হনুমান কর্তৃক সাগর লঙ্ঘনের পূর্বে ভল্লুকরাজ জাম্ববান হনুমানকে তাঁর ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। এরপর থেকে ইনি তাঁর ক্ষমতা সম্পর্কে আর বিস্মৃত হননি। রাবণ সীতাকে অপহরণ করলে, সীতার খোঁজে রাম-লক্ষ্মণ কিষ্কিন্ধ্যায় উপস্থিত হন। এই সময় সুগ্রীব তাঁদের পরিচয় জানার জন্য হনুমানকে পাঠান। হনুমান এঁদের পরিচয় লাভ করার পর, এঁদেরকে পিঠে চড়িয়ে সুগ্রীবের কাছে এনেছিলেন। এরপর রাবণ ও সীতার অনুসন্ধানে সুগ্রীব বিভিন্ন দিকে চর পাঠান। হনুমানও দক্ষিণ দিকে চলে যান। এই অনুসন্ধানকালে সম্পাতির কাছে সীতার অবস্থান জানতে পেরে ইনি সাগর টপকে লঙ্কায় পৌঁছে যান। পথের মাঝে দেবতা, গন্ধর্ব ও ঋষি প্রমুখ হনুমানের শক্তি পরীক্ষার জন্য নাগমাতা সুরসাকে পাঠান। পরীক্ষায় জয়লাভ করে হনুমান পৌঁছে গেলেন সোজা লঙ্কায়। অঅন্য রামায়ণের যে অলৌকিক গল্প মানুষ বিশ্বাস করে, সেটা এখানে উল্লেখ খেই রাখার জন্য। সুরসা রাক্ষস রূপে হনুমানের পথ অপরুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে বলেন যে, দেবতারা তাঁকে তাঁর খাদ্যরূপে নির্দিষ্ট করেছেন। উত্তরে হনুমান বললেন যে, তিনি সীতাকে উদ্ধার করতে লঙ্কায় রামের দূত হয়ে যাচ্ছেন। সীতার সংবাদ রামকে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করেই তিনি সুরাসার মুখে খাদ্যের জন্য প্রবেশ করবেন। এরপর সুরসা বলেন যে, দেবতার বরে কেউই আমাকে অতিক্রম করে যেতে পারবে না। কার্যসিদ্ধির পর হনুমানকে মুখে প্রবেশ করা কথা বলেন সুরসা এবং তার মুখ প্রসারিত করেন। হনুমান তাঁর দেহকে ১০ যোজন বিস্তৃত করেন, সুরসাও মুখ ১০ যোজন বিস্তৃত করলেন। সুরসা ২০ যোজন মুখ বিস্তৃত করলে হনুমানও ৩০ যোজন বিস্তৃত করেন। এইভাবে দুইজনের আয়তন ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকেন। এরপর হনুমান অকস্মাৎ নিজেকে আঙ্গুলের আকারে ধারণ করলেন। পরে সুরসার মুখে প্রবেশ করে আবার বেরিয়ে এলেন। এরপর সুরসা নিজমূর্তি ধারণ করে হনুমানকে আশীর্বাদ করেন। এরপর পথে সিংহিকা নামক এক রাক্ষসীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। এই রাক্ষসী জীবের ছায়া আকর্ষণ করে আহার করতেন। অতএব হনুমানেরও ছায়া আকর্ষণ করে তাঁকে আহার করার চেষ্টা করলে হনুমান প্রথমে তাঁর শরীর বৃদ্ধি করেন। সেই কারণে সিংহিকাকেও মুখ বিস্তার করতে হয়। পরে হনুমান হঠাৎ করে তাঁর শরীর সংকুচিত করে সিংহিকার শরীরে প্রবেশ করেন এবং হৃদপিণ্ড ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে তাঁকে হত্যা করেন। লঙ্কায় প্রবেশ করে ইনি তাঁর দেহ বিড়ালের মতো ছেটো করে সীতাকে খুঁজতে শুরু করেন। শেষপর্যন্ত অশোকবনে সীতাকে দেখতে পান। হনুমান সীতাকে রামের আংটি দেখালে সীতা আশ্বস্ত করেন। প্রতিদানে সীতা তাঁকে চূড়ামণি দান করেন এবং রামের বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য সীতা তাঁকে তাঁর মাথার মণি প্রদান করেন। ফেরার সময় হনুমান অশোকবনটাও ধ্বংস করে আসেন। তাঁকে ধরার জন্য রাবণ তাঁর পাঁচ সেনাপতি ও পুত্র অক্ষয়কুমারের অধীনে এক বিশাল সেনাবাহিনী পাঠান। হনুমানের সঙ্গে যুদ্ধে অক্ষয়কুমার সহ সমস্ত সেনাদেরই মৃত্যু হয়। রাবণের নাতি জঘুমালীও নিহত হন। বুঝি, হনুমান-পরাক্রম বোঝাতেই এরকম অ্যাতো অ্যাত অতিরঞ্জিত গল্প।
আরও একটি আষাঢ়ে গল্প। হনুমান বিশাল সমুদ্র লাফিয়ে পার হয়ে লঙ্কায় পৌঁছোন, এমনটাই বিশ্বাস রাখেন ভক্ত মানুষরা। সত্যিই কি হনুমান সমুদ্র লাফিয়ে পার হয়ে লঙ্কায় পৌঁছেছিলেন? শত যোজন, অর্থাৎ চারশো ক্রোশ পরিমাণ বিস্তৃত মহাসাগর অতিক্রম করা কি সম্ভব? কবি বলেছেন–“সাগর স্যোম্মিজালানামুরসা শৈলবর্মনা অভিঘুংস্তু মহাবেগঃ পুপুরে স মহাকপিঃ।” কাহিনিটি এমন–সীতাকে উদ্ধারের জন্য সুগ্রীবের সহায়তায় বানরসৈন্য নিয়ে হনুমান লঙ্কার দিকে অগ্রসর হলেন। যাত্রাপথে সামনে সমুদ্র থাকায় তাঁদের গতি রুদ্ধ হল। তখন জাম্ববানের উপদেশে অঞ্জনার গর্ভজাত সন্তান হনুমান সমুদ্র টপকে লঙ্কায় যেতে রাজি হলেন। এরপর হনুমানের শরীর বিকট ও বিশালাকার ধারণ করলেন এবং জানালেন–“লাফানোর জন্য উদ্যত হলে ইহলোকে কেউ তাঁর গতি রুদ্ধ করতে পারবে না। একমাত্র মহেন্দ্র পর্বতই তাঁর গতি রোধ করতে সক্ষম হবে।” হনুমানের শরীরের এত বেগ যে, সমুদ্রের যে অঞ্চল দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই সেই অঞ্চল পাগলের মতো উত্তাল হচ্ছিল। সমুদ্রতরঙ্গমালা এতটাই উত্থিত হচ্ছিল যে, আকাশপথে যাওয়ার সময় সমুদ্রতরঙ্গ হনুমানের বুক পর্যন্ত স্পর্শ করছিল। মনে রাখতে হবে, ভারতের সর্বশেষ দক্ষিণ সীমান্ত রামেশ্বরম দ্বীপ থেকে লঙ্কার সর্বশেষ উত্তর সীমান্তের মান্নার উপসাগর বর্তমান দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার (৩০ মাইল)। মাঝে অনেকটা অংশ ফাঁকা (ধনুষ্কোটি থেকে তালাইমান্নার), যা আদম ব্রিজ দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। ৩০ মাইল সমুদ্র অতিক্রম করে লঙ্কায় সীতার কাছে পৌঁছতে বীর হনুমান কি সত্যিই লম্ফন করেছিলেন? যদিও এর আগে হনুমানের ব্যাপক এক রেকর্ড আছে–তিনি পৃথিবী থেকে সূর্যের দিকে (আনুমানিক দূরত্ব ১৪.৯৬ কোটি কিলোমিটার) লাফ দিয়েছিলেন, যেখানকার তাপমাত্রা ৫৮০০ ডিগ্রি কেলভিন–৫০ কিলোমিটার দূরত্ব তো সেখানে নস্যি! পরিব্রাজক মেগাস্থিনিস লিখেছেন–
“অকাইপোদিস জাতি এত দ্রুতগামী যে অশ্বও তাঁদের সঙ্গে দৌড়তে পারে না, ইন্টোকোটাইদের কান তাঁদের পায়ের নীচ পর্যন্ত বিলম্বিত হত এবং সেইজন্য তাঁরা কানের উপর শুয়ে পড়তে পারত এবং এঁরা এমন বলবান যে, বৃক্ষোৎপাটন ও স্নায়ুনির্মিত ধনুগুণ ছিন্ন করতে পারত। এঁদের পায়ের গোড়ালির সম্মুখভাগে এবং পদাঙ্গুলি পিছনদিকে অবস্থিত।”
