বর্তমান কুমিল্লার আগের নাম রওশানাবাদ। নাওয়াব শুজা-উদ-দাওলাহ ত্রিপুরা অধিকার করে এর নাম রাখেন আলোরনগরী বা রওশানাবাদ। ত্রিপুরা ব্রিটিশ যুগেও দুই ভাগে বিভক্ত ছিল–(১) ত্রিপুরা (বৃহত্তর কুমিল্লা) এবং (২) পার্বত্য ত্রিপুরা (বর্তমান ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য)। এরও আগে এর নাম ছিল এই কুমিল্লাই।
এ তো গেল বানরের কথা, এবার আসি হনুমানের প্রসঙ্গে। হনুমান নামটি এসেছে হনু (চোয়াল’) এবং মান (বিশিষ্ট’ বা ‘কদাকার’) শব্দদ্বয় থেকে। অর্থাৎ হনুমান’ শব্দার্থ ‘কদাকার চোয়ালবিশিষ্ট। অপর একটি সূত্র বলে ‘হনুমান’ নামটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘হন’ (হত্যা) এবং মানা’ (গ) থেকে। অর্থাৎ হনুমান অর্থ যাঁর গর্ব হত হয়েছে।
রামায়ণে উল্লেখিত রামের সহযোদ্ধারা সকলেই বানর। তবে একজন ভাল্লুক জাম্ববান এবং হনুমানের কথাও জানতে পারি। বীর হনুমান, বজরংবলি। ইনি সর্বশাস্ত্রবিদ, রাজনীতিজ্ঞ, রণনিপুণ। ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক এফ. ই. পাজ্জিটার ১৯১১ সালে হনুমানের পরিচয় খুঁজতে ব্যস্ত হয়েছিলেন। তিনি হনুমানের পরিচয় রহস্য প্রকাশ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, ঋগ্বেদের বৃষাকপি ও রামায়ণের হনুমন্ত (হনুমান) উভয়েই গোদাবরী নদীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হনুমান যে দাক্ষিণাত্যের মানুষ তা সুস্বীকৃত এবং বৃষাকপিও যে সেই দেশের ব্যক্তি, তা সুসংগতভাবে অনুমতি এবং এই দুইজনের মধ্যে কোনো একটা সংশ্রব আছে। গোদাবরী তীরে বৃষাকপি তীর্থ আছে আর হনুমানের কৃপাতেই তীর্থরূপে গণ্য হয়েছে।
বৃষাকপি একটি নামবাচক হলেও বৃষ ও কপি এই শব্দযোগেই উৎপত্তি। কেবল শব্দার্থ ধরে নিলে এর অর্থ পুরুষ বানর বোঝায়। এখন বৃষাকপিকে দাক্ষিণাত্যবাসী বলা যায়, তবে এই যৌগিক শব্দটি কোনো দুটি দ্রাবিড়ীয় শব্দের সংস্কৃতানুবাদ হবে হনুমান। যখন নিশ্চয়ই দাক্ষিণাত্যবাসী তখন এই সংস্কৃত নামটিও কোনো দ্রাবিড়ীয় নামের সংস্কৃতানুবাদ হবে। সংস্কৃত ‘হনুমান’ শব্দের অর্থ হনু-বিশিষ্ট। এমন অর্থ দিয়ে শব্দটিকে আসলে সংস্কৃত শব্দ বোঝা যায় না। কিন্তু কাহিনি অনুসারে মূলত কোনো দ্রাবিড়ীয় শব্দের সংস্কৃতরূপ হতে পারে, এরকম অনুমান করা যায়।
রামায়ণে হনুমান ও বানরদের দেশ কিষ্কিন্ধ্যা বলা হয়েছে। এটি গোদাবরীর দক্ষিণ-পশ্চিমে কিছুটা দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্থানটি কর্ণাটি ভাষার দেশের দক্ষিণে এবং তামিল ভাষার দেশের উত্তরে অবস্থিত। অতএব ওই দুই ভাষা থেকে এই নামের উৎপত্তির মূল যদি কিছু থাকে তা পাওয়া যাবে।
‘বৃষা’-পুরুষ, দ্রাবিড়ীয় ভাষায় সাধারণত ‘আণ’ শব্দের সঙ্গে মিলতে পারে। কর্ণাটী, তামিল ও মালয় ভাষায় ওই শব্দটি আছে। তেলগু ভাষায় এই শব্দটির পরিবর্তে ‘মগ’ শব্দ আছে। আণ’ শব্দ অন্য শব্দের পূর্বে বসে তার পুংস্তু নির্দেশ করে। কর্ণাটী, তামিল, তেলগু ও মালয় এই চারটি ভাষায় ‘কপি’ বাচক দুটি শব্দ দেখা যায়–কুরঙ্গু ও মণ্ডি। কেবল তামিল ভাষায় কুরুঙ্গু’ শব্দে কপি বোঝায়। অন্য তিন ভাষায় এর অর্থ কেবল হরিণ। মালয় ভাষায় কুরঙ্গ’ শব্দে হরিণ ও ‘কুরম্ন’ শব্দে বানর বোঝায়। মণ্ডি’ শব্দে তামিল ভাষায় বানর, বিশেষত বানরী বোঝায়। মালয় ভাষায় কৃষ্ণমুখ বানর বোঝাতে ‘মণ্ডি’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। কর্ণাটীতে মানুষ বা ব্যক্তি বোঝাতে ‘মণ্ডি’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। তেলগুতে অন্য শব্দযোগে ‘মণ্ডি’ শব্দে ব্যক্তি বোঝায়। কর্ণাটী ও তেলগুতে ‘কোটি’ ও ‘তিস্মা’ শব্দে বানর বোঝায়। কিন্তু তামিল ও মালয় ভাষায় এর সমশব্দ নেই। অতএব দ্রাবিড়ীয় ভাষায় বানরার্থ ‘মণ্ডি’ শব্দ সবচেয়ে প্রাচীন শব্দ। এই সমস্ত সাদৃশ্য উপস্থাপন করে পুরাতাত্ত্বিক পাজ্জিটার বলছেন–যদি এইসব কথা গ্রহণীর হয়, তবে ‘আণ মণ্ডি’ শব্দ বৃষাকপি শব্দবোধক হতে পারে। আণমণ্ডির শব্দার্থ করে সংস্কৃতানুবাদ বৃষাকপি হতে পারে। তারপর ‘আণ মণ্ডি’-কে সংস্কৃত করে নিতে হলে সহজেই “হনুমান’ হয়ে যায়। কারণ আর্যরা যেখানে দ্রাবিড়ীয় শব্দকে সংস্কৃত করে নিয়েছেন, সেইখানেই অনেক ক্ষেত্রে ‘হ’ মিশিয়ে দিয়েছেন। এইভাবে আণমণ্ডি > অনমন্ত > হনুমন্ত হয়েছে। অতঃপর পাজ্জিটার বলেছেন–বৃষাকপি > আণমণ্ডি > হনুমন্ত যদি ঠিক হয়, তবে বলতে হয় ঋগ্বেদের আগেই দাক্ষিণাত্যে এর বিস্তৃতি হয়েছিল। বানরপুজো দাক্ষিণাত্যের সম্পত্তি এবং ঋগ্বেদ সংগ্রহের আগেই বানর স্তুতিমন্ত্র সমস্ত দেশে রচিত হয়েছিল। (ভারতবর্ষ/প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা)
বিভিন্ন পুরাণ ও বিভিন্ন রামায়ণে এই হনুমানকে নিয়েই প্রচুর অলৌকিক ও সুপারন্যাচারাল কাহিনি প্রচলিত আছে। কয়েকটা কাহিনি এ আলোচনায় উল্লেখ করা যায় বিনোদনের জন্য। শাস্ত্রপুরাণাদি ঘেঁটেঘুঁটে হনুমানের জন্ম নিয়ে চারটি ভিন্ন স্বাদের গল্প পাওয়া যায়। কোনো গল্পে হনুমান পবন বা বায়ুর ঔরসজাত, কোনো গল্পে তিনি শিবের ঔরসজাত। শিবের দাঁড়িপাল্লাই ভারী। হনুমান কি বানর? বানর হলে ভীম তবে কে? হনুমানের মতো ভীম পবনপুত্র হয়েও ভীম ‘বানর’ এমন কথা তো কোথাও পাইনি! তবে হনুমানের জন্মকাহিনিতে যতই ভিন্নতা থাক–পিতা পৃথক পৃথক হলেও মাতা একই। মাতার নাম অঞ্জনা, অঞ্জনা কেশরীর স্ত্রী। কিন্তু হনুমানকে অনেকক্ষেত্রে ‘কেশরীনন্দন’ বলা হলেও, তিনি কেশরীর ঔরসজাত নন।
