গেছে চার-চারটি তুষার যুগ, শেষ হয় খ্রিস্টজন্মের ১৩,০০০ বছর আগে। নিয়ানডারথাল মানুষদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সময় এ পৃথিবীতে আবির্ভাব হয় ক্রোম্যাগনন মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই ক্রোম্যাগনন মানুষই নাকি আমাদের আমাদের পূর্বপুরুষ। হিন্দু শাস্ত্রকারেরা বলেন রাম জন্মেছিলেন ৫০০০ বছর বছর আগে। অতএব রামায়ণে উল্লিখিত যে বানরজাতির কথা বর্ণিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণ কল্পকথা। বানর-মানুষের অস্তিত্ব ২০,০০,০০০ আগেই খতম হয়ে যায়। ৫০০০ বছর আগে তা কল্পনাই করা যায়, বাস্তবিক নয়।
বানর বা হনুমান প্রসঙ্গে বাল্মীকি তাঁর রামায়ণে কীভাবে উপস্থাপন করেছেন তা দেখে নিতে পারি পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর ভাষ্যে–“এরা মোটেই আমাদের দৃষ্ট-ত বানরদের মতো ছিল না। তাদের বুদ্ধি, হৃদয় ক্ষমতা এবং চেহারার যে পরিচয় খোদ রামায়ণ থেকেই মেলে তাতে বোঝা যায়, এরা মানুষই ছিল, তবে অবশ্যই অনার্য সম্প্রদায়ভুক্ত। প্রথম কথা, প্রাচীন সংস্কৃতে ‘বা’ শব্দটি উপমার্থে ব্যবহৃত হত এবং ভাষাগত দিক দিয়ে বানর মানে দাঁড়ায় নরের মতে, মানুষের মতো৷…দেবতাদের ঔরসে এইসব বানরদের জন্ম দিয়ে বাল্মীকি নিজের জন্য অদ্ভুত এক বৈজ্ঞানিক ফাঁপর তৈরি করেছেন। এতে প্রমাণিত হয় এঁরা আক্ষরিক অর্থে বানর ছিলেন না। যদি লেজের কথা বলেন, তা হলে প্রথমে মনে রাখতে হবে–বালীর বৌ তারা, সুগ্রীবের বৌ রুমা কিংবা অন্য কোনো বানরীর লেজের কথা ভুলেও উচ্চারণ করেননি। তবে হ্যাঁ, বালী, সুগ্রীব, হনুমান অথবা কাপড়চোপড়-পরা রামায়ণের সব বানরেরাই একটা করে লেজ নিজের দেহে লাগিয়ে নিতেন। সুন্দরকাণ্ডে হনুমান যখন সমুদ্র পার হওয়ার জন্য বিরাট এক লম্ফ দিলেন, তখন তাঁর পশ্চাৎদেশে লাগানো লেজটি গোরুড়ের মুখে লটকানো সাপের মতো লাগছিল–তস্য লাঙ্গুলম্ আবিদ্ধ অতিবেগস্য পৃষ্ঠতঃ দদৃশে গরুড়েনের হ্রিয়মানো মহোরগঃ। ‘আবিদ্ধ’, ‘সমাবিদ্ধ’–এইসব শব্দগুলি তো ‘আটকানো’, ‘লাগানো’ অর্থেই সংস্কৃতে ব্যবহৃত হয়। যদি-বা পণ্ডিতেরা শব্দের নানার্থ ভাবনায় ‘আবিদ্ধ’ শব্দের অন্য মনে করেন, তা হলে বলি বাল্মীকি রাবণের মুখ দিয়েই পরিষ্কার জানিয়েছেন যে রামায়ণী বানরদের লেজটা হল সম্মানের এবং সৌন্দর্যের প্রতীক।” অতএব এই লেজ বানর-হনুমানদের শরীরের অঙ্গও নয়, প্রত্যঙ্গও নয়৷ ওইসব বানর-হনুমানদের লেজ যে সম্মানের এবং সৌন্দর্যের প্রতীক, তা সহজেই অনুমেয় হয় যখন লঙ্কায় হনুমান রাক্ষসসৈন্যদের হাতে ধরা তাঁর লেজটিতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়–“তদস্য দীপ্যতাং শীঘ্রং তেন দগ্ধেন গচ্ছতু”। পুড়িয়ে দেওয়ার অর্থ হনুমানের সম্মান হানি করা, তার উপর তিনি আবার প্রতিপক্ষ রামচন্দ্রের প্রতিনিধি। আমরা ভারতের কোনো জাতির মধ্যে দেখব গোঁফ বা পাগড়ি সম্মানের প্রতীক। এঁদের প্রতিপক্ষ কেউ গোঁফ কেটে নিলে বা পাগড়ি খুলে নিলে তাঁদের সম্মান মান-মর্যাদা ধুলোর সঙ্গে মিশে যায়। বানর-হনুমানদের লাগানো লেজ মর্যাদারই প্রতীক ছিল।
