পরবর্তীতে এইসব বানর, রাক্ষস-খোক্ষস, দানো-দৈত্য, নাগজাতিরা হয়তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে কোনো কারণে, অথবা আজও আছে অন্য রূপে। প্রাচীন ভারতে এরকম অনেক প্রজাতির জীব ছিল, যাঁরা আজ লুপ্ত। প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, সভ্য মানুষের অসভ্য আচরণ আর নৃশংস মনোভাব, তদুপরি পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে ৫০০-রও বেশি প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখি লুপ্ত হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ৯০ বছরের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির আরও ১২ শতাংশ প্রাণী লুপ্ত হয়ে যাবে। আজও এরকম অনেক প্রজাতির মানবগোষ্ঠী আছেন এ ভারতে, যারা বিলুপ্তির পথে। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী, তাঁরা নিজেদের মতো করে বেঁচে আছে, তাঁরা বিপন্ন। কালের নিয়মে একদিন পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। সভ্য মানুষের আগ্রাসনে দাক্ষিণাত্যের বহু আদিম প্রজাতির মানবগোষ্ঠী লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায়। এই মুহূর্তে জাবোয়া ও আওয়া উপজাতিরা বিলুপ্তির পথে অপেক্ষারত।
বানর নিয়ে আর-একটি পৌরাণিক কাহিনি পাওয়া যায়। যেখানে ভগবান শিব একজন মাদারি (বাঁদর খেলা যে দেখায় তাকে মাদারি বলে) সেজে আর হনুমানকে এক বাঁদর সাজিয়ে অযোধ্যাতে গেল। রামের ইষ্ট শিব, আবার শিবের ইষ্ট রাম। অযোধ্যা নগরীতে নেমে ডুগডুগি বাজিয়ে শিব বাঁদর খেলা দেখাতে লাগল। রাজবাড়িতে বাঁদর নাচানো দেখাতে গেলেন স্বয়ং পশুপতি। চার ভ্রাতা সেই খেলা দেখে আনন্দিত হলেন। শিশু রাম, দশরথকে অনুরোধ জানালেন তাঁকে ওই বাঁদরটি দিতে। দশরথ রাজা মাদারিকে বললেন–“কত মূল্যে তুমি বাঁদরটি দেবে?” মাদারি রূপধারী হর জানালেন–“মহারাজ, এর কোনো মূল্য লাগবে না। খালি একটি প্রতিজ্ঞা করতে হবে, যেন সারাজীবন আপনার পুত্র এই বাঁদরটিকে তাঁর সেবক রূপে রাখেন।” রামচন্দ্র কথা দিলেন। মাদারিরূপী শিব সেখানে বাঁদরটি দিয়ে চলে গেলেন। চার ভাই যখন খেলা করতেন, তখন বানররূপী হনুমান তাঁদের সঙ্গে খেলা করতেন। রাম খুবই স্নেহ করতেন হনুমানকে। আর হনুমান সর্বদা রামচন্দ্রের ছায়াসঙ্গী হয়ে ঘুরতেন। রামচন্দ্রের খেলনাসামগ্রী যেমন কন্দু, ঘুড়ির লাটাই, তির ইত্যাদি এনে এনে দিতেন। গাছে উঠে সুগন্ধি ফুল বা মিষ্টি ফল পেড়ে দিতেন।
উত্তরকাণ্ডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একই কারণে দেবতাদের বানর হয়ে জন্মগ্রহণ করতে হয়, রামকে রাবণবধে সাহায্য করার জন্যে। বালকাণ্ডে সেইসব বীভৎস কাহিনি আছে যেখানে ভগবানের আদেশে দেবতারা নাকি গন্ধর্বী, যক্ষী, অপ্সরা, বিদ্যাধরী ও বানরীদের গর্ভে স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই অসংখ্য বানর সৃষ্টি করলেন। কিন্ত রাবণকে ব্রহ্মার এই বর দেওয়ার কাহিনি শুধুমাত্র উত্তরাকাণ্ডেই আছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে নিঃসন্দেহে প্রক্ষিপ্ত।
“অপ্সরঃসু চ মুখ্যাসুগন্ধবীণাং তনুষু চ। যক্ষপন্নকন্যাসু ঋক্ষবিদ্যাধরীষু চ। কিন্নরীণাং চ গাত্রে বানরীণাং তনুষু চ। সৃজধ্বং হরিরূপেণ পুত্ৰাংস্তুল্য পরাক্রমান্।”–পৌরাণিক সমর্থনে বিষ্ণুকে যে কারণে রাবণবধের জন্য মানুষ হয়ে জন্মাতে হল, তা হচ্ছে ব্রহ্মা কর্তৃক অতীতে রাবণকে দেওয়া বর, যার ফলে নর আর বানর ছাড়া আর কারও পক্ষেই রাবণকে বধ করা সম্ভব নয়। অতএব রাবণের সঙ্গে এঁটে উঠতে হলে রামচন্দ্রকে বানরসেনাদের সাহায্য নিতে হবে এটা দেবমন্ত্রী ব্রহ্মার পূর্ব-পরিকল্পিত। এ থেকেই বোঝা যায় রাবণের শক্তির কাছে রামের একক শক্তি এতটাই ক্ষুদ্র ছিল যে, সশস্ত্র আর্যদেবতাদের প্রত্যক্ষ সাহায্য দ্বারাও রাবণ ও দাক্ষিণাত্যে কবজা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই কৃজ্ঞতায় আবদ্ধ করে দাক্ষিণাত্যের অন্যতম শক্তিশালী কিষ্কিন্ধ্যার রাজা সুগ্রীবকে দলে টানতে হল অন্যায়ভাবে। উপরি হিসাবে শূর্পণখার পরে বিশ্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বাসঘাতক বিভীষণকেও পাওয়া গেল। ফলে আর্যদেবতাদের দাক্ষিণাত্য জয় জলবৎ তরলং হয়ে গেল।
বস্তুত ‘বন’ শব্দের সঙ্গে ইক প্রত্যয় যগে ‘বান’ শব্দ হয়, যেমন বানপ্রস্থ শব্দে। তারপর ‘বান’ শব্দের সঙ্গে ‘নর’ শব্দের সন্ধি করলে, বনে বসবাসকারী মানুষ অর্থে বানর হতে পারে। লঙ্কার বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে তথাকথিত রাক্ষসেরা প্রকৃতপক্ষে সুসভ্য এবং নগরবাসী অনার্য ছিল। অর্থাৎ উত্তর ভারতীয় জনপদগুলি থেকে আর্যরা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে থাকলে প্রথমে বনাঞ্চলের আদিবাসী এবং পরে আরও দক্ষিণে সুসভ্য নগরবাসী অনার্যদের সম্মুখীন হয়েছিলেন। নারদ বিবৃত রামকথায় হনুমান-বানরদের কোনো উল্লেখ ছিল না। মহাকবি বাল্মীকি তাঁর মহাকাব্যে এই চরিত্রগুলি কল্পনা করেছেন যুদ্ধের প্রয়োজনে। যেহেতু রাম-লক্ষ্মণ রাজা নন, তাই তাঁদের সেনাবাহিনীও নেই। সসৈন্য রাবণের সঙ্গে সৈনহীন রামের যুদ্ধ সম্পন্ন কীভাবে হবে? অতএব বানরদের মতো কাল্পনিক ভাড়াটে সৈন্যদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, কাহিনির প্রয়োজনে। যেহেতু বানরদের যুদ্ধ করতে পারার কথা নয়, তাই বানরদের প্রায় সব ক্রিয়াকর্মই অলৌকিক পথেই করাতে হয়েছে। পরবর্তী কবিরা এবং পুরাণগুলিতে এই অলৌকিকতাগুলিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য বানরদের উপর ‘দেবত্ব’ আরোপ করেছেন। কারণ দেবতারা সব পারেন, অলৌকিকতাকেও ইতিহাস করে দেওয়া যায়। লক্ষ করা যায় রামায়ণ ও রামের যুগে যুদ্ধাস্ত্র বলতে একমাত্র সম্বল তীর-ধনুক। রাম-রাবণ উভয়ই তীর-ধনুকের সাহায্যে যুদ্ধ করেছেন। একমাত্র বানরসেনারাই যুদ্ধে গদা ব্যবহার করেছেন, এটাই বোধহয় স্বাতন্ত্রতা। ১৯০০ সালের ৩১ তে জানুয়ারির উল্লিখিত ভাষণে স্বামী বিবেকানন্দ রামায়ণ ও মহাভারতের কল্পকাহিনিকে পরিষ্কারভাবেই বহিরাগত আর্যদের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং বানরদের বনবাসী আদিমজাতি বলে চিহ্নিত করেন, যাদের সঙ্গে বহিরাগত আর্যদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। তিনি এও বলেন যে এই বনবাসী আদিমজাতির মধ্যে যেসব মানুষ খুব বলশালী ছিল, তাঁদেরই আর্যেরা রাক্ষস বলতেন। বানরসেনা প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ এটাও বলেন–
