রাক্ষসরাজ রাবণের রায়ে হনুমানের লেজে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল এবং রাজপথে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাঁকে নিয়ে বিস্তর মজাও করা হল। লঙ্কার নাগরিকেরা ভিড় করে দেখতে থাকলেন গুপ্তচরের অপমানজনক সাজা। তারপর একাকী পরিত্যক্ত অপমানিত লঙ্কা অতিক্রম করে রামশিবিরে চলে আসেন।
না, হনুমান তাঁর লেজের আগুন দিয়ে লঙ্কা পুড়িয়ে ছারখার করেননি। অন্তত বাল্মীকি এমন অবাস্তব কাজ হনুমানকে দিয়ে করাননি। সত্যিই যদি তাই হত, তাহলে রামের যুদ্ধ করার জন্য কেউই বেঁচে থাকতেন না। লঙ্কা পুড়ে ছারখার হলে রাবণ সহ লঙ্কার অন্যান্য বীরপুরুষরাও মরে ভূত হয়ে যেত। এই অগ্নিকাণ্ডে সীতা যদি ভাগ্যক্রমে বেঁচে থাকেন, তাহলে নিরঙ্কুর প্রতিদ্বন্দ্বীহীন লঙ্কা থেকে সীতাকে হনুমান কাঁধে তুলে রামশিবিরে নিয়ে আসতেন। যুদ্ধের আর অবকাশ কোথায় থাকত? লঙ্কায় কি পুলিশ, সামরিকবাহিনী, প্রতিরোধবাহিনী রক্ষীরা ছিলেন না, যাতে হনুমান অবরুদ্ধ হতে পারে? লঙ্কা যদি পুড়ে ছাই হয়ে যেত, তাহলে রাবণ পরবর্তীতে রাজত্ব করলেন কীভাবে? যে বিভীষণের প্ররোচনায় পড়ে রাবণ হনুমানে জীবন্ত মুক্তি দিলেন, আর সেই হনুমান লঙ্কায় ভস্ম করে দিলে, বিভীষণকে জবাবদিহি না-করেই রাবণ ছেড়ে দেবেন? কই, জবাবদিহি তো করেননি! যাঁর বুদ্ধিতে হনুমান লঙ্কায় হাজার হাজার নর-নারী-শিশু দগ্ধ হয়ে মারা গেলেন, তা সত্ত্বেও লঙ্কেশ্বর নিস্তরঙ্গ নিরুদ্বেগ থাকলেন কীভাবে? এটা বাস্তব? তা উপর কোনো কোনো কবি বলেছেন হনুমানের লেজের আগুন নাকি নিভছিলই না। উপায়ান্তর না-পেয়ে সীতার পরামর্শ নিতে গেলেন, সীতাও পরামর্শ দিলেন লেজটি ঘুরিয়ে মুখে ধরতে। মুখে লেজ ঘুরিয়ে লাগাতেই সেই আগুন নিভেছিল। নিভেছিল বটে, হনুমানের মুখটা পুড়ে কালো হয়ে গেল। মুখ কালো হয়ে গেলে হনুমান খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। সেই পথও বাতলে দিলেন সীতা। বললেন–কালো মুখের জন্য লজ্জার কিছু নেই। শুধু তোমারই মুখ কালো থাকবে না, পৃথিবীর সব হনুমানের মুখ কালো হয়ে যাবে! সেই থেকেই পৃথিবীর সব হনুমানের মুখ নাকি কালো। আষাঢ়ে গপ্পো আর কাকে বলে! তবে হ্যাঁ, লঙ্কা অবশ্যই পোড়ানো হয়েছিল, তাও স্বয়ং রামেরই হুকুমে। ইন্দ্রজিতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে রামশিবিরের সকলেই যখন ধরাশায়ী, মৃতপ্রায়–হনুমানের তৎপরতায় যখন সকলেই সুস্থ হয়ে উঠলেন, তখন রামচন্দ্র ক্রোধে মাঝরাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত লঙ্কানগরী চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে আবালবৃদ্ধবনিতাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার হুকুম দিয়েছিলেন। বানরসেনারা সেই হুকুমমতোই পুড়িয়েছিলেন নিরীহ লঙ্কাবাসীদের। কীভাবে পারলেন? নগরদ্বারগুলি কে খুলে দিল? লঙ্কারাজ্যে কোন্ বিশ্বাসঘাতক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই অগ্নিদাহন প্রত্যক্ষ করলেন? রামই-বা কেন মাঝরাতে, তার উপর ঘুমন্ত নিরীহ মানুষদের পুড়িয়ে মারলেন? এত বীরের কাপুরুষতা!
বিনোদনের জন্য আর-একটা আজগুবি গল্প শোনাই–হনুমান প্রসবের পর অঞ্জনা ক্ষুধার্ত হয়ে বনে ফল আনতে গেল। হনুমান ভোরের সূর্যকে (জানি না হনুমান কোথা থেকে সূর্যের দিকে লাফ মারে। যদি পৃথিবী থেকে লাফ মারে তাহলে বিষয়টা ভাবতেই হয়। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব আনুমানিক ১৪.৯৬ কোটি কিলোমিটার এবং সূর্যের কেন্দ্রভাগে তাপমাত্রা প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ কেলভিন। সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাত্র ৫৮০০ ডিগ্রি কেলভিন) ফল মনে করে খাবারের জন্য লাফ দিয়ে বহু শত যোজন অতিক্রম করল। এইসময় পবনদেবতা বাতাসকে শীতল করে দেন, যাতে সূর্য তেজহীন তাপহীন হয়ে যায়। সূর্য তাঁকে দগ্ধ করল না, কারণ হনুমান তো শিশু! ঘটনাচক্রে সেইদিনই সূর্যকে গ্রাস করার জন্য রাহু অগ্রসর হলে হনুমান সূর্যকে গ্রাস না-করে রাহুকে গ্রাস করতে ছুটলেন। রাহু তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেল, অগত্যা তিনি ইন্দ্রের আশ্রয় নিলেন। এরপর ইন্দ্র রাহুকে সঙ্গে নিয়ে সূর্যের কাছে উপস্থিত হয়ে মধ্যস্থতা শুরু করেন, সঙ্গে ইন্দ্রের ঐরাবতও ছিল। সেই ঐরাবতকে হনুমান গ্রাস করতে ছুটে আসার চেষ্টা করলে ইন্দ্র তাঁর বজ্র দিয়ে হনুমানকে আঘাত করেন। বজ্রের আঘাতে হনুমানের হাড় ভেঙে যায় এবং ইনি পর্বত শিখরে উঠে নীচে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। পুত্রের এহেন পরিণতি দেখে পিতা পবন পর্বতগুহায় প্রবেশ করে পুত্রের জন্য বিলাপ করতে করতে স্থবির হয়ে যান। বায়ু বা বাতাস থমকে যাওয়ায় সমগ্র চরাচরে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। তখন সমস্ত দেবতা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে ব্রহ্মা পবনের কাছে উপস্থিত হন এবং হনুমানকে পুনরুজ্জীবিত করেন। পবন খুশি হন এবং পুনরায় বাতাস প্রবাহিত করেন। এই শিশু হনুর হাড় বজ্রের আঘাতে ভেঙেছিল বলেই এর নাম রাখা হয় হনুমান। এরপর বিভিন্ন দেবতা হনুমানকে বিবিধ প্রকার বর প্রদান করেন। ইন্দ্র বর দেন যে বজ্রের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হবে না এবং ইচ্ছামৃত্যু হবে। সূর্য তাঁর শতাংশ তেজ দান করেন। ব্রহ্মা বলেন, হনুমান ব্ৰহ্মজ্ঞ ও চিরজীবী হবেন এবং সকল ব্ৰহ্মশাপের অবধ্য হবেন। মহাদেব ও বিশ্বকর্মা বলেন, ইনি সকল অস্ত্রের অবধ্য। একসময় এমন এল যে, শিশু হনুমান বিভিন্ন ঋষিদের আশ্রমে উপদ্রব করতে শুরু করেন। অতঃপর ঋষিদের অভিশাপে ইনি দীর্ঘদিন তাঁর নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে বিস্মৃত হয়ে থাকেন।
