২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কা পর্যটনের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রিন্স রামের কিংবদন্তি উদযাপন ভারতে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের থেকে ধর্মীয় পর্যটন প্রচার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে অনেক ঐতিহাসিক প্রতিবাদ জানায়। ২০০২ সালে নাসা উপগ্রহ চিত্রের একটি গবেষণা উপর ভিত্তি করে জানিয়েছে, এটা একটি প্রাকৃতিক গঠন, মানুষের তৈরি কাঠামো ছিল না। নাসা বলছে যে, ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই sandbanks প্রাকৃতিকভাবে শৃঙ্খল ছাড়া আর কিছুই নয়। ভারত সরকার, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি হলফনামায় বলেন, রামের দ্বারা সেতু নির্মিত হয়েছে এর কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ থেকে জানা যায়, এটা মানুষের বানানো হয়েছে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০০৮ সালে ভারত সরকারের জন্য একজন মুখপাত্র বলেন, এটি মনুষ্যসৃষ্ট গঠন ছিল না। এটা একটি অতিমানব বানানো কাঠামো হতে পারে, কিন্তু একই অতিমানবই এটা ধ্বংস করেছে। তাই কি ধনুষ্কোটি থেকে তালাইমান্নার পর্যন্ত ফাঁকা, ভূখণ্ডহীন সমুদ্র! তবে অতিমানব নয়, অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন এ অংশটি ভারত-শ্রীলঙ্কার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয় সাইক্লোন বা সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে। এই চুনাপাথর প্রাচীর প্লেট টেকটোনিক্স তত্ত্বের ফলেও বিচ্ছিন্ন হতে পারে বলে আমার মনে হয়। বস্তুত প্যানথালাসা ও প্যানজিয়ার যুগে ভারত ও শ্রীলঙ্কা ভূখণ্ড দুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
যাই হোক, কাব্যের খাতিরে কবি লঙ্কা যুদ্ধের সময় হনুমানকে দিয়ে এককভাবে অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করিয়েছেন। তাঁর হাতে–ধুম্রাক্ষ, অকম্পন, দেবান্তক, ত্রিশিরা, নিকুম্ভ নামক রাক্ষস সেনাপতি নিহত হয়। ইন্দ্রজিৎ হত্যার সময় ইনি লক্ষ্মণকে বহন করেছিলেন। রাবণের নিক্ষিপ্ত শক্তিশেলের আঘাতে লক্ষ্মণ মৃতপ্রায় হলে বিশেষজ্ঞ জাম্বুবানের (মহাভারতে কবিরাজ সুষেণ) পরামর্শে বিশল্যকরণী’ নামক ঔষধি আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে যান। বিবিধ গাছপালার মধ্যে ইনি এই গাছটি খুঁজে না-পেরে গোটা পর্বতটাই তুলে আনেন বলে বর্ণিত হয়েছে। সত্যিই কি বীর হনুমান গোটা গন্ধমাদন পর্বতটাই তুলে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন? তা কি সত্যিই সম্ভব? তুলতে না-পারার কী আছে! হনুমান তো এলিতেলি কেউ নন, দেবতা–দেবতার পুত্র দেবতা।
উদ্ভিদ থেকে নির্গত গন্ধ সমস্ত অঞ্চলকে সুবাসিত করে রাখে যে ঔষধি পর্বত, তাকেই গন্ধমাদন পর্বত বলা হয়। গন্ধ + মাদন, যা গন্ধে মাদয়িত (মত্ত) করে। মহাকবি বাল্মীকি এই পর্বতকে ঔষধি পর্বত বলেছেন। এই পর্বতাঞ্চলে যে যে ঔষধি বৃক্ষলতা পাওয়া যেত, তা হল–
(১) মৃতসঞ্জীবনী (যা মৃতপ্রায় ব্যক্তিকে পুনর্জীবন দান করে),
(২) বিশল্যকরণী (যা শরীর থেকে ক্লেদ, কালিমা, টক্সিন দূর করে),
(৩) সুবর্ণকরণী (যা দেহকে স্বাস্থ্যজ্জ্বল ও লাবণ্যময় করে) এবং
(৪) সন্ধানকরণী (যা ভগ্ন অস্থিকে সংযুক্ত করে)।
এ সমস্ত ভেষজ আজও পাওয়া যায়, কাল্পনিক নয়। এইসব ঔষধি বৃক্ষ ভারত উপমহাদেশের মহান সম্পদ। অভিধান মতে ‘গন্ধমাদন’ শব্দের অর্থ গন্ধক (Sulpher) এবং পর্বত শব্দের অপর একটি অর্থ একপ্রকার শাক বা উদ্ভিদ। ওই সময়ে বিশল্যকরণী, গন্ধক এবং শাকবিশেষের সংমিশ্রণে যে ওষুধ তৈরি হত, তা ক্ষতরোগের মহৌষধি বলে খ্যাত ছিল। এটি হিমালয় সন্নিহিত আলপাইন সদৃশ অরণ্য এবং কৈলাস ও স্বর্ণাভ ঋষভ পর্বতের প্রায় ১০০ যোজন বা আট মাইল জুড়ে বিস্তৃত। কোনো কোনো পণ্ডিত বলেন গন্ধমাদন হল যমকোটিপত্তন থেকে নীল ও নিষধ পর্বত পর্যন্ত মাল্যবান পর্বত। রোমকপত্তন থেকে নীল ও নিষধ পর্বত পর্যন্ত। আবার কোনো কোনো পণ্ডিত বলেন, এই পর্বত ইলাবৃত বর্ষ ও ভদ্রাশ্ব বর্ষের সীমাপর্বত এবং মেরুর পূর্বে অবস্থিত। প্রাবন্ধিক শ্ৰীমনোনীত সেন বলেন, রামায়ণে উল্লিখিত গন্ধমাদন পর্বতই কারাকোরাম পর্বত। প্রাবন্ধিক বীরেন্দ্র মিত্র বলেছেন–“গন্ধমাদন পর্বত গাড়োয়াল হিমালয়ের একটি বৃহদংশের নাম। রুদ্র হিমালয় এবং কৈলাস পর্বতমালার অংশীভূত। এই পর্বতে মন্দাকিনী প্রবাহিত। মন্দাকিনী নেমেছে কেদার অঞ্চল ছুঁয়ে।” তা হনুমান যখন গন্ধমাদন পর্বতটাই উৎপাটন করে লংকায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন মন্দাকিনী নদীটি কোথায় রেখে গিয়েছিলেন?
রাম-রাবণের যুদ্ধকালে হনুমান একবারই (দু-বার নয়) এই ঔষধি পর্বত উৎপাটন করে এনেছিলেন। প্রথমবার ইন্দ্রজিতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে রাম ও লক্ষ্মণ যখন মৃতপ্রায় হয়। রাম কিছুক্ষণ পর সুস্থ হয়ে উঠলেও লক্ষ্মণ অচৈতন্য। রামশিবিরে যখন কবিরাজ সুষেণের সঙ্গে বিশল্যকরণী আনানোর জন্য পরামর্শ চলছে, ঠিক তখনই গড়র ওষুধপত্র নিয়ে অকুস্থলে হাজির হয়ে যান। রাম ও লক্ষ্মণ উভয়ই ওষুধ সেবনে চাঙা হয়ে উঠলেন। এক্ষেত্রে বিশল্যকরণী গরুড়ই এনেছিলেন, হনুমান নয়। দ্বিতীয়বার ইন্দ্রজিতের সঙ্গে যুদ্ধে আবার রাম, লক্ষ্মণ, হনুমান, জাম্ববান মৃতপ্রায় হলেন ও অন্যান্য প্রচুর বানরসেনারা লাশ হয়ে গেলেন। রণক্ষেত্র শ্মশানে পরিণত হল। শবপ থেকে হনুমান জ্ঞান ফিরে পান। জ্ঞান ফিরলেই অন্ধকারে খুঁজতে খুঁজতে বিভীষণকে পেয়ে গেলেন। হনুমান ও বিভীষণ আবিষ্কার করলেন জাম্ববানকে। জাম্ববান হনুমানকে নির্দেশ দিলেন ঋষভগিরি কৈলাসের মাঝে গন্ধমাদনের বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরণী ও সন্ধানী ও ঔষধি আনতে। হনুমান এই চারপ্রকার ওষুধও এনে দিলেন।
