ঔষধির গন্ধে রাম, লক্ষ্মণ শল্যমুক্ত হন এবং বানরেরা (লঙ্কার যুদ্ধে ইন্দ্রজিৎ মন্ত্রপূত শাণিত প্রাস, শূল এবং অন্যান্য বাণ দ্বারা হনুমান, সুগ্রীব, অঙ্গদ, গন্ধমাদন, জাম্ববান, সুষেণ, বেগদর্শী, মৈন্দ, দ্বিবিদ, নীল, গবাক্ষ, গবন্ধু, কেশরী, হরিলোম, বিদ্যুদ্দংষ্ট্র, সূর্যানন, জ্যোতিমুখ, দধিমুখ, পাবকাক্ষ, নল ও কুমুদ প্রভৃতি হরিশাদূলগণকে বিদ্ধ করে মৃতপ্রায় করে দিয়েছিল।) সুস্থ হয়। ঔষধি চিনতে না-পেরে গোটা পর্বতটাই তুলে আনেন! শুধু গাছগাছালিই নয়, অসংখ্য জন্তুজানোয়ারও নিশ্চয় উঠে আসে। হনুমানে এত ক্ষমতা, অথচ কটা গাছ চিনতে পারলেন না। হনুমান চেনেন বলেই তো জাম্ববান তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। যাঁর উপর বিষ্ণুর অংশ রামের জীবন ফিরে পাওয়ার সম্পর্ক এবং যুদ্ধে পরজয়ের গ্লানি সরিয়ে পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রাবণকে বিনাশ করতে হবে, সেখানে এই অনাবশ্যক শক্তি ক্ষয় করে গোটা পর্বতটাই উপড়ে উড়িয়ে আনতে গেলেন কোন যুক্তিতে! সত্যিই কি পর্বতটি উপড়ে আকাশপথে (যুদ্ধক্ষেত্র তথা দক্ষিণের ত্রিকূট পর্বত থেকে উত্তরের গন্ধমাদন পর্বতের দূরত্ব প্রায় ৩২১৪ কিলোমিটার বা ১৯৯৭ মাইল) উড়িয়ে এনেছিলেন? যদি তর্কের খাতিরে মেনেই নিই গন্ধমাদন পর্বত তুলে এনে যুদ্ধক্ষেত্রে এনেছিলেন, তবে বলব কাজ মিটে গেলে পর্বতটি কে যথাস্থানে রেখে গিয়েছিল? সেই গল্পটি কোনো রামায়ণে পাইনি। এমন পর্বত তুলে আনার গপ্পোই তো বাল্মীকি বলেননি।
সমগ্র ঘটনাটি ঘটেছিল রাতেই। ঔষধিগুলি সরাসরি শরীরে প্রয়োগ করা হয়নি, গন্ধ আঘ্রান করেই সবাই চাঙা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। রাম-রাবণের এই যুদ্ধে শুধু রাম-লক্ষ্মণ-বানরাই মৃত বা মৃতপ্রায় হননি, রাবণের প্রচুর অনুগামীরাও মৃত বা মৃতপ্রায় হয়েছিলেন–তাহলে কি তাঁরাও চাঙা হয়ে উঠেছিল? উঁহু, তা হওয়ার জো নেই! মহাকবি বলেছেন–যখন থেকে বানর-রাক্ষসদের যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, সেই সময় থেকেই রাবণের আদেশে মৃত সৈন্যদের পরিমাণ বিষয়ে হিসাব রাখার জন্য রণমধ্যে বানরের হাতে মৃত ও আহত নিশাচরেরা সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। মৃত রাক্ষসদেহ সেখানে ছিলই না, ঔষধির আঘ্রাণ তাঁরা নিতে পারেনি, অতএব জীবিত হওয়ারও সুযোগ ছিল না। শ্ৰীমনোনীত সেন বলেছেন–“আষাঢ়ে গল্প”। গন্ধমাদন তুলে আনার গপ্পোটি আষাঢ়ে, তা আমরা না-মানলেও মহাভারতকার এই আষাঢ়ে গপ্পোটিকে এক্কেবারেই পাত্তা দেননি। তাই মহাভারতে মার্কণ্ডেয় মুনির বর্ণিত রামোপাখ্যানে গন্ধমাদন পর্বতের কথা ভুলেও উচ্চারণ করেননি। বনপর্বের ২৮৮ নম্বর অধ্যায়ে শুধুমাত্র বলেছেন–“বানররাজ সুষেণ দিব্য মন্ত্রপ্রযুক্ত মহৌষধি বিশল্যা দ্বারা অতি সত্বরে তাঁহাদিগকে শল্যনিমুক্ত করিয়ে দিলেন। মহারথ রাম-লক্ষ্মণ লব্ধসংজ্ঞ ও শল্যনিমুক্ত গাত্রোত্থানপূর্বক ক্ষণকাল মধ্যেই গতক্রম হইলেন।”
হনুমানকে এভাবে বোকা বানানোর অর্থ কী? ধরে আনার কাজ যদি কেউ বেঁধে আনে, তাঁকে তো সবাই বোকাই বলে গাছ চিনতে পারেনি বলে তাই পর্বতটাই তুলে এনেছে–এটা হেঁদো যুক্তি নয়? জাম্ববান বিচক্ষণ ব্যক্তি, সামান্য সুস্থ হওয়ার পর তিনি হনুমানকেই খুঁজেছিলেন, “ভগবান রামকে বা অন্য কাউকে নয়। কারণ তিনি জানতেন হনুমানই চিনতেন এইসব ওষুধিগুলি। কাজেই এইসব গপ্লোগাছা দৃষ্টিহীন’-রাই বিশ্বাস করেন, ‘চক্ষুষ্মন’-রা নয়। এমন গপ্পোগাছা বিশ্বাস করতে হলে হনুমান আর জাম্ববানকে “বোকার হদ্দ” প্রতিপন্ন করতে হয়। সেটা কি সমীচীন হবে? হনুমান নিঃসন্দেহে মহাশক্তিমান, বীর। এহেন মহাশক্তিমান অমাত্য মন্ত্রীসভায় থাকতে সুগ্রীব কেন যে তাঁর দ্বারা বালীকে হত্যা করে কিষ্কিন্ধ্যা দখল করতে পারল না, সেটাই ভাবাচ্ছে।
যুদ্ধশেষে ইনি সীতার কাছে রাবণবধের সংবাদ দেন এবং সীতাকে রামের কাছে পৌঁছে দেন। অযোধ্যায় রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা ফিরে আসার সময় রাম হনুমানকে নন্দীগ্রামে ভরতের মনোভাব জানার জন্য পাঠিয়েছিলেন। অযোধ্যা থেকে ফেরার সময় রাম তাঁর শরীরের সমস্ত অলংকার হনুমানকে প্রদান করেন। সেই সঙ্গে রাম হনুমানকে বর দেন যে, যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন হনুমানও জীবিত থাকবেন। বাবাল্মীকির রামায়ণে লংকাযুদ্ধের সময় হনুমান কিছু রাক্ষস মেরেছিলেন বটে, সেই সঙ্গে গুটিকয়েক মহারথী মহাবীরও হত্যা করেছিলেন। যেমন–অকম্পন, ত্রিশিরা।
এ তো গেল রামায়ণের হনুমান। এই হনুমানকে মহাভারতেও পাওয়া যাচ্ছে। রামায়ণের রাম ও হনুমান ত্রেতাযুগের, ত্রেতাযুগের সময়কাল ১২,৯৬,০০০ বছর। মহাভারত ও মহাভারতের হনুমান দ্বাপরযুগের, দ্বাপরযুগের সময়কাল ৮,৬৪,০০০ বছর। পাঠকগণ দুই যুগের ব্যবধানটা আপনারা নিজেরাই হিসাব করে নিন। আমি বলি দ্বাপরযুগের হনুমানের কথা–তো দ্বাপর যুগে ভীম যখন দ্রৌপদীর অনুরোধে পদ্ম সংগ্রহের জন্য ভুল করে মানুষের অগম্য স্বর্গপথে রওনা দেন, তখন হনুমান তাঁর পথরোধ করে বসেছিলেন। উল্লেখ্য হনুমান এবং ভীম দুজনেই পবনপুত্র। সেদিক থেকে দেখলে, তাঁরা একে অপরের ভাই। পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের সময়ে হনুমান এক অসুস্থ এবং বৃদ্ধ বানরের বেশে ভীমকে দেখা দেন। ভীম ছিলেন অসম্ভব আত্মগর্বী। তাঁকে শিক্ষা দেওয়াই ছিল হনুমানের উদ্দেশ্য। ভীমের পথ রুদ্ধ করে অসুস্থ বৃদ্ধের ছদ্মবেশে হনুমান শুয়ে ছিলেন। ভীম তাঁকে অতিক্রম করতে চাইলে তিনি ভীমকে বলেন তাঁর লেজটি সরিয়ে চলে যেতে। ভীম বহু চেষ্টাতেও সেই লেজ সরাতে পারেননি। শেষে তিনি অনুভব করেন, এই ব্যক্তি কোনও সাধারণ বানর নন। তিনি হনুমানের শরণ নেন। এরপর ভীম তাঁর অগ্রজের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং সমুদ্র লঙ্ঘনের পূর্বে হনুমানের রূপ কেমন ছিল তা দেখার জন্য আবেদন জানান। হনুমান তাঁকে বিন্ধ্যাপর্বতের মতো বিশাল রূপ দেখান। এরপর হনুমান পদ্মবনের প্রকৃত পথ দেখান। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইনি আড়ালে থেকে ভীমকে সাহায্য করেছিলেন। এছাড়াও প্রসঙ্গত বলতে ইচ্ছে করছে, হনুমান যখন জানতে পারেন যে রামের দীর্ঘায়ু কামনায় সীতা সিঁথিতে সিঁদুর পরেন তখন তিনি সারা গায়ে ‘কুমকুম’ বা সিঁদুর মেখে ফেলেন। মেটে সিঁদুরের রঙে তাঁর গায়ের রং হয়ে ওঠে কমলা। এজন্যই হনুমানের আর এক নাম বজরংবলি, কারণ ‘বজরং’ কথার অর্থ কমলালেবু। নারদ মুনির প্ররোচনায় একবার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে হনুমানকে বধ করতে গিয়েছিলেন রাম। তখনই হনুমান একমনে রামনাম জপ করতে থাকেন। আর সেই নামজপেই অকেজো হয়ে যায় রামের সবচেয়ে শক্তিশালী এই দৈব অস্ত্র।
