হনুমানের সঙ্গে অর্জুনেরও দ্বৈরথ ঘটেছিল। সেতুবন্ধ রামেশ্বরমে অবস্থানকালে অর্জুন এক ক্ষুদ্র বানরের সম্মুখীন হন। অর্জুন সেই বানরের সামনে গর্ব ভরে বলেন, বানরদের সাহায্য না-নিয়ে রামচন্দ্র একাই সেই সমুদ্র-সেতু নির্মাণ করতে পারতেন। তির যোজনা করেই তো সেটা করা সম্ভব ছিল। ক্ষুদ্র বানর অর্জুনকে চ্যালেঞ্জ জানায় ওই কাজ করে দেখাতে। অর্জুন ব্যর্থ হলে ক্ষুদ্র বানরের ছদ্মবেশ ত্যাগ করে হনুমান প্রকট হন। অর্জুন তাঁর শরণ নিলে, তিনি অর্জুনের রথশীর্ষে অধিষ্ঠান করবেন বলে বর দেন। অর্জুনের রথের উপরে তাই ‘কপিধ্বজ’ শোভা পায়। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ হলে অর্জুন রথ থেকে নেমে আসেন। কৃষ্ণ হনুমানকে ধন্যবাদ জানান রথশীর্ষে অবস্থান করার জন্য। হনুমানও ধ্বজা-রূপ ত্যাগ করে স্বমূর্তি ধারণ করেন। তিনি বিদায় নিলে রথটি ভস্মে পরিণত হয়। হতবাক অর্জুনকে কৃষ্ণ জানান, ভয়ানক সব অস্ত্র এই রথের উপরে বর্ষিত হয়েছে। হনুমান রক্ষা না-করলে রথটি অনেক আগেই ভস্মীভূত হত। মাত্র চারজন ব্যক্তি শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে ভগবদগীতা শুনেছিলেন এবং বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলেন। এঁরা হলেন–অর্জুন, সঞ্জয়, বরিক এবং ঘটোৎকচ। কিন্তু একথা মনে রাখতে হবে, ধ্বজ হিসাবে রথশীর্ষে অবস্থানের কারণে হনুমানও ছিলেন সেই তালিকায়।
একটি আশ্চর্য রামায়ণের সন্ধান পাওয়া যায়, যার রচয়িতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয় স্বয়ং হনুমানকেই। ‘হনুমদ রামায়ণ’ নামে পরিচিত এই গ্রন্থ সম্পর্কে যে কিংবদন্তিটি চলিত রয়েছে, তা সত্যিই কৌতূহলোদ্দীপক। এই মিথ অনুসারে, রাবণবধের পরে হনুমান আধ্যাত্মজীবন যাপনের উদ্দেশ্যে হিমালয় গমন করেন। সেখানে তিনি পর্বতগাত্রে নখের আঁচড় কেটে লিখতে শুরু করেন তাঁর নিজস্ব রামায়ণ। এই রামায়ণে তিনি রামের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রাখেন। হনুমান চেয়েছিলেন, বাল্মীকি তাঁর রামায়ণ সম্পর্কে মন্তব্য করুন। মহর্ষি বাল্মীকিকে তিনি আমন্ত্রণ জানান। বাল্মীকি হনুমানের রামায়ণ পড়ে বেশ ভেঙে পড়েন। হনুমান তাঁর বিষাদের কারণ জানতে চাইলে মহর্ষি জানান, তিনিও রামকথা লিখছেন। কিন্তু হনুমানের রচনা এত প্রাণবন্ত যে, তাঁর কীর্তি এর কাছে ম্লান হয়ে যাবে। উদারচেতা মহাবলি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রচনাকে বাতিল করেন। তাঁর দ্বারা খোদিত প্রস্তরখণ্ডগুলিকে তিনি একে একে নদীতে নিক্ষেপ করেন। বাল্মীকিও হনুমানের উদারতায় প্রসন্ন হয়ে তাঁর আশ্রমে ফিরে আসেন। গল্প কিন্তু এখানে শেষ নয়। বহুকাল পরে মহাকবি কালিদাস নাকি ‘হনুমদ রামায়ণ’-এর একটি প্রস্তর খুঁজে পান। তিনি উজ্জয়িনী নগরের এক প্রকাশ্য স্থানে এই প্রস্তরলিপিটা ঝুলিয়ে দেন। হনুমান যে লিপিতে এই রামকথা লিখেছিলেন, সেটি একটি অতি প্রাচীন এবং অবলুপ্ত লিপি। কালিদাস চেয়েছিলেন, তাঁর সহনাগরিক পণ্ডিতরা এই লিপির পাঠোদ্ধার করুন। কিন্তু তা কেউ করতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। এই লিপিই কি কালিদাসকে ‘রঘুবংশম’ লিখতে প্রাণীত করেছিল? ইতিহাস কিন্তু মিথের ব্যাপারে সায় দেয় না।
এই হল আমাদের সবার প্রিয় বানর বা বাঁদর বা হনুমান। ভগবান বা দেবতাও। ইতিহাস কি? পাঠককুল কি এই কাহিনিগুলির মধ্যে ইতিহাসের কোনো উপকরণ বা উপাদান পেলেন?
“ধৰ্মার্থকামমোক্ষানামুপদেশসমন্বিতম্।/পূৰ্ব্ববৃত্তকথাযুক্তমিতিহাস প্রচক্ষতে।”
অর্থাৎ যে গ্রন্থে ধর্ম-অর্থ-কাম ও মোক্ষ প্রাপ্তির উপদেশ সহ (রাজাদের) পূর্ব-বৃত্তান্ত বিবৃত হয়, ইতিহাস বলে। রামায়ণ এই সংজ্ঞা অনুসারে ইতিহাসশ্রেণিভুক্ত হওয়ার অধিকারী নয়। কারণ ধর্ম-অর্থ-কাম ও মোক্ষের উপদেশ থাকলেও যে রাজাদের কথা এই গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, তাতে তাঁদের পূর্বপুরুষের কোনোরূপ বিবরণ নেই। বস্তুত রাজা দশরথের পিতৃ-পিতামহের তথা ইক্ষ্বাকুবংশের প্রাচীন কথা না-থাকাতেই ঋষিদের মতে রামায়ণ ইতিহাসের শিরোপা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কবি নিজেই বলেছেন–“মহদুৎপন্নমাখ্যানং রামায়ণমিতি তম।” তবে আখ্যানের ইতিহাস হতে তো বাধা নেই। আখ্যানেও দেশ-কাল-পাত্রের প্রভাব থাকবেই। প্রায় সব সাহিত্যেই ইতিহাস নথিভুক্ত হয়ে যায়, অজান্তেই। সমসাময়িক চিত্রপট আঁকা হয়ে যায় সাহিত্যে। ধরা পড়ে সামাজিক ও সমাজজীবনের বর্ণনা। রামায়ণ ভারতে বসেই রচিত হয়েছে, তাই ভারতের স্থান-কাল-পাত্র ঘটনা নথিভুক্ত থাকবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে রামায়ণে যতটা-না ইতিহাস আশ্রয় পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি আশ্রয় পেয়েছে যুক্তিহীন অলৌকিকতা। অলৌকিকতা ছাড়া কোনো ঘটনাই সম্পন্ন হয়নি। রামায়ণে (মহাভারতেও) এমন বিষয়, ঘটনা ও চিত্রনাট্য আছে যা অসম্ভব, অপ্রাকৃতিক, অপ্রার্থিব ও অনৈতিহাসিক। সকল অলীক, অস্বাভাবিক ও অনৈতিহাসিক বর্ণনা থাকলে ইতিহাসের আলোচনা থেকে ত্যাগ করতেই হবে। তবেই লিবির রোমের ইতিহাস, হিরোডোটাসের গ্রিস ও মিশরের ইতিহাসের মতো রামায়ণও কিঞ্চিৎ ইতিহাস হতেই পারে। কবির কাব্য ইতিহাস নয় বটে, কিন্তু কাব্যের উপাদানে ঐতিহাসিকদের ভাববার অবকাশ আছে।
রামায়ণ বা মহাভারতের উল্লিখিত বানর বা হনুমান সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত কিংবা প্রাইমেট অন্তর্গত কোনো জাতি নয়। প্রাইমেট অন্তর্গত কোনো প্রাণী হলে এই ধরনের কর্মকাণ্ড করে ফেলা সম্পূর্ণতই অবাস্তব। রামায়ণের বানর-হনুমানেরা একপ্রকার প্রজাতির মানুষ। দাক্ষিণাত্যে বানর, রাক্ষস, নাগ ইত্যাদি প্রজাতি মানুষের আধিপত্য ছিল। এরা খুব হিংস্র ও শক্তিশালী ছিল। আর্যাবর্তের অনেক আর্যরা বিন্ধ্যপর্বতকে পিছনে রেখে দাক্ষিণাত্য অতিক্রম করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি। এমনই এ অসফল ব্যক্তি হলেন অগস্ত্য। অগস্ত্য দাক্ষিণাত্যে পৌঁছেছিলেন, কিন্তু আর ফিরে আসতে পারেননি। একেই বলে অগস্ত্য যাত্রা! রামের পক্ষেই কেবল দাক্ষিণাত্যে পৌঁছোনো সম্ভব হয়েছিল। তার কারণ রামের বিচক্ষণতা, প্রাজ্ঞতা, আস্থাভাজন এবং বীরতা।
