এক নম্বর গল্প : অঞ্জনা একাকিনী পাহাড়াঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। একে সুন্দরী নারী, তার উপর পরস্ত্রী–পরস্ত্রী বড়োই উপাদেয় বোধহয়! অঞ্জনাকে একাকিনী পেয়ে পবনদেবতা ঝাঁপিয়ে পড়লেন তাঁর উপর। বলাৎকারে বিবস্ত্র হয়ে গেলেন অঞ্জনা। পরস্ত্রী অঞ্জনার সঙ্গে মিলিত হলেন ‘দেবতা’ পবন। এই বলাৎকারের ফল হল হনুমানের জন্ম। অতএব অঞ্জনাও বানরী নয়, পবনও বানর নয়। এটি একটি বানোয়াট গল্প।
দুই নম্বর গল্প : নানা গল্পে বিষ্ণুকে মোহিনী রূপে দেখা গেছে। অর্থাৎ পুরুষশরীরে নারীর সাজসজ্জা–রূপান্তরকামীরা যেমন সাজেন! এবার মোহিনী বেশধারী বিষ্ণু এতটাই মোহময়ী হয়ে উঠছিলেন যে, তাঁকে দেখে শিবের বীর্যপাত হয়ে যায়। শিবে তেজোময় বীর্যপাত হলে তা কোথায় স্থাপন করবেন, তা নিয়ে শিব বহুবার বিব্রত বোধ করেছেন। এবারও শিবের একই অবস্থা। তবে শিবের এই পতিত বীর্য পরস্ত্রী অঞ্জনার গর্ভে স্থাপন করে দিলেন। অঞ্জনা গর্ভবতী হলেন, গর্ভের সেই সন্তানই হনুমান। প্রাচীন ভারতে বাইরে থেকে বীর্য নিয়ে নারীর গর্ভে স্থাপন করে নারীকে গর্ভবতী করানো যেত। এ তথ্যের সত্যতা নিয়ে কোনো গ্রন্থ মুনিঋষিরা লিখে যাননি।
তিন নম্বর গল্প : অঞ্জনার স্বামী কেশরীর গর্ভে শিব তাঁর তেজ’ প্রবেশ করালেন। এরপর কেশরী ও পবন উপর্যুপরি অঞ্জনার সঙ্গে মিলিত হলেন। এই সঙ্গমের ফলও হনুমানের জন্ম।
চার নম্বর গল্প : বিভিন্ন পুরাণের নানা ঘটনায় হর-পার্বতীর যৌনমিলনের কাহিনি পাওয়া যায়। সেসব কাহিনি বড়োই রসালো। এখানেও হর-পার্বতীর যৌনমিলনের যে গর্ভসঞ্চার হয়, শিব সেই গর্ভ পবনদেবকে দান করেন। পবন সেই গর্ভ বহন করে অঞ্জনার গর্ভে চালান করে দেন। এই গর্ভই হনুমানের জন্ম দেয়।
উপরে উল্লিখিত গল্পগুলি কি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে? বিজ্ঞানসম্মত? হনুমানের জন্মদানে শিব কমন (Common)। কে এই শিব? একই ব্যক্তি, নাকি পৃথক কেউ? অনার্য পশুপতি শিব? নাকি কৈলাশপতি শিব? পশুপতি শিব আর কৈলাশপতি শিব কি এক ব্যক্তি? এসব অস্তিত্ব প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক বীরেন্দ্র মিত্র বলেছেন–“শিব, বিষ্ণু, ব্রহ্মা, ইন্দ্র ইত্যাদি দেবপ্রধানদের পদবিমাত্র ছিল। এক দেবতার উত্তরাধিকারী গদিপ্রাপ্ত পরবর্তী দেবতাও ওই পদবি দ্বারা পরিচিত হতেন। শিবকে শাসন করতে হত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল এবং হিমালয়ের বেশিতম প্রদেশগুলি। কোনো মানুষের পক্ষেই এত বড়ো সাম্রাজ্য একা শাসন করা সম্ভব ছিল না। শিবের প্রতিনিধি শাসক বা দেবতা থাকতেন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং তাঁরাও ‘শিব’ উপাধি দ্বারাই পরিচিত ছিলেন।”
সে জন্ম যেই-ই দিক, জন্ম তো হয়েছেই। গোবলয়ের মানুষ হনুমানকে ‘বজরংবলি’ বলে থাকেন। বজরংবলি বলতে বোঝানো হয় একক শক্তিশালী, যার শরীরের রং বজ্রের মতে, অথবা যার বজ্রের মতো পা আছে।
হনুমান হলেন গোবলয়ের হিন্দুধর্মের একজন দেবতা হিসাবে পূজ্য। বাল্মীকির রামায়ণের না-হলেও কৃত্তিবাস রঙ্গনাথন-তুলসীদাসের রামায়ণে তিনি রামের একনিষ্ঠ ভক্ত, কতটা ভক্ত সেটা বোঝাতে তিনি তাঁর বুকের ছাতি ফাটিয়ে রাম-সীতাকে দেখিয়েছেন স্বয়ং রামকেই। তাই বুক চিরে রাম-সীতাকে দেখানো হাঁটু মুড়ে বসা হনুমানের মূর্তি পুজো করতে দেখা যায়। পুরাণাদিতে হনুমানকে বিশেষ স্থান দেওয়া হয়েছে। রামায়ণ বর্ণিত হনুমান পবননন্দন হিসাবে হিন্দুদের কাছে পূজনীয়। রামায়ণের মূল চরিত্র রাম, যাকে হিন্দুরা ভগবান বিষ্ণুর ‘অবতার’ হিসাবে দাবি করে, তাঁর অনুগত চরিত্র হিসাবে পাওয়া যায় এই হনুমানকে। তবে অবশ্য বাল্মীকির রামায়ণে নয়, প্রাদেশিক কবিদের রামায়ণে হনুমান রামভক্ত। সেই সূত্রে হিন্দুদের কাছে হনুমান ‘রামভক্ত’ হিসাবেই পরিচিত।
অন্য একটা গল্পে জানা যাচ্ছে–মহাদেব বানরকুলে জন্ম নিয়েছিলেন। কেন জন্ম নিলেন? এর একটা কারণও উল্লেখ আছে। একবার রাবণ জোর করে কৈলাশে প্রবেশ করতে গেলেন। দ্বার পাহারায় ছিলেন নন্দী মহারাজ। এক প্রস্থ হাতাহাতিও হয়ে গেল। রাবণ নন্দীকে দেখে পশু, মানুষ বলে উপহাস করাতে নন্দী রেগে রাবণকে অভিশাপ দিলেন–নরবানরের হাতেই তোর ধ্বংস’। তাই বানরকুলে মহাদেব ছাড়া অন্যান্য দেবতারাও জন্ম নিলেন বানর রূপে। কার্তিক মাসের শুক্লা চতুর্দশীতে অঞ্জনা এক গুহার মধ্যে হনুমানকে প্রসব করেন। একে বলা হয় অনকচতুর্দশী। এই উপলক্ষেই কাশীতে প্রতি বছর এই তিথিতে মেলাও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
রামায়ণের কাহিনি অনুসারে হনুমান সীতাকে উদ্ধারের জন্য লঙ্কায় অভিযান চালান। লঙ্কায় পৌঁছে অশোকবনে উপবিষ্ট সীতার সঙ্গে দেখা করেন, কিছু শলাপরামর্শও করেন। এরপর সামান্য গাছপালা এটাওটা ভাঙচুর করেন, কয়েকজন লঙ্কার নাগরিকদের সঙ্গে মারপিটও করেন। তাঁর বিরুদ্ধে যে অক্ষ নামে একজন এবং একাধিক সেনাপতি হত্যা করার যে কাহিনি আছে তা সত্য নয়, বনোয়াট। না, তিনি হত্যাটত্যা কিছু তিনি করেননি। যাই হোক, বিদেশি হনুমান নামক দূত লংকায় প্রবেশ করে উৎপাত করছেন, এ সংবাদ রাবণের কানে পৌঁছেলে তাঁকে বিচারের জন্য ধরে আনতে দুইজন লোক পাঠালেন। হনুমান ওই দুজনকে খুব করে মনের সুখে পিটিয়ে দিলেন। এরপর ইন্দ্রজিৎ কয়েকজন সহচর হনুমানের কাছে এলেন এবং শণের দড়ি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেন। বেঁধে সোজা রাবণের বিচারসভায়। রাবণ হনুমানকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন। কিন্তু বিভীষণের মধ্যস্থতায় সেই মৃত্যুদণ্ড রদ হয়ে গেল। বিভীষণ রাবণকে বললেন–“দূত অবধ্য, তাঁকে হত্যা করলে আপনার মতো বীরের অপযশ হবে।” রাবণ বিভীষণের পরামর্শে খুশি হলেন এবং রায় পরিবর্তন করে বললেন, এই দূত বানরজাতি। এঁদের প্রিয় ভূষণ লেজ। এই লেজেই আগুন ধরিয়ে রাজ্যের বাইরে ছেড়ে দাও। ক্ষমার পূজারি রাক্ষস রাবণ, যার মূল্য ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে চোকাতে হয়েছে তাঁকে। গুপ্তচর বা দূতের সঙ্গে শলাপরামর্শ করার অভিযোগে সীতাকেও কোনো শাস্তির নিদান দিলেন না। তবে এটা স্বীকার করতেই হয় যে, সেদিন বিভীষণ সভায় উপস্থিত না-থাকলে হনুমান ধড়-মাথায় দু-টুকরো হয়ে যেতেন।
