তবে কি মেগাস্থিনিস বর্ণিত এই জাতিগণই রামায়ণ-মহাভারতের বানর-হনুমান? মেগাস্থিনিস অবশ্য তাঁর গ্রন্থে। অবশ্য প্রচুর উদ্ভট উদ্ভট জাতির কথা উল্লেখ করেছেন। এমনই আর-একটি জাতির কথা মনে পড়ছে, যা মেগাস্থিনিস উল্লেখ করেছেন–‘মনোমোটাই’ তেমনই এক জাতি, যাঁরা একচক্ষুবিশিষ্ট এবং যাঁদের কুকুরের মতো কান। এঁদের একটি চোখ নাকি কপালের মাঝখানে অবস্থিত। এঁরা ঊর্ধকেশী এবং বক্ষস্থল রোমশ। ভারতবর্ষ এক অসভ্য ও বর্বরজাতির দেশ, এমন সাব্যস্ত করতেই বোধহয় এহেন উদ্ভট বিবরণ। মেগাস্থিনিসরা এসব তথ্য কোথায় পেলেন সেই সূত্র তিনি দিয়ে যাননি। তবুও এসব বর্ণনায় ভক্ত-মানুষের কী প্রশ্নহীন এবং অগাধ আস্থা, বিশ্বাস!
মেগাস্থেনিস লিখেছেন–“ভারতে পঞ্চবিঘস্ত দীর্ঘ মানুষ আছে, তাহাদিগের মধ্যে কাহারও নাক নাই, কেবল মুখের উপরে দুইটি রন্ধ্র আছে, তাহার দ্বারা নিশ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করে। ত্রিবিঘস্ত জাতির সহিত সারসেরা যুদ্ধ করে, তিতির পক্ষীও যুদ্ধ করে, এগুলি রাজহংসের ন্যায় বৃহৎ।… বনমানুষগুলিকে চন্দ্রগুপ্তের নিকট আনা পারা যায় নাই। ইহাদের পায়ের গোড়ালি সম্মুখের দিকে, পাতা ও আঙ্গুলগুলি পশ্চাদ্দিকে। ভারতীয় মহাকাব্যে এরা ‘পশ্চাদলয়ঃ’ নামে পরিচিত। কয়েকটা মুখবিহীন মানুষ আনীত হইয়াছিল, তাহারা শান্ত ছিল।” আর-একটি যে জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়, এরা হল ‘okupodas’। এই জাতির একটিমাত্র পা এবং ঘোড়ার চেয়েও দ্রুতগামী। রামায়ণ ও হরিবংশেও একপদ জাতির উল্লেখ আছে। একচরণ’ নামও পাওয়া যায়। Enoctokoital বা কর্ণবরণগণ জাতির কথা জানা যায়, তাদের শারীরিক বর্ণনা এরকম–এদের কান পা পর্যন্ত লম্বা, বিলম্বিত কানের উপরই তারা ঘুমোয়। এরা এতটাই বলবান যে, তারা বিশাল বিশাল বৃক্ষ উৎপাটন করতে পারে, ধনুগুণ ছিন্ন করতে পারে। মহাভারতে কর্ণপ্রাবরণ কথা জানা যায়–“বশে চক্রে মহাতেজা দণ্ডকাশ্চ মহাবলঃ।/সাগরদ্বীপবাসাংস্ট নৃপতি ম্লেচ্ছযযানিজান।/নিষাদা পুরুষাদাশ্চ কর্ণপ্রাবরণানপি।/যে চ কালমুখো নাম নররাক্ষসযোনয়ঃ।”(সভাপর্ব/৩১ অধ্যায়/৬৬-৬৭ শ্লোক) ক্টিসিয়সও বলেন–“বামনজাতি ভারতবাসী। এই বামনেরা কিরাতজাতি। কিরাত বলতে বামনই বুঝায়। প্রবাদ এই যে, তাহারা গৃধ্র ও গরুড়ের (ঈগলের) সহিত যুদ্ধ করে, সেজন্য বিষ্ণুর বাহন গরুড়ের একটি নাম, কিরাতগণ মঙ্গোলীয় জাতি। এজন্য ভারতবর্ষীয়েরা ইহাদিগকে মঙ্গোলীয় জাতির ন্যায় বর্ণনা করিয়া যাইয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কদর্যতা তুলিয়াছে। মুখবিহীন’ প্রভৃতি অভিধানের ইহাই মূল।” এ ধরনের বর্ণনা থেকে এটাই প্রমাণ করে যে, আর্যরা প্রবেশের আগে ভারত উপমহাদেশ জুড়ে এরকম শারীরিক বৈচিত্র্যপূর্ণ মানুষের বসবাস ছিল। আর্যরা প্রবেশের পর তাঁদের রচনায় এঁদেরই বিচিত্র শারীরিক গড়নের বর্ণনা পাওয়া যায়, যাঁদের তাঁরা রাক্ষস-খোক্কস, অসুর, দৈত্য দানো, দাস-দস্যু হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। আর্যদেবতাদের মধ্যে সেইরকম শারীরিক গড়নের প্রভাব পড়েছিল। তাই বোধহয় আর্য দেবদেবীদের মধ্যে চার মাথা, তিন চোখ, একাধিক হাতের রূপ পাওয়া যায়। আমরা গ্রিক ও রোমের দেবদেবীদেরও এরকম বিচিত্র রূপে দেখতে পাই।
অবশ্য স্ট্রাবো দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখেছেন–“ডিমখস ও মেগাস্থেনিস একেবারেই বিশ্বাসের অযোগ্য। ইঁহারা নানা। অলৌকিক জাতির উপাখ্যান রচনা করিয়াছেন। কোনো জাতির কর্ণ বৃহৎ যে তাহাতে শয়ন করা যায়, কোনোটির মুখ নাই, কোনোটির নাসাবর্জিত, কোনোটির পদ ঊর্ণনাভের পদের ন্যায়, কোনোটির আঙ্গুল পশ্চাদ্দিকে। বামন সারসের যুদ্ধ সম্বন্ধে হোমরের যে আখ্যায়িকা আছে, ইহারা পুনরক্তি করিয়াছেন, ইঁহারা বলেন যে, এই বামনেরা ত্রিবিঘস্ত দীর্ঘ ছিল। স্বর্ণখননকারী পিপীলিকা, কীলকাকার মস্তকবিশিষ্ট নরপশু (Pans), সশৃঙ্গ গো ও হরিণ উদরসাৎ করে, এই প্রকার অজগর ইত্যাদি অনেক উপাখ্যান হঁহারা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন।” এরাটস্থেনীয় বক্তব্য স্মতব্য–“ইঁহারা এই সকল বিষয়ে একে অন্যকে মিথ্যাবাদী বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন।”
উত্তর খুঁজতে আমরা সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘টলেমির প্রাচীন ভারত’ গ্রন্থটি অনুসরণ করতে পারি। টলেমি ছিলেন সুপ্রসিদ্ধ ভৌগোলিক এবং জ্যোতির্বিদ। টলেমির মতে লঙ্কা পেরোবার জন্য কোনো দুস্তর সাগর পারাপারের প্রশ্নই ছিল না। লঙ্কা আর ভারতের ভূখণ্ড সংযোগ ছিলই। হেঁটে অনায়াসেই লঙ্কায় চলে যাওয়া সম্ভব। ভূগোলবিদ স্ট্রাবো ও প্লিনির ১০০ বছর পরে টলেমি তাঁর পূর্ববর্তী ভৌগোলিকদের গ্রন্থাবলি অনুশীলন এবং অন্যান্য উপায় অবলম্বন করে পুরাবৃত্ত বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা লাভ করেন। টলেমির ‘ভূগোল’ নামক গ্রন্থটি অতি মূল্যবান। টলেমি লিখেছেন–তিনেভেলির প্রধান নদী তাম্রপর্ণী। এই নদী কখইয়ের দক্ষিণে সমুদ্রে এসে মিশত, যার বর্তমান পরিচয় মান্নার উপসাগর। তামিল কাব্যে এটাই আবার পরুনী, পালি ভাষায় তম্বপন্নি বা তপ্রবেন নামে পরিচিত। প্রাচীন যুগে মান্নান উপসাগরের অদূরে অর্গালিক উপসাগর ছিল, এটা রামেশ্বর দ্বীপ দ্বারা বিছিন্ন ছিল এবং ভারতবর্ষের সঙ্গে ছোটো ছোটো দ্বীপমালা দিয়ে সিংহল তথা লঙ্কা প্রায় যুক্ত ছিল। ভৌগোলিক প্লিনি সিংহলের অতি কাছে ভারতীয় সূচ্যগ্র ভূখণ্ড একটি ক্ষীণ প্রবাল (চুনাপাথর?) সাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন ছিল। তবেন দ্বীপ ক্রমশই তার নাম পালটেছে। রামায়ণে এবং অন্যান্য সংস্কৃত গ্রন্থে এই দ্বীপকেই ‘লঙ্কা’ বলা হয়েছে। আলেকজান্ডারের সময়ে ‘ট্যাপ্ৰেবন’ বলা হত, আলেকজান্ডারের আগে গ্রিকরাই বলত ‘অ্যান্টিচথোনাস’। মেগাস্থিনিসই এই দ্বীপকে ‘ট্যাপ্ৰেবন’ বলেছেন, বলেছেন এই ট্যাপ্ৰেবন একটি নদী দিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিল। অতএব ভারতবর্ষ ও লঙ্কার মধ্যস্থিত সমুদ্রকে যেরকম দুষ্কর ও দুস্তর বলে রামায়ণে বর্ণনা করা হয়েছে, বিষয়টি তেমন কিছু নয়–এ ব্যাপারে সুনিশ্চিত হওয়াই যায়। অতএব বলাই বাহুল্য, লঙ্কেশ্বর রাবণ এবং তাঁর অনুগামীরা অনায়াসেই ভারতবর্ষে যথা-তথা ইচ্ছা বিচরণ করত। তাঁর প্রমাণ তথাকথিত রাক্ষসরাজ সহ শূর্পণখা, মারীচ, বিরাধরা দণ্ডকারণ্যে এসে সারাক্ষণ ঋষিদের বিরক্ত করত কীভাবে? রাবণ না-হয় বিমানে চেপে সীতাকে অপহরণ করেছেন, কিন্তু রাবণের বাকি অনুগামীরা কীভাবে ভারত ভূখণ্ডে বিচরণ করত? বিভীষণ কীভাবে লঙ্কা থেকে এসে রামের পক্ষে যোগ দিলেন? হনুমানের মতো সমুদ্রলঙ্ঘন করে নিশ্চয় নয়? অতএব এ থেকে প্রমাণ হয় লঙ্কা থেকে ভারতে অবাধেই যাতায়াত করা যেত, লম্ফঝম্ফ-উলম্ফনের কোনো প্রয়োজন ছিল না। হনুমানের সমুদ্রলঙ্ঘনের গল্পটি অতিরঞ্জিত, অতিকল্পিত।
